নির্দেশনা না মেনে রাসায়নিক বহন কুরিয়ারের

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৪:১১ এএম

দুই ড্রাম দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ঢাকা থেকে মাগুরা পাঠানোর জন্য গত বুধবার যোগাযোগ করা হয় ইউএসবি এক্সপ্রেস কুরিয়ার সার্ভিসের এলিফ্যান্ট রোডের কার্যালয়ে। গ্রাহক সেজে এই প্রতিবেদক কথা বলেন। কুরিয়ার সার্ভিসটির এ-সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলেন, ‘লিকুইড (তরল) আপাতত “ওয়ার হাউজ” (কুরিয়ার সার্ভিসের গুদাম) নিচ্ছে না। কয়েক দিন আগে “মেট্রো এক্সপ্রেস” কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে বিস্ফোরণে লোক মারা গেছে, এ জন্য আমাদের সমস্ত লিকুইড বহন বন্ধ আছে।’ কবে নাগাদ চালু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো বলা যাচ্ছে না।’

‘ফক্স পার্সেলে’র ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সের কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে প্রথমে বলেন, ‘পাঠানো যাবে, হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত লিখে পাঠান।’ পরে বলেন, ‘আমরা ইন্টারন্যাশনালি (আন্তর্জাতিক) পার্সেল করি, ডমেস্টিক (দেশের অভ্যন্তরে) করি না।’ এসএ পরিবহন পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কাকরাইল কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলেন, ‘লিকুইড কেমিক্যাল বহন বন্ধ আছে। কিছুদিন আগে আমাদের বরিশালের একটি গাড়িতে দাহ্য কেমিক্যাল (রাসায়নিক) বহন করার সময় আগুন লেগেছিল। এরপর থেকে আমরা নিষেধ করে দিয়েছি।’

তবে অন্য একটি মাধ্যমে যোগাযোগ করলে আরেকটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী জানান, রাসায়নিক বেশি পরিমাণে হলে পিকআপ ভ্যানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাবে। সে ক্ষেত্রে টাকা বেশি লাগবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, বেশির ভাগ কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানই দাহ্য রাসায়নিক পরিবহনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা মানে না। দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দাহ্য রাসায়নিক পরিবহনের অনুমতি নেই। এরপরও দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের খামখেয়ালিতে দেশের বেশ কিছু কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান দাহ্য রাসায়নিক বহন করছে। বেশি মুনাফার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজ করছে বছরের পর বছর। কয়েক বছর ধরে কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য বহনেরও অভিযোগ আছে।

কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর সমিতি ‘কুরিয়ার সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর (সিএসএবি) তথ্যমতে, দেশের ১৬০টি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান সিএসএবির সদস্য। দেশের কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৮৫টির।

সিএসএবির সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতি আমাদের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে, তারা কোনো ধরনের কেমিক্যাল বহন করতে পারবে না। প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এরপরও হাজারীবাগে মেট্রো এক্সপ্রেস কুরিয়ার সার্ভিসে এমন বিস্ফোরণের ঘটনা দুঃখজনক। এখানে মালিকপক্ষ, ম্যানেজমেন্ট, বুকিং অফিসারদের বিষয় থাকে। তবে হাজারীবাগের ঘটনায় মালিক জড়িত না বলে জানতে পেরেছি। সেখানে ম্যানেজার, সুপারভাইজার ও বুকিং অফিসার দায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাজারীবাগের দুর্ঘটনার পর আমরা বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি। ইতিমধ্যে কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিসকে ফোন করে সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের পরিবারকে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।’

দাহ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক বহনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক দুর্ঘটনায় হতাহতও হয়েছে। দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পরে আবার শুরু করে। সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার বালুর মাঠ বেড়িবাঁধ এলাকায় মেট্রো এক্সপ্রেস নামের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ওয়ার হাউজের সামনে কাভার্ড ভ্যান থেকে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ মিথাইল ইথাইল কেটন পারক্সাইড নামানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ওই কুরিয়ার সার্ভিসের শ্রমিক ইলিয়াস মরমু (২০) মারা যান। আহত হন আরও ৩ শ্রমিক।

বিস্ফোরণের পর প্রাথমিক তদন্ত করে ফায়ার সার্ভিস। হাজারীবাগ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুস শহীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যানটিতে ৫টি ড্রামে প্রায় ১০০ লিটারের মতো দাহ্য রাসায়নিক ছিল। সেখানে শ্রমিকদের হাত থেকে একটি ড্রাম গাড়ির ভেতরেই পড়ে গেলে বিস্ফোরিত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিস্ফোরিত ড্রামে যে রাসায়নিক ছিল, সেটা দাহ্য পদার্থ এবং পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর; বিশষে করে বিস্ফোরিত হলে এটা বাতাসের সঙ্গে মিশে মানুষের শরীরে গেলে ফুসফুসে সরাসরি আঘাত করে। অনেক সময় আগুনও ধরে যায়। এ ধরনের রাসায়নিক কোথাও রাখার জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমোদন লাগে।’

বিস্ফোরক পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫৪ ধরনের দাহ্য রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ করে পরিদপ্তরটি। এগুলো কুরিয়ার সার্ভিসে বহন করা নিষিদ্ধ। মিথাইল ইথাইল কেটন পারক্সাইড এর মধ্যে অন্যতম। পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এই ৫৪টি আইটেমের মধ্যে কোনোটি যদি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করে তাহলে দেশে ঢোকার পর বন্দর থেকে সরাসরি যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে ওই প্রতিষ্ঠানের মজুদাগারে নিয়ে যাবে। সেখানেই ওই রাসায়নিক ব্যবহার করবে। অন্য কোনো স্থানে বহন করার সুযোগ নেই। আর যেগুলো অন্যত্র নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, সেগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করে নিতে হবে। যেমন জ¦ালানি তেল পরিবহনের জন্য পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বিভিন্ন ট্যাঙ্কার রয়েছে। আবার যদি বিস্ফোরক হয়, তবে সেগুলো পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যেতে হবে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক (ঢাকা) মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানকেই দাহ্য কেমিক্যাল বহনের অনুমোদন দেওয়া হয় না। সুতরাং তাদের এগুলো বহন করার কোনো সুযোগ নেই।’

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৫ জুন ঢাকা থেকে নীলফামারী যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এসএ পরিবহন কুরিয়ার অ্যান্ড পার্সেল সার্ভিসের একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর মির্জাপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, কাভার্ড ভ্যানটিতে অন্যান্য মালামালের মধ্যে রাসায়নিক ছিল। ওই রাসায়নিক থেকে আগুনের সূত্রপাত।

২০১৭ সালের ১০ মার্চ রাজবাড়ীতে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের চলন্ত গাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেবারও গাড়িতে থাকা ২৪টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারির রাসায়নিক থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। এসব দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত কুরিয়ার সার্ভিসের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কুরিয়ার সার্ভিসের অনেক ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না। ঝুঁকি থাকার পরও এসব রাসায়নিক বহনের পেছনে রয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর অতি মুনাফার লোভ। আবার অনেক ক্ষেত্রে মালিককে না জানিয়েই কুরিয়ার সার্ভিসের সুপারভাইজার ও বুকিং অফিসার উৎকোচ নিয়ে এসব দাহ্য রাসায়নিক বহন করছেন।

কুরিয়ার সার্ভিসের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কুরিয়ার সার্ভিসের নানা অনিয়ম দূর করতে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা ম. শেফায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসের জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। তাদের অপারেশনাল কিছু দুর্বলতা ছিল, যা বর্তমানে দূর হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত