রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০৬ এএম

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জন্য এক অনিশ্চিত সময়ে সিংহাসনে বসলেন তার বড় ছেলে রাজা তৃতীয় চার্লস। যুক্তরাজ্য এবং এর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে রাজতন্ত্র বিরোধিতা এবং প্রজাতন্ত্রের দাবি বেড়েই চলেছে। ওদিকে রাজদায়িত্ব থেকে পরিবারের তিন সদস্য সরে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই ব্রিটেনের রাজকীয় দৃশ্যপটেও বদলে এসেছে। সাসেক্সের ডিউক এবং ডাচেস স্বেচ্ছায় রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। আর সতের বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারির জেরে যুবরাজ অ্যান্ড্রুকে রানীর আদেশেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, নতুন রাজা দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন যে, তিনি রাজপরিবারের আকার আরও ছোট করে ফেলবেন এবং রাজকীয় আড়ম্বরও কমিয়ে আনবেন। কারণ জনগণের টাকায় রাজপরিবারের বিশাল ব্যয়ভার বহন নিয়ে বহুদিন ধরেই সমালোচনা চলে আসছিল। কোনো রাজতন্ত্রই চিরকাল একই রকম থাকে না। সময়ের পরিবর্তনে যেকোনো রাজতন্ত্রের ভূমিকাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়। সামনের বছরগুলোতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কাছ থেকে ঠিক কী আশা করা যায়, তা বোঝার জন্য আমাদের বিশ্বের আরও যে ৪৩টি দেশে এখনো রাজতন্ত্র টিকে রয়েছে তাদের দিকে তাকাতে হবে। এসব দেশেও বর্তমানে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একজন রাজা রয়েছেন। অবশ্য, এগুলোর মধ্যে আবার ১৫টি দেশই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই রাজতন্ত্রগুলোকে আমরা মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করতে পারি: আনুষ্ঠানিক, সাংবিধানিক, শক্তিশালী এবং নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র।

আনুষ্ঠানিক রাজারা : কিছু দেশে রাজতন্ত্র রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করে; যেখানে রাজার কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত-গ্রহণ ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে এই রাজতন্ত্রগুলোর ভূমিকা সংবিধানের মাধ্যমে কঠোরভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছে। জাপানের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘সম্রাট শুধুমাত্র সংবিধানে দেওয়া রাষ্ট্রীয় কাজগুলো করবেন এবং সরকার পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ক্ষমতা তার থাকবে না।’ আর ডায়েটে (জাপানি আইনসভা) নির্বাচিত হওয়ার পরই শুধু সম্রাট কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন।

সাংবিধানিক রাজতন্ত্র : তাত্ত্বিকভাবে, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাজাদের দেশের সংবিধানের অধীনে যথেষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে বাস্তবে, সাংবিধানিক রীতিনীতি এবং অন্যান্য নিয়মের অধীনে রাজার ভূমিকা সীমিত হয়ে প্রায় আনুষ্ঠানিক হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যে কেউ ডেনিশ সংবিধান পড়লে এমন ধারণা পেতে পারে যে, রাজাই হয়তো দেশটি পরিচালনা করছেন। সংবিধানে রাজাকে ‘রাজত্বের সমস্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্র্তৃত্ব’ দেওয়া হয়েছে। মনে হবে যেন, সাংবিধানিক রাজারা শুধু প্রধানমন্ত্রীই নিয়োগ করেন না, মন্ত্রীর সংখ্যা এবং প্রত্যেকে কী করবে তাও নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু বাস্তবে রাজা শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের পরামর্শে কাজ করেন এবং রাজার ভূমিকা সাংবিধানিক নিয়মাবলির মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আর যেহেতু ধরে নেওয়া হয় যে, একজন রাজার রাজত্বকালে হয়তো একাধিক দল সরকার গঠন করবে। সুতরাং, রাজাকে অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। অন্যথায় তাদের রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্রও মূলত এই সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ব্রিটিশ রাজাকে মূলত মন্ত্রীদের পরামর্শে কাজ করতে হয়। তবে, এর বাইরেও রাজার হাতে কিছু বড় ক্ষমতা থাকে, যদিও সেসবের ব্যবহার সীমাবদ্ধ। যেমন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগদান বা পদচ্যুত করার ক্ষমতা। অবশ্য, ব্রিটিশ রাজা শুধু এমন ব্যক্তিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন যিনি সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সংসদের নিম্নকক্ষ তথা হাউজ অফ কমন্সের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। অর্থাৎ, এমপিদের ভোটে নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তেমনি সংসদের অনুমোদন ছাড়া রাজা প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুতও করতে পারেন না।

‘শক্তিশালী’ রাজতন্ত্র : এটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের একটি ভিন্ন রূপ, যা সাধারণত মোনাকো এবং লিচেনস্টাইনের মতো ছোট রাজত্বে দেখা যায়। এসব রাজতন্ত্রে সাংবিধানিকভাবেই রাজাকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেওয়া হয়, যা তারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করেন। মোনাকোতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ‘প্রিন্সের সর্বোচ্চ কর্র্তৃত্বের মাধ্যমে’; যার পরামর্শক হিসেবে থাকেন একজন মন্ত্রী এবং ছয় সদস্যের সরকার পরিষদ।

আইন-কানুন প্রণয়ন করে জাতীয় পরিষদ। তবে রাজপুত্রকে অবশ্যই সব আইনে স্বাক্ষর করতে হবে। রাজার সরাসরি সম্পৃক্ততার মাত্রা আরও ব্যাপকও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মোনাকোর যুবরাজের ব্যক্তিগত অধিকার রয়েছে।

নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র : ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এসওয়াতানি (সোয়াজিল্যান্ড) এবং ব্রুনাই হলো নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের দেশ। এসব দেশে রাজারা তাদের দেশের রাজনৈতিক জীবনে সর্বোচ্চ ক্ষমতার চর্চা করেন।

নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের আরেকটি উদাহরণ হলো সৌদি আরব; যেখানে বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও গণ্য হন এবং তিনিই মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়োগও দেন। পরামর্শক পরিষদ আইন প্রস্তাব করতে পারে, তবে রাজাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। আর সাধারণত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো রাজপরিবারের সদস্যদের হাতেই থাকে। যেমন, সৌদি আরবের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান; যিনি ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতার চর্চা করেন। তাকে ব্যাপকভাবে একজন সংস্কারক এবং কর্র্তৃত্ববাদী ব্যক্তিত্ব উভয় হিসেবেই দেখা হয়; যিনি নির্মমভাবে রাজনৈতিক ভিন্নমত এবং দুর্নীতি দমন করার পাশাপাশি কিছু স্বাধীনতাও বাড়াচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন।

রাজপরিবার ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা : বর্তমান ব্রিটিশ সংবিধান মূলত নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকেই বিকশিত হয়েছে। এমনকি ভিক্টোরিয়ান যুগে সংবিধানের অধীনেই সম্রাট তার প্রজাদের ওপর সম্পূর্ণ ক্ষমতা উপভোগ করেছিলেন। লেখক ওয়াল্টার ব্যাইগহট যার নাম দিয়েছিলেন ‘ছদ্মবেশী প্রজাতন্ত্র’। এখন প্রশ্ন হলো সেই বিবর্তন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে কি না। আকারে ছোট এবং আড়ম্বরহীন ও কম আনুষ্ঠানিক রাজতন্ত্র কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য আমাদের ইউরোপের অন্যান্য রাজতন্ত্রের দিকে তাকাতে হবে। সুইডেনের রাজা কার্ল গুস্তাফ তার পাঁচ নাতি-নাতনিকে রাজপ্রাসাদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, যার অর্থ তাদের ওপর কোনো রাজকীয় দায়িত্ব পালনের ভার দেওয়া হবে না। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রেও কিছুটা হলেও এমনটি ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। প্রিন্স হ্যারি এবং প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তা ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে। প্রিন্সেস অ্যান এবং ডিউক অফ গ্লুসেস্টার প্রিন্স রিচার্ডের মতো বয়স্ক সদস্যরা রাজপরিবারের জন্য কম দায়িত্ব পালন করাটাই স্বাভাবিক। এ থেকেও ইঙ্গিত মেলে যে, ভবিষ্যতে রাজপরিবারকে জনজীবনে ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে কম সম্পৃক্ত হতে দেখা যেতে পারে। যা থেকে হতাশা এবং অসন্তোষও সৃষ্টি হতে পারে। যেমনটা স্পেনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। দেশটির রাজপরিবার ছোট হতে হতে এখন শুধু রাজা-রানী এবং তাদের দুই তরুণী কন্যাতে এসে ঠেকেছে। অথচ দেশটির জনসংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ। সবচেয়ে বড় ঝুঁকির দিকটি হলো, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এমন এক সময়ে শুধু লন্ডন-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে যখন যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ভূগোল আরও বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্য চারটি দেশের একটি ইউনিয়ন এবং প্রতিটিরই নিজস্ব রাজনৈতিক কেন্দ্র রয়েছে। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে পুরো যুক্তরাজ্যব্যাপী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হতে হলে রাজপরিবারে অবশ্যই তার প্রতিফলন থাকতে হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন রাজা বেলফাস্ট, এডিনবার্গ এবং কার্ডিফ ভ্রমণ করবেন। এর মধ্য দিয়ে হয়তো কিছুটা হলেও বোঝা যাবে যে, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র শুধু লন্ডন-ভিত্তিক না বরং পুরো যুক্তরাজ্যব্যাপী প্রতিষ্ঠানই আছে এখনো। কিন্তু রাজপরিবারের আকার ছোট করে আনা এবং রাজকীয় আড়ম্বর কমানোর সঙ্গে বিষয়টির সমন্বয় করা কতটা সহজ হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ ছাড়াও, আরও ১৪টি দেশ রয়েছে রাজা তৃতীয় চার্লস এখন যেগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সিংহাসনে বসার জন্য রাজা তৃতীয় চার্লসই এমন একজন উত্তরাধিকারী যিনি যুবরাজ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছেন। যার ফলে ব্রিটিশ জনজীবনের কেন্দ্রে একটি জমকালো ও কার্যকর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজতন্ত্রকে কীভাবে নতুন করে সাজানো যায় এবং এর জন্য জনসমর্থন বজায় রাখা যায় সে সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্যও যথেষ্ট সময় পেয়েছেন চার্লস। যে সময়টাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতি অনেককেই বিভ্রান্ত করছে। তবে, চার্লস যদি তার কাজে সফল হতে পারেন তাহলে প্রিন্স উইলিয়াম এবং তার বংশধররা হয়তো আরও শত বছরের জন্য একটি সত্যিকারের আধুনিক রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী হবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত