দেশের বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকার দীর্ঘদিন ধরে যে প্রণোদনা দিয়ে আসছে তার ফলাফল মূল্যায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর কতদিন প্রণোদনা দিতে হবে সেটাও মূল্যায়ন করা হবে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কর্মপরিকল্পনা তৈরির অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে প্রণোদনা সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে এখনো রপ্তানি আয় শুধু কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও রপ্তানি বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে বেশ কয়েকটি খাত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনগণের করের টাকা থেকে রপ্তানি ভর্তুকি কতদিন আর চালু রাখা হবে। অনেক খাতেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ওইসব খাত বছরের পর বছর ধরে বাণিজ্য ভর্তুকি হিসেবে কোটি কোটি টাকা নিচ্ছে। কিন্তু তারা রপ্তানি বাড়াতে পারেনি।’ তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের মতামত হচ্ছে রপ্তানিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজার বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে খুব কম সাফল্য রয়েছে। তাই বিভিন্ন খাতে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এ কর্মকর্তা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর সরকার সফলভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কর্মপরিকল্পনার তৈরি করতে সাতটি উপকমিটি গঠন করেছে। একটি উপকমিটি ভর্তুকি বা নগদ প্রণোদনা প্রত্যাহার করার সময় বাণিজ্য খাতগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে সে বিষয়টি দেখছে। তিনি বলেন, উপকমিটিকে মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে, কেন একটি ছাড়া অন্য অনেক খাত বছরের পর বছর সমর্থন পাওয়ার পরও নগদ প্রণোদনা/ভর্তুকি ব্যবহার করে উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (এলডিসি থেকে উত্তরণ) পরিকল্পনার সঙ্গে সরকারকে নগদ প্রণোদনা/ভর্তুকিতে একটি পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতে এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর সরকার প্রণোদনার মতো সহায়তা চলমান রাখতে পারবে না।
তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনার মধ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈচিত্র্যকরণ কৌশল এবং প্রশাসনিক দক্ষতার উন্নতি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘প্রশ্ন হলো কেন বাংলাদেশ তার রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তি দিতে পারে, পোশাক খাতে নীতির মনোযোগের অত্যধিক গুরুত্ব অন্য খাতের জন্য প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।’ তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে প্রণোদনা শুধু পোশাক খাতে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং অন্যান্য রপ্তানি উৎপাদনকেও সমানভাবে উৎসাহিত করা হয়নি। এখন অবশেষে তৈরি পোশাকের বাইরের খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নতুন বাজারের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, ‘আমাদের একটি পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির কথা ভাবতে হবে। তবে নতুন পণ্য এবং নতুন বাজারের দিকে মনোযোগ দিয়ে সেটা করতে হবে।’
চলতি অর্থবছরের বাজেটে পোশাকশিল্প খাতে বিদ্যমান বিভিন্ন রপ্তানি প্রণোদনার সঙ্গে ১ শতাংশ হারে অতিরিক্ত প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ কথা জানান। তিনি জানান, রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতে রপ্তানি প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। পোশাক খাতে এসব প্রণোদনার সঙ্গে ১ শতাংশ অতিরিক্ত প্রণোদনা অব্যাহত রাখায় রপ্তানি আশাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সুতা ও কাপড়ের মতো কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পান রপ্তানিকারকরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অপ্রচলিত বাজারে এসব পণ্য রপ্তানি হলে সরকার আরও ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়। পোশাক রপ্তানিকারকরা গত দুই বছর ধরে সব দেশে অতিরিক্ত ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পেয়ে আসছেন।
