১৯৮১ সালের অসলোর সেই রাতটি আজও ইংলিশ ফুটবলের এক বিষাদময় স্মৃতি। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে নরওয়েজিয়ান ধারাভাষ্যকার বিয়র্গ লিলিহেনের সেই বিখ্যাত চিৎকার, ‘লর্ড নেলসন, লর্ড বিবারব্রুক, স্যার উইনস্টন চার্চিল, স্যার অ্যান্থনি ইডেন, ক্লেমেন্ট অ্যাটলি, হেনরি কুপার, লেডি ডায়ানা... মার্গারেট থ্যাচার, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? মার্গারেট থ্যাচার, আপনার ছেলেরা আজ চরমভাবে বিধ্বস্ত হলো!’ যা আজও ফুটবল অনুরাগীদের কাছে এক নজিরবিহীন বিদ্রুপ হয়ে আছে।
এর ঠিক এক যুগ পর, ১৯৯৩ সালের বাছাইপর্বেও ইংল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের টিকিট কাটার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল এই ভাইকিংরা। অথচ, মুখোমুখি লড়াইয়ের সামগ্রিক ইতিহাসে ১২টি ম্যাচের ৭টিতেই জিতেছে থ্রি-লায়ন্সরা, যেখানে নরওয়ের জয় কেবল সেই দুই ম্যাচেই। বিগত এক যুগ ধরে এই দুই দলের কোনো দেখাও হয়নি; সর্বশেষ ২০১৪ সালের প্রীতি ম্যাচে ওয়েইন রুনির একমাত্র পেনাল্টি গোলে জিতেছিল ইংল্যান্ড। ইতিহাসের সেই অমøমধুর সমীকরণ পিঠে নিয়েই আজ মায়ামির চড়া রোদ আর ৫৮ শতাংশ আর্দ্রতার ভ্যাপসা গরমে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের এই দুই পরাশক্তি।
দীর্ঘ ২৮ বছর ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের বাইরে থাকা নরওয়ে এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম কালো ঘোড়া। শেষ ষোলোর ম্যাচে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন কিংস ব্রাজিলকে বিদায় করে দিয়ে তারা প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বের বৈতরণী পার হয়েছে। আর এই অবিশ্বাস্য যাত্রার কেন্দ্রে আছেন ২৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। চার ম্যাচে ৭ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির ঠিক পেছনেই আছেন তিনি। তবে মাঠের লড়াইয়ের আগেই ইংল্যান্ডের সামনে কিছুটা মজার ছলে কথার লড়াইয়েও নেমেছেন হালান্ড। নিজেদের ‘আন্ডারডগ’ দাবি করে সব আলো আর প্রত্যাশার চাপ কৌশলে ঠেলে দিয়েছেন ইংল্যান্ডের দিকে। এ নিয়ে হাসিমুখে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এই ম্যাচে ইংল্যান্ডই পরিষ্কার ফেভারিট, তাই সব চাপ এই ইংলিশ বন্ধুদের ওপরই থাকা উচিত।’
হালান্ডের এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ছক, যা তার সতীর্থদের কথায়ও স্পষ্ট। মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান থরস্টভেট যেমনটা বলছিলেন, ‘আমাদের হারানোর কিছু নেই। তবে আমাদের দলে এমন কিছু ব্যক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে, যারা বড় মুহূর্তগুলো একাই নির্ধারণ করতে পারে।’ দলের এই চাপহীন মানসিকতার কারণ তাদের ড্রেসিংরুমের চমৎকার রসায়ন। আরেক মিডফিল্ডার মর্টেন থরসবি জানান, দলে কোনো নেতিবাচক পরিবেশ নেই এবং দীর্ঘ সময় একসঙ্গে খেলার এই আত্মিক বন্ধনই তাদের মাঠের সেরা পারফরম্যান্সের মূল জ্বালানি। ইন্টার মায়ামির ট্রেনিং বেসে হালান্ডকে নিয়ে তৈরি হওয়া উন্মাদনা এখন তুঙ্গে, এমনকি গুগলে তার নাম খুঁজলে বিশেষ ‘ভাইকিং রো’ ড্রামবিট সচল হচ্ছে। এই চাপমুক্ত আমেজটাই নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে প্রিমিয়ার লিগের চেনা মুখ হওয়ায় দুই দলের একে অপরের শক্তির জায়গাগুলো ভালোই জানা। নরওয়ে স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ৯ জনই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেন, ফলে চেনা ফুটবলারদের ছকেই হবে এই লড়াই। এ ম্যাচে বড় আকর্ষণ ইন ও হালান্ডের দ্বৈরথ। প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতা এই দুই স্ট্রাইকার এর আগে ক্লাবের হয়ে মাত্র দুবার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এখন মায়ামির চড়া তাপমাত্রায় কে সেরা, সেটি প্রমাণেরই অপেক্ষা। তবে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ নিয়ে টুখেলের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে, যেখানে জ্যারেল কুয়ানসারের নিষেধাজ্ঞা ও রিচ জেমসের ফিটনেস নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তবে হলান্ডকে থামানোর জন্য ড্যান বার্নের শারীরিক শক্তিতে ভরসা রাখছেন কোচ, কারণ প্রিমিয়ার লিগে হালান্ড বার্নের বিরুদ্ধে বেশ কোণঠাসাই ছিলেন।
এদিকে মাঝমাঠের দখল নেওয়ার লড়াইয়ে আর্সেনালের সতীর্থ মার্টিন ওডেগার্ড ও ডেক্লান রাইসের মুখোমুখি হওয়াটা হবে দেখার মতো। ব্রাজিলের বিপক্ষে ওডেগার্ডের অনবদ্য পারফরম্যান্সের বিপরীতে রাইসকে আজ কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে, বিশেষ করে রাইসের চোট ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার ক্লান্তি ওডেগার্ডের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। সাকার ফিটনেস নিয়েও ইংল্যান্ড শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। এই ম্যাচে নরওয়ের পারফরম্যান্সের মূল জ্বালানি তাদের ড্রেসিংরুমের চমৎকার রসায়ন এবং ওডেগার্ডের খেলার নিয়ন্ত্রণ, যা ইংল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।