ছাত্রলীগ নেতাদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) তথ্য ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রাণভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়িতে চলে গেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে তার ওপর তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নির্যাতন চলে। নির্যাতনের পর ছাত্রলীগের দুই নেতা তার ডেবিট কার্ড থেকে ৪৫ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এমন অভিযোগ করে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে একটি চিঠি পাঠান ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগটি তদন্তে ওই দিন সন্ধ্যায়ই তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ।
এদিকে ছাত্রলীগ নেতার নির্যাতনের শিকার হয়ে রাবির অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সামছুল ইসলামের কানের পর্দা ফেটে গেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক তার কানের পর্দা ফাটার তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে ১৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার হলের একটি কক্ষে আটকে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন সামছুল।
বাড়ি থেকে কুরিয়ারে অভিযোগ পাঠানো শিক্ষার্থীর নাম মো. আল-আমিন। তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের তথ্য ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজেলায়। তার চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে। ১৭ আগস্ট ছিল প্রথম পরীক্ষা।
লিখিত অভিযোগে আল-আমিন বলেছেন, তিনি ১৭ আগস্ট পরীক্ষায় অংশ নেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় পরীক্ষা শেষে বের হওয়ার পরপরই রাবি শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও মতিহার হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা তাকে রবীন্দ্রভবন থেকে বঙ্গবন্ধু হলের ৩৩১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে মার্কেটিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মুমিনুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ ওরফে শশী, তাকি আহমেদসহ অনেকে আসেন। তাদের সঙ্গে কয়েক মাস ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করেছিলেন আল-আমিন। কিন্তু মনোমালিন্য হওয়ায় বছরখানেক আগে তিনি কাজ ছেড়ে দেন। এই কাজের জন্য তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্র ছিল না।
অভিযোগপত্রে আল-আমিন আরও বলেন, মুমিনুর তার মাথায় দুই লিটারের পানির বোতল ও লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। তিনি একপর্যায়ে অচেতন হয়ে যান। এ সময় তার মোবাইল ফোন থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয় নির্যাতনকারীরা। চেতনা ফেরার পর রাত ৮টার দিকে জোর করে তার ডেবিট কার্ড নিয়ে গিয়ে ৪৫ হাজার টাকা তোলেন সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও ভাস্কর সাহা। মুমিনুর ও তার অনুসারীরা তাকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেন। মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। তারা জোর করে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে এবং তার ভিডিও ধারণ করে। তারা হুমকি দিয়ে বলে, তাদের কথার বিপক্ষে কোনো কথা বললে এবং কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তাই তিনি জীবন বাঁচানোর জন্য তারা যা বলেছে, তাই করেছেন। পরে রাত ৯টার দিকে ছাড়া পেলে জীবন বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি শরীয়তপুরে চলে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল-আমিন বলেন, ‘ওই দিন রাতে আমি অনেক ভয়ে ছিলাম। এ কারণে মুখ খুলতে পারিনি। তাই বাড়িতে এসে কুরিয়ারের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠিয়েছি। আমি এমন ভার্সিটি চাই না, যেখানে নিরাপত্তা নাই।’
নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে মুমিনুর রহমান বলেন, ‘আল-আমিনসহ আরও কয়েকজনকে তাদের দুরবস্থার সময় চাকরি দিয়েছিলাম। এক-দেড় বছর চাকরি করার পর আল-আমিন বললেন, তিনি বিসিএস পরীক্ষা দেবেন। আল-আমিন চলে যান। কিন্তু তারা কয়েকজন গিয়ে আরেকটি কোম্পানি খোলেন। সেখানে আমার কোম্পানির ক্লায়েন্টদের নিচ্ছেন তারা। এতে আমার ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ নিয়ে আমরা ১৭ আগস্ট বিষয়টির সুরাহার জন্য কথা বলতে বসেছিলাম আল-আমিনকে নিয়ে। তাকে কেউই মারধর করেননি।’
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মুমিনুর রহমান বলেন, সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও ভাস্কর সাহা আলোচনার সময় ছিলেন। কিন্তু পরে কী হয়েছে, এটা বলতে পারবেন না তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিতের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
আর মতিহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা বলেছেন, তিনিসহ অনেকেই ওই দিন আলোচনার সময় উপস্থিত ছিলেন। মুমিনুর ও আল-আমিনের মধ্যে ব্যবসায়িক একটি বিষয় ছিল। তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগটি মিথ্যা। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, ‘কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে মুমিন-শশী ও আল-আমিনের মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। গত দিন এ বিষয়টা নিয়ে টুকিটাকিতে বসে সমাধান করা হয়েছে। কিন্তু আল-আমিন বাড়িতে গিয়ে কেন যে এমন করল বুঝতে পারছি না।’
আল-আমিনকে নির্যাতনে ছাত্রলীগ নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা।’
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, ‘কুরিয়ারের মাধ্যমে একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, ভাস্কর সাহার বিরুদ্ধে বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সামছুল ইসলামকে মারধর করে চাঁদাবাজির অভিযোগে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত চলছে।
কানের পর্দা ফেটেছে আরেক শিক্ষার্থীর: ছাত্রলীগ নেতার নির্যাতনের শিকার হয়ে রাবির অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সামছুল ইসলামের কানের পর্দা ফেটে গেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক তার কানের পর্দা ফাটার তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে ১৯ আগস্ট বিশ^বিদ্যালয়ের মতিহার হলের একটি কক্ষে আটকে কয়েক ঘণ্টা ধরে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন সামছুল।
মতিহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ভাস্কর সাহার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেছিলেন সামছুল। ঘটনার পর থেকে তিনি কানে শুনছিলেন না। গত বুধবার রাতে কানের ব্যথা নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন সামছুল। এরপর গত বৃহস্পতিবার তিনি পরীক্ষার প্রতিবেদন পান। প্রতিবেদন অনুযায়ী তার বাম কানের পর্দা ছেঁড়া।
সামছুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার রাতে হঠাৎ কানে ব্যথা অনুভূত হয়। অসহ্য ব্যথা নিয়ে রাতেই রাজশাহী মেডিকেলের নাক, কান ও গলা রোগ বিভাগের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হই। পরে চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা দেন। বাইরে গিয়ে সেগুলোর পরীক্ষা করাই। প্রতিবেদন দেখে চিকিৎসক জানান, আমার বাঁ কানের পর্দা ফেটে গেছে। আমি এখনো শুনতে পারছি না। এ ছাড়া মারধরের কয়েক দিন পর থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি।’
