ধর্ষণের শিকার শিশুকে থানায় বসিয়ে রাখা হলো ২৭ ঘণ্টা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৩০ এএম

কুষ্টিয়ায় ধর্ষণের শিকার সাত বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠাতে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে গত সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ধর্ষণের শিকার হয় প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ওই শিশু। পরে মামলা করতে ওই দিনই সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে শিশুকে নিয়ে কুষ্টিয়া সদর থানায় হাজির হন তার বাবা। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিক মামলা নথিভুক্ত করে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য শিশুটিকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রেখে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। পরদিন গতকাল মঙ্গলবার সকালে বাবাসহ শিশুকে থানায় এনে ফের বসিয়ে রাখা হয়। এরই মধ্যে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পেয়ে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। এমন পরিস্থিতিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য শিশুকে অবশেষে সিভিল সার্জন অফিসে পাঠানো হয়। এদিকে কুষ্টিয়ার ওই শিশুটি ছাড়াও দেশের আরও দুই জায়গায় এক শিশু এবং এক প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার মুরাদনগরে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে দুই মাসের ব্যবধানে তিনবার ধর্ষণের অভিযোগে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর নেত্রকোনার বারহাট্টায় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধে।

কুষ্টিয়ায় ধর্ষণের শিকার শিশুর বাবা পেশায় নির্মাণশ্রমিক। ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তার মেয়ে সদর উপজেলার বাড়াদি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শিশুটি প্রতিবেশী এক শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফিরছিল। এ সময় একই গ্রামের বাসিন্দা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আমিরুল ইসলামের ছেলে রংমিস্ত্রি আকাশ (২৭) তার পথ রোধ করে। আকাশ শিশুকে কোলে তুলে পাশের কলাবাগানে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের সময় শিশুর চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আকাশ পালিয়ে যায়।

শিশুর বাবার অভিযোগ, তিনি ওই দিনই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানিয়ে বিচার প্রার্থনা করেন। তারা তাকে থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যেই স্ত্রীসহ ধর্ষণের শিকার মেয়েকে নিয়ে কুষ্টিয়া সদর মডেল থানায় যান। কিন্তু থানাতে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে দুপুরের পর এসআই ইউনুস ঘটনার বিবরণ শুনে একটি এজাহার লিখে তাতে সই করিয়ে নেন। এরপর থানার একটি কক্ষে ওই দিন রাত ৯টা পর্যন্ত তাদের বসিয়ে রাখা হয়। এ দীর্ঘ সময়ে অনাহারে ও যন্ত্রণায় ধর্ষণের শিকার শিশুটি কাতরাতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে পরদিন সকালে আবার থানায় যেতে বলে। পরে গতকাল সকালে ভারী বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে তারা আবার কুষ্টিয়া মডেল থানায় গেলে শিশুকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে না পাঠিয়ে ফের বসিয়ে রাখা হয়।

শিশুর বাবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইউনুসকে আমি বারবার অনুরোধ করি বাচ্চাটাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে সাংবাদিকরা পুলিশকে ফোন করার পর দুপুর সাড়ে ১২টার সময় সিভিল সার্জন অফিসে নিয়ে যান সাদা পোশাকের একজন মহিলা পুলিশ। ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হওয়ার পরও পুলিশ আসামি ধরার উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো আমাদের ২৭ ঘণ্টা থানায় রেখে দিয়েছে। আমি আমার মেয়ে ধর্ষণে জড়িত আকাশকে গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. এইচএম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার সময় কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ ধর্ষণের শিকার শিশুকে নিয়ে এলে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্নের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক উদ্যোগ নিয়ে ২৫০ শয্যার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

ধর্ষণের শিকার শিশুর ডাক্তারি পরীক্ষায় দেরি করার কারণ জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইউনুস আলী বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে আমার কাছে মামলাটির তদন্তভার অর্পণের পর আমি কাজ শুরু করেছি। শিশুর ডাক্তারি পরীক্ষায় আমার অবহেলা বা অহেতুক বিলম্বে হওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।’

ধর্ষণের শিকার শিশুর ডাক্তারি পরীক্ষায় দেরি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার ওসি দেলোয়ার হোসেনও। তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর বাবার দেওয়া এজাহার গতকালই (সোমবার) মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করে আদালতে বিচারকের খাসকামরায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।’

মুরাদনগরে সাত বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগ : কুমিল্লার মুরাদনগরে সাত বছরের এক শিশুকে দুই মাসের ব্যবধানে তিনবার ধর্ষণের অভিযোগে শাহ আলম (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত রবিবার বিকেলে উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক শাহ আলম মুরাদনগর উত্তরপাড়া এলাকার প্রয়াত সাহেব আলীর ছেলে।

মুরাদনগর থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘শিশুর নানির করা অভিযোগের ভিত্তিতে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ ইমামের বিরুদ্ধে : নেত্রকোনার বারহাট্টায় স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ধর্ষণে ওই তরুণী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। সিংধা ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

বারহাট্টার থানার ওসি মোহাম্মদ লুৎফুল হক জানান, তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা ইমামের নাম হাফেজ নূর আহম্মদ (৫৭)। তিনি উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের প্রয়াত মগল মিয়ার ছেলে। ভুক্তভোগী তরুণীও একই গ্রামের বাসিন্দা। তবে মামলার খবর পেয়েই আত্মগোপন করেছেন ইমাম নূর আহম্মদ।

* প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত