ঘরের মাঠে রাজত্ব বাইরে বিধ্বস্ত

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

বাংলাদেশ দলের জিম্বাবুয়ে সফর দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা পুরনো ক্ষতটাকে আবার নতুন করে সামনে এনেছে। ঘরের মাঠে রাজত্ব আর দেশের বাইরে গেলেই বিধ্বস্ত! কেন আবার এই রোগ পেয়ে বসল বাংলাদেশ ক্রিকেটে? এই আলোচনার শুরুতেই জাতীয় দলের সাবেক এক অধিনায়ক প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘প্রতি সিরিজের আগে মিরপুরে ৫-৭ দিনের অনুশীলন হয় ঠিকই, এর বাইরে সর্বশেষ কবে জাতীয় দলের একটি পূর্ণাঙ্গ কন্ডিশন ক্যাম্প হয়েছে বলতে পারবেন?’ রাজনৈতিক বৈরিতায় গত বছর বাংলাদেশ সফরের সূচি থাকলেও খেলতে আসেনি ভারত ক্রিকেট দল। তাতে দেশের ক্রিকেট বোর্ড আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়লেও শাপেবর হয় ক্রিকেটারদের জন্য। ফাঁকা থাকা ওই সময়ে মিরপুর ও সিলেটে লম্বা সময় ধরে ক্যাম্প করার সুযোগ পান তারা। এরপর চলতি বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ায় সে সময়ে ক্যাম্পের আলোচনা চললেও ঘরোয়া একটি টুর্নামেন্ট বাড়াতে গিয়ে বেশি বড় হয়নি লিটন দাস, নাজমুল হোসেনদের অনুশীলন পর্ব। জিম্বাবুয়েতে এসব কারণেও ভুগতে হচ্ছে বলে মনে করেন ওই অধিনায়ক।

একই রকম ভাবনা আরেক সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহেরও, ‘একটা সিরিজ হারতেই পারে। মনে করেন, টেস্টে হেরেছে, সমস্যা নেই। এটা হতেই পারে। কিন্তু ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচও যেভাবে হেরেছে, সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ কারণ খুঁজতে গিয়ে কন্ডিশনকেই দায় দিলেন তিনি, ‘এটা হতে পারে যে, কয়েকটা সিরিজ টানা জিতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভুগেছে। তবে আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে, ছেলেরা কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ নিতে পারেনি। জিম্বাবুয়ের কন্ডিশন বিবেচনা করে অনুশীলন হয়েছে কি না, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থেকেই জিম্বাবুয়েতে গেছে বাংলাদেশ দল। টানা দুটি টেস্ট সিরিজ জয়ের পাশাপাশি টানা ৪টি ওয়ানডে সিরিজ জয়। ঘরের মাঠের হিসাব ধরলে সেটি ছিল টানা ৫টি সিরিজ জয়। অথচ এখনো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চক্রে প্রবেশ করতে না পারা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাত্র আড়াই দিনেই হার। এরপর প্রথম ওয়ানডেতে বিধ্বস্ত হন মেহেদী হাসান মিরাজরা। সিরিজ বাঁচানোর লড়াইয়ে দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও হারে। আজ হারারেতে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াই সফরকারীদের। পাকিস্তানে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয় ব্যতিক্রম হলেও, বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিক হতে পারছে না বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে সফরে ব্যাটিং বিভাগ বারবার চাপে পড়েছে। নতুন বলের সুইং, অতিরিক্ত বাউন্স এবং পেস-সহায়ক উইকেটে ব্যাটারদের টেকনিকের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে।

কন্ডিশনের কারণেই বাংলাদেশের ব্যাটাররা চ্যালেঞ্জ নিতে পারছেন না বলে মনে করেন রাজিন, ‘দেখুন, জিম্বাবুয়েতে গিয়ে ব্যাটাররা কোন বলগুলোতে বেশি ভুগছে। মিরপুরে যেগুলো সামনে এগিয়ে ডিফেন্স করে, একই বল সেখানে বুকের কাছে নিয়ে খেলতে হচ্ছে। আমাদের এমন চিন্তা করা উচিত যে, ক্যাম্প শুধু বাংলাদেশে হবে না। অবশ্যই ভিন্ন দেশের কন্ডিশন বিবেচনায় ক্যাম্প করা উচিত। সেখানে স্থানীয় দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেললে অভিজ্ঞতা বাড়বে।’

২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর থেকে হিসাব করলেও ঘরের মাঠের পরিসংখ্যানে দাপট বাংলাদেশের। ১২টি টেস্টে ৬টি (৫০ শতাংশ) জয়, ১৫টি ওয়ানডেতে ১০টি (৬৬.৬৭ শতাংশ) জয় ও ২৫টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১২টি (৪৮ শতাংশ) জিতেছেন লিটনরা। কিন্তু দেশের বাইরে পা রাখলেই বিবর্ণ হয়ে যায় পারফরম্যান্স। ৯টি টেস্টে ৩টি (৩৩.৩৩ শতাংশ) জয়, ১৯টি ওয়ানডেতে ৩টি (১৫.৭৯ শতাংশ) জয় এবং ৩৭টি টি-টোয়েন্টি খেলে জিতেছে মাত্র ১২টি (৩২.৪৩ শতাংশ)। অর্থাৎ, বিদেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন দল বাংলাদেশ। দেশে বিশ্বের বড় বড় দলকে হারানোর সামর্থ্য দেখানো লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা বাইরে গেলে বাউন্স ও সুইং-সহায়ক কন্ডিশনে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হতাশাজনক পারফরম্যান্সে সামনে এসেছে পুরনো প্রশ্ন।

এসব বৃত্ত ভাঙতে কন্ডিশন অনুযায়ী অনুশীলনের জন্য দেশের বাইরেও ক্যাম্প করার পরামর্শ রাজিনের, ‘মিরপুরে ক্যাম্প করলে ছেলেরা অনুশীলন করে বাসায় যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে। অনেকেই দেখেছি হোমসিকনেসে ভোগে। এমন হওয়া উচিত নয়। এইচপি বা ‘এ’ দলের যেমন আবাসিক ক্যাম্প হয়, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদেরও দেশের বাইরে সিরিজের পরিকল্পনায় কন্ডিশন বিবেচনা করে ক্যাম্প করানো প্রয়োজন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত