নোয়াখালী সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীর গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামের আবুল খায়ের পেশকারের বাড়ি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তাসনিয়া হোসেন অদিতা (১৪) নামে ওই স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে।
নিহত তাসনিয়া হোসেন অদিতা নোয়াখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সে আবুল খায়ের পেশকারের নাতনি ও মৃত রিয়াজ হোসেনের মেয়ে।
গ্রেপ্তার চারজন হলো নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার খলিল মিয়ার ছেলে আবদুর রহিম রনি (২০), একই এলাকার অজি উল্লার ছেলে মো. সাঈদ (২০) ও ইসরাফিল আলম (১৪) এবং নিহতের চাচা ইমাম হোসেন (৪২)।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার সময় অদিতা বাসায় একাই ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ফিরে তিনতলা ভবনের নিচতলার বাসার দরজায় তালা ঝুলতে দেখেন তার মা রাজিয়া সুলতানা রুবি। তিনি সঙ্গে থাকা চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখেন ওয়ার্ডরোবের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মেয়েকে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়াশব্দ পাননি। ভেতরের কক্ষের দরজা অটোলক করা। রুবি তখন ঘরের বাইরে এসে জানালার কাচ ভেঙে দেখেন খাটের ওপর তার মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তখন রুবির চিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। পরে তাদের সহযোগিতায় দরজার লক ভেঙে ভেতরে মেয়ের গলা কাটা অর্ধনগ্ন লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর স্থানীয়রা বিষয়টি থানায় অবহিত করলে পুলিশ লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। জেলা পুলিশ ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। হত্যার আগে অদিতাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অদিতার বাবা মারা যান ২০১২ সালে। দুই বোনের মধ্যে সে ছিল ছোট। বড় বোন শরীরিক প্রতিবন্ধী। তিনি ঢাকায় থেকে পড়ালেখা করেন।
অদিতা হত্যায় জড়িত সন্দেহে তার সাবেক গৃহশিক্ষক আবদুর রহিম ওরফে রনিকে (২৮) আটক করেছে পুলিশ। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে আটকের পর তার গলায়, ঘাড়ে ও মাথায় নখের আঁচড় পাওয়া যায়। এর সঙ্গে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে পুলিশ বলছে, আবদুর রহিমই অদিতাকে হত্যা করেছেন।
গতকাল শুক্রবার নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে আবদুর রহিমকে আটক ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন জেলার পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে অদিতা হত্যকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় সে বাসায় একাই ছিল। তার মা কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘটনাটি জানাজানি হয়।
ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন, ঘটনাটি জানার পর প্রথমে থানা পুলিশ, পরে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে যান। তখন অদিতার মা অভিযোগ করেছিলেন, একই এলাকার মো. সাঈদ (২০) ও এক কিশোর (১৪) তার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করত। এ বিষয়ে স্থানীয় সমাজপতিদের কাছে অভিযোগও করেছিলেন, কিন্তু কোনো বিচার পাননি। তার অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তের একপর্যায়ে তারা অদিতাকে একসময় আবদুর রহিম নামে এক ব্যক্তি প্রাইভেট পড়াতেন বলে গোপন তথ্য পান। কিন্তু হঠাৎ অদিতা তার কাছে পড়া বন্ধ করে অন্য শিক্ষকের কাছে পড়া শুরু করে। আবদুর রহিম একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন। তার গলা ও ঘাড়ে সদ্য লাগা আঁচড়ের দাগ দেখা গেছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আটকের পর আবদুর রহিমকে পরীক্ষা করে গলায়, ঘাড়ে ও মাথায় আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক তাকে চিকিৎসকের কাছে নিলে চিকিৎসক আঁচড়টি সদ্য এবং নখের বলে জানান। তখন আঁচড় কীভাবে লেগেছে জিজ্ঞাসা করলে দুই শ্যালিকা আঁচড় দিয়েছে বলে দাবি করে রহিম। কিন্তু যাচাই করে ওই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপর রহিম আঁচড়ের দাগের বিষয়ে আর কোনো জবাব দেয়নি। এতে প্রাথমিকভাবে আবদুর রহিমই অদিতাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যাকান্ডের সঙ্গে পারিবারিক বা অন্য কোনো বিষয় আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত, ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।’
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আবদুর রহিমসহ চারজনকে গতকাল আদালতে হাজির করে পুলিশ। এর মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রহিমকে তিন দিনের রিমান্ড এবং অন্য তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত। গতকাল সন্ধ্যায় অদিতা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই স্পেসল্যাব চৌধুরী প্রমোজ নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে আবদুর রহিম রনির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ এমদাদ রহিমের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে অদিতা হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মুজিব চত্বরে সচেতন নোয়াখালীবাসীর ব্যানারে শত শত তরুণ-তরুণী এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা মানববন্ধনে অংশ নেন। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই কর্মসূচি শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে এসে সমাবেশ করেন বিক্ষোভকারীরা।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে অদিতা হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নোয়াখালীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে নারীদের নিরাপত্তা, কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
