দুদিন পার হয়ে গেল সয়াবিন তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কমার প্রভাব নেই। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আগের দামেই সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, পুরনো দামেই যদি বিক্রি করবে তাহলে নতুন দাম নির্ধারণ কেন? তাদের দাবি, বাজারে সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণের অভাব আছে। সে কারণে ভোক্তাদের মাশুল দিতে হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, তারা নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করে। সয়াবিন তেলের দাম মনিটরিংয়ের জন্য আজ বৃহস্পতিবার থেকেই অভিযানে নামবে অধিদপ্তরের টিম।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা তাদের বাজার মনিটরিং দল শনিবার থেকে মাঠে নামাবে।
গত সোমবার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯২ থেকে কমে ১৭৮ টাকার বিক্রি হওয়ার কথা। খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার ১৭৫ থেকে ১৭ টাকা কমে ১৫৮ টাকা হওয়ার কথা। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের দাম নির্ধারণ করা হয় ৮৮০ টাকা। যা আগে ছিল ৯৪৫ টাকা।
গতকাল চট্টগ্রাম নগরীর কাজির দেউড়ি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, একাধিক দোকানে গিয়েও তিনি কম দামে সয়াবিন কিনতে পারেননি। দাম কমানোর ঘোষণার কথা তুললে বিক্রেতাদের সাফ জবাব বেশি দামে কেনা তেল কম দামে বিক্রি করে লোকসান দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘শুধু দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার মধ্যে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়। ভোক্তারা সেই দামে তেল পাচ্ছে কি না এ বিষয়টিও মনিটরিং হওয়া প্রয়োজন।’ জাহাঙ্গীর আলম প্রশ্ন করে বলেন, ‘দুদিনেও নতুন দাম কার্যকর হয়নি। এ ব্যর্থতা কার?’
নগরীর দেওয়ানবাজার এলাকার মুদি দোকানদার আকবর হোসেন বলেন, ‘দাম কমার ঘোষণা আসার আগেই ডিলারের লোকজন আমাদের চাহিদার অতিরিক্ত তেল গছিয়ে দিয়ে গেছেন। এখন এসব তেল কম দামে বিক্রি করলে আমরা আর্থিক ক্ষতির শিকার হব। তাই আগের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আগামী শনিবার থেকে তিনটি মনিটরিং টিম মাঠে নামানো হবে এবং ভোক্তারা যাতে নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেল পায় সেটি নিশ্চিত করা হবে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, সয়াবিন তেলের নতুন দাম নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকারের মনিটরিং টিম অভিযান শুরু করবে।
বরিশালে বিক্রেতারা বলছেন, দাম কমানো হলেও সেই তেল এখনো বাজারে ছাড়েনি কোম্পানি। কম দামের তেল বাজারে আসতে কয়েক দিন সময় লাগবে। নতুন দামের তেল না আসা পর্যন্ত যে তেল বিক্রি হবে, তা আগের দরে কিনতে হবে ভোক্তাদের।
বরিশাল নগরের নতুন বাজার এলাকার ব্যবসায়ী রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোম্পানির লোক এসে নতুন দামের অর্ডার নিয়েছে। তবে সেই তেল দিতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের সঙ্গে আমাদের এখন ঝামেলা হচ্ছে। ১৪ টাকা বেশি দেখে অনেকেই গালিগালাজও করছে। কিন্তু আমরা কী করব।’
নুসরাত জাহান নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে তেলের দাম আগের মতোই আছে। আমাদের সঙ্গে এভাবে না করলেই পারত। আর বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্তারাও রয়েছেন চুপচাপ।’
এ বিষয়ে বরিশালের জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহ সোয়েব মিয়া বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিংয়ের কাজ করছি। মঙ্গলবার বাজার পরিদর্শন করেছি। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের জানিয়েছেন, বাজারে কোম্পানি থেকে নতুন তেল সরবরাহ করেননি। নতুন তেল সরবরাহ হলে তারা কম দামেই বিক্রি করবেন।’ তিনি বলেন, ‘নতুন করে তেল সরবরাহ হওয়ার পরও যদি কেউ দাম বেশি নেয় সে ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
ময়মনসিংহ নগরীর কালীবাড়ি এলাকার দোকানি জোনায়েদ আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার দোকানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে ১৮৫ আর দুই লিটার ৩৭০ ও পাঁচ লিটারের বোতল ৯৩০ টাকায় বিক্রি করছি।’
শরিফুজ্জামান টিটু নামে এক ভোক্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যখন কোনো কিছুর দাম বাড়ে তখন ওই দিন থেকেই বাড়তি দাম নেওয়া শুরু হয়ে যায়। কিন্তু দাম কমলে ব্যবসায়ীদের অজুহাতের শেষ নেই। বাজার মনিটরিং করা দরকার।’
