আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার পাশাপাশি বিএনপি সরকারবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ে রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ করছে। ওই রূপরেখা অনুযায়ী দলগুলোকে নিয়ে সরকার পতনে চলতি বছরের শেষের দিকে যুগপৎ আন্দোলনে নামবে দলটি। বিএনপি ও তার মিত্র কয়েকটি দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন।
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদসহ কয়েকটি দাবিতে বিএনপি গত আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছে। এসব কর্মসূচি ঘিরে হামলা-সংঘাতের ঘটনায় দলটির চার নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। বিএনপি বলছে, কর্মসূচি নিয়ে তারা মাঠে থাকবে।
এর আগে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি তার সমমনা, বামপন্থি ও ধর্মভিত্তিক ২২টি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে। সংলাপে বিভিন্ন দলের কাছ থেকে আসা প্রস্তাব নিয়ে তারা একটি রূপরেখা তৈরির কাজ করছে। রূপরেখাটি প্রায় চূড়ান্ত এবং তা শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার জন্য ইতিপূর্বে সংলাপ করেছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে স্থায়ী কমিটির সভায়। অতিদ্রুত রূপরেখা চূড়ান্ত করে আমরা আপনাদের সামনে, জাতির সামনে আসব।’
রূপরেখায় কী থাকবে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য। এই সংসদ বাতিল করতে হবে এবং একটা নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, যাদের নেতৃত্বে নতুন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। তারা সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব ভোটার যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটাই আমাদের প্রধান বিষয়।’
সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে আন্দোলনের বিষয়ে সংলাপ করবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সঙ্গে এখনো আমরা ফরমালি (আনুষ্ঠানিক) কোনো আলাপ-আলোচনা করিনি। তবে আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলা।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না এবং তাদের ২০ দলে থাকা না-থাকা নিয়ে দেওয়া বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সকল দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন করবে।’
রূপরেখার প্রথম ভাগে, অর্থাৎ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টি থাকছে। সরকার পতনের লক্ষ্যে এ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি কী হবে, দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হবে।
রূপরেখার দ্বিতীয় ভাগে, অর্থাৎ নির্বাচনের পর দলগুলোর ভাষায় রাষ্ট্র-রূপান্তর কর্মসূচিতে জাতীয় সরকার গঠন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, সাংবিধানিক সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, কমিশন গঠন করে রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন পরিকল্পনা থাকছে। এ ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ আন্দোলনে ভূমিকা রাখা বিজয়ী ও পরাজিত দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে প্রথম দিকে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব ছিল। বিএনপি জাতীয় সরকারের যে রূপরেখার কথা বলেছে, সেটা নির্বাচন-পরবর্তী। আর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ (এলডিপি) একটি অংশ নির্বাচন-পূর্ববর্তী জাতীয় সরকারের কথা বলেছে। এখন আর সেই দূরত্ব তাদের মধ্যে নেই।
বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা বসে রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।’ আসছে সপ্তাহে সে বৈঠক হতে পারে বলে তিনি জানান।
গত ২৪ জুলাই থেকে বিএনপি সরকারবিরোধী সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে। সাতদলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পতন, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমরা যুগপৎ আন্দোলনে যাব। এর আগে আমরা আবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব। এরপর আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।’
সাইফুল হক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের সংবিধান। এই সংবিধান দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এত ক্ষমতা দিয়েছে যে তিনি ছেলেকে মেয়ে এবং মেয়েকে ছেলে করা ছাড়া আর সবই করতে পারেন। এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা চলে গেছে।’ তার ভাষ্য, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেভাবে কথা বলেন তাতে মনে হয় তিনি কাউকে সম্মান দিচ্ছেন না, পাত্তা দিচ্ছেন না। তাই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কর্তন করতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে হবে। বারবার আন্দোলন করে সরকার পরিবর্তন করলে হবে না। এবার আমরা একজোট হয়ে সরকার গঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্র মেরামতের কাজ করতে চাই।’
এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলন, সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে দিন তারিখ ঠিক করে আন্দোলন হয় না। পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে আন্দোলনের ধরন ঠিক করতে হবে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য নেতাদের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করতে হবে। সময় বলে দেবে কোন পথে হাঁটতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে চাই। তবে সরকার আমাদের হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য করলে তখন সিদ্ধান্ত নেব কোন পথে আন্দোলন করব।’ তিনি বলেন, আগেভাগে দিন তারিখ ঠিক করে আন্দোলন শুরু হবে না। সময়ই বলে দেবে কোনো পথে এগোব আমরা। যেহেতু একমঞ্চে আন্দোলন হবে না, সেহেতু সংলাপে না এলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে আমাদের সঙ্গে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ (জাপা) যেকোনো দল সম্পৃক্ত হতে পারবে।’
