নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৬তম প্রয়াণ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধিতে বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা কবির সমাধিতে যান। সেখানে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ও পরে দলের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা।
শ্রদ্ধা জানানোর পর ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এই আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ হয়েছে। তারা সর্বকালের সেরা তিনজন বাঙালি, সবার সেরা বঙ্গবন্ধু। যৌবনের কবি, বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, ব্যথার কবি নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক।
সকাল সাড়ে ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন। এরপর সমাধি প্রাঙ্গণে হয় আলোচনা সভা।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যের কবি, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতার কবি। বঙ্গবন্ধু ও কবি নজরুলের মধ্যে একটি অসাধারণ সখ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুই মূলত কবি নজরুলকে দরিদ্রপীড়িত জীবনাচার থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন।’
এদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের নেতাকর্মীরা জাতীয় কবিকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পরে রিজভী বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ভয়ংকর দুঃসময় যাচ্ছে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে নজরুলের লেখনী আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে প্রেরণা জোগায়, সাহস দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এ রকম একটা পরিবেশে নজরুল খুবই প্রাসঙ্গিক।’
এ ছাড়া কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, নজরুল একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, নজরুলচর্চা কেন্দ্র বাঁশরী, বাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের পক্ষ থেকে তার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৬তম প্রয়াণ বার্ষিকীতে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে রয়েছেÑ জাতীয় কবির ভাস্কর্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কোরআনখানি, দোয়া, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
গতকাল সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর। কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, কাজী নজরুল সাম্য মৈত্রী এবং স্বাধীনতার কবি। তিনি বাঙালিকে শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া ও সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মো. জাহিদুল কবির, ড. তরিকুল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
এদিকে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে গতকাল বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আহমেদুল বারী, গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক ড. মো. শাহাবুদ্দিন, রেজিস্ট্রার হুমায়ুন কবির, শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. সুজন আলী, সাধারণ সম্পাদক তুহিনুর রহমান ও অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে, ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীনতাকামী এ কবি। ১৯৭৬ সালের ১২ ভাদ্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ছোটবেলায় তার ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুল বাংলা ভাষা সাহিত্য অনুরাগীদের কাছে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি কবিতা, সংগীত, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্রে নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। ছিলেন সাংবাদিক, গায়ক এবং অভিনেতাও। সংগীতে তার অজস্র রাগ-রাগিণী অমরত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবি নজরুলকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তাকে দেওয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি দেয়। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি একুশে পদকে ভূষিত হন কবি।