ময়মনসিংহের ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক নিশাত মেহের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে কম দামে সয়াবিন তেল বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলার বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
রংপুরের খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমলেও বোতলজাত তেলের দাম এখনো কমেনি। ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, বাজার মনিটরিং বা তদারকি না থাকার কারণে খুচরা দোকানদাররা যা ইচ্ছা তাই দামে বিক্রি করছে। বর্তমানে মূল্য তালিকাও ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে না হাট-বাজারের দোকানগুলোতে।
গতকাল সরেজমিনে রংপুর সিটি বাজারসহ আশপাশ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন তেল একেক দোকানদার একেক দামে বিক্রি করছেন।
নগরীর বুড়িরহাট বাজারের সূচনা স্টোরের মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তেলের দাম হঠাৎ কমানো হয়েছে। আমি এক লিটার বোতলজাত তেল কিনেছি ১৮১ টাকা আর বিক্রি করছি ১৮৫। লাভ হয় ৪ টাকা। কিন্তু হঠাৎ দাম কমল ১৪ টাকা। এখন আমি কি লস দিয়ে বেচব?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর ভোক্তা অধিকারের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে অধিদপ্তরের নির্দেশনা ছাড়া কোনো অভিযানেই যেতে পারছেন না তারা। আগে নতুন মূল্য নির্ধারণ হলে অভিযোগ পেলে অভিযানে যেতেন। রংপুর ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক আফসানা পারভীন অভিযানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
দিনাজপুর শহরের পাটুয়াপাড়া এলাকার ট্রাকচালক মামুনুর রশিদ আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘সরকার আমাদের কথা চিন্তা করে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৭ টাকা কমিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম সেই হিসাবে কমেনি।’ শহরের মাঝাডাঙ্গা গ্রামের ভ্যানচালক মো. বাবুল বলেন, ‘বাজারে তেলের দাম কিছু কমেছে। কিন্তু তেলের দাম যে পরিমাণ কমানো হয়েছে, সেই হিসেবে বাজারে কমেনি।’
চকবাজারের তেল ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার ঘোষ বলেন, ‘একটা গাড়ি মিলে তেল আনতে গেলে ২০ দিন অথবা এক মাস অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিটি গাড়ির জন্য প্রতিদিন ২ হাজার টাকা করে খরচ দিতে হয়। এতে করে পরিবহন খরচ অনেকটা বেড়ে যায়। সরকারের ঘোষিত দামের থেকে ৪-৫ টাকা বেশি খরচ পড়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘সরকার তো আমাদের এ ক্ষতির জন্য ভর্তুকি দেয় না। তারপরও অনেক সময় তেলের দাম বেড়ে গেলে তা পুষিয়ে নিতে হয়। কিন্তু আকস্মিক তেলের দাম কমিয়ে দিলে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়।’
দিনাজপুরের জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মমতাজ বেগমও বলেছেন, তারা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাজারে অভিযান পরিচালনা করবেন।
রাজশাহীর সাহেববাজার, নিউমার্কেট, শালবাগানসহ আরও বেশ কয়েকটি বাজারেই গতকাল পুরনো দামে সয়াবিন বিক্রি হতে দেখা গেছে। সবখানেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ক্রেতাদের বচসা হতেও দেখা গেছে।
সাহেববাজারে আমেনা বেগম নামে এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা তা কার্যকর করে দেয়। অথচ দেখেন, এক দিন আগে ঘোষণা এলেও কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না।’ আরেক ক্রেতা মতিউর রহমান মনে করেন, ‘আজই (বুধবার) বাজার মনিটরিং করা দরকার ছিল। বাজারে ম্যাজিস্ট্রেট না এলে বিক্রেতারা এ দাম কমাবে না।’
তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ বলেন, ‘আমরা শুনেছি কোনো কোনো ব্যবসায়ী দাবি করছেন, বেশি দামে কেনা তেল তাদের কাছে রয়েছে। এ যুক্তিতে বেশি দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
দিনাজপুরের হাকিমপুর বাজারে তেল কিনতে আসা নাজমা বেগম বলেন, ‘আমরা টিভিতে, পত্রপত্রিকায় খবরে দেখলাম যে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা করে কমিয়েছে। কিন্তু বাজারে তেল কিনতে এসে দেখি এখনো সেই আগের দামেই তেল বিক্রি হচ্ছে।’
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন বরিশালের আল আমিন জুয়েল, দিনাজপুরের কুরবান আলী, ময়মনসিংহের মো. মাঈন উদ্দিন রায়হান, রংপুরের তাজিদুল ইসলাম লাল, রাজশাহীর আহসান হাবীব অপু, হাকিমপুরের (দিনাজপুর) নজরুল ইসলাম খোকন)
