নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা ও সুন্দরবনের হাতকাটালি জমি

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম

সুন্দরবন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ইতিহাস কতটা প্রাচীন? এ নিয়ে তর্ক আছে। বাংলাদেশ ও ভারত অংশের সুন্দরবন অঞ্চলে টিকে থাকা, ক্ষয়িষ্ণু বা চাপা পড়া, জোয়ারের পানিতে উঁকি মারা কিছু স্থাপনা কয়েকশ বছরের ইতিহাস জানাচ্ছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত গড়তে থাকা এক জোয়ারভাটার ভূমিতে অরণ্য আর মানববসতি সব সময় হয়তো একই ভৌগোলিক সীমানায় বিস্তৃত ছিল না। কারণ সুন্দরবন অঞ্চলে প্রচলিত নানা আখ্যান, মৌখিক বয়ান ও বনজীবী পরিবারে টিকে থাকা কিছু জটিল সংস্কৃতি এই অঞ্চলের জনবসতির কোনো একরৈখিক হদিস হাজির করে না। তবে আপাতভাবে এটি জানান দেয়, এখানে বসতি গড়ে আবার বিলীন হয় ও আবার গড়ে ওঠে এবং এখনো বিলীনের আশঙ্কায় দিন গোনে। ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় মনে হয় সুন্দরবনে জনমিতি, জনগোষ্ঠী, আধিপত্য, জীবন-জীবিকা এবং পাশাপাশি অরণ্যের বিস্তার সব বসতি গড়ে ওঠা ও বিলীনের ক্ষেত্রে একই রকম ছিল না।

সুন্দরবন অঞ্চলে জমির বহু শ্রেণিভাগ ও স্থানিক নামপরিচয় আছে। যেমন, হাতকাটালি জমি। নোনা বাদার নদী ও খালের পরে এখানে আগে ছিল ঝোপঝাড়ে ভরা বিস্তীর্ণ চক। এখন এসব বিস্তীর্ণ চকেই গড়ে উঠেছে গ্রাম ও শহর, কৃষিজমি এবং চিংড়িঘের। সুন্দরবন অঞ্চলে জমির এই রূপান্তর ও শ্রেণিগত পরিবর্তন একদিনে হয়নি। প্রচলিত ভাষ্য বলে, ঝোপঝাড় কেটে মূলত মুন্ডা আদিবাসীরাই সুন্দরবন অঞ্চলে কৃষিকাজ ও বসতির জমি ‘আবিষ্কার’ করেছেন। মুন্ডাদের নির্মম পরিশ্রম আর জীবনের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে এসব কৃষিজমি। বাঘের-কামড়ে কত জান গেছে, সাপে-খোপে কেটেছে কত, অনাহারে-বিনা চিকিৎসায় বেঘোরে গেছে কত জীবন। হাতে দা, জীবনজয়ী শ্রম আর অনন্য সামাজিক বীক্ষাই ছিল মুন্ডাদের শক্তি। এই জমিই সুন্দরবন অঞ্চলের ‘হাতকাটালি জমি’। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে বা জমিদার আমলে কিংবা কয়েকশ বছর আগে রাজার আমলেও মুন্ডা, সাঁওতাল, বাগদি, মুসোহর, ওঁরাও, রবিদাস, মণিদাস আদিবাসীদের জোর করেই হাতকাটালি জমি উদ্ধারের কাজে লাগানো হতো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সুন্দরবন অঞ্চলে এর আগে-পরে মুন্ডা, ওঁরাও, বাগদিদের বিচরণ ও বিস্তারের কোনো ইতিহাস ছিল না। কিন্তু নিদারুণভাবে সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডারা আজ ভূমিহীন। মুন্ডাদের হাতকাটালি জমি আর অন্যের জবরদখলে। ভূমিহীনতার এমন অনিবার্য গণিত সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডাদের আজ প্রশ্নহীনভাবে ‘গরিব’ আর ‘অচ্ছ্যূত’ বানিয়ে রেখেছে। নদীতে জালটানা, অন্যের জমি ও ঘের আর ইটভাটার জোনমজুরি এই আজ সুন্দরবনের ভূমিহারানো মুন্ডাদের জীবনপঞ্জিকা।

২০২২ সালের ১৯ আগস্ট সাতক্ষীরার ধূমঘাট অন্তাখালী মুন্ডাপাড়া অবরুদ্ধ করে ভূমি দখলদাররা হামলা করে। জীবন ও জমিন বাঁচাতে গিয়ে নিহত হন নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা। আহত হন অনেকেই। ঘটনার বিচার ও মুন্ডাদের ভূমি-অধিকার নিশ্চিত হয়নি এখনো। এর আগেও এমন বহু হামলা ও উচ্ছেদ ঘটেছে। কিন্তু হতাহতের ঘটনা ঘটেনি মুন্ডাপাড়ায়। এবার তাহলে ঘটল কেন? কারণ এবারই প্রথম মুন্ডা নারী-পুরুষরা হামলার প্রতিবাদ করেছেন। জীবনবাজি রেখে ভূমি দখলকারীদের প্রশ্ন করেছেন। চলতি আলাপখানি নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা হত্যার ন্যায়বিচার ও সুন্দরবন অঞ্চলে মুন্ডাদের ভূমি অধিকার নিশ্চিতের জোর দাবি তুলছে।

কী ঘটেছে অন্তাখালীতে?

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরের ধূমঘাট। এখানেই গড়ে উঠেছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। ১২০০ বিঘা কৃষিজমিন নিয়ে এখানেই অন্তাখালী চক। এখানে মুন্ডাদের স্বত্ব দখলীয় জমি ছিল ২৫০ বিঘা। সব হারিয়ে টিকে ছিল আট বিঘা জমি। আর এই জমি দখল নিয়েই বিবাদ। বিবাদপূর্ণ জমিনের পশ্চিমে মুন্ডাপাড়া, পূর্বে টেরকাঠি ও সুকদেব বাবুর রাস্তা, উত্তরে ঝোরা ও শিরিফলকাঠি এবং দক্ষিণে মোটার চক ও কাপালিপাড়া। জানা যায়, ভারতের রাঁচি থেকে খুলনার কয়রার বেদকাশী গ্রামে আবাদি জমির জন্য বহু মুন্ডা পরিবারকে নিয়ে আসেন তৎকালীন জমিদার। লবীন চন্দ্র মুন্ডা তাদেরই একজন। তার বাবা গুদরা রাম ও দাদু হৌদা রাম মুন্ডা। ১৩০৩ বাংলায় জমিদার দেবেন্দ্রনাথ সরকার ও হরিচাঁদ বাবুর মাধ্যমে বেদকাশী থেকে তারা ধূমঘাট-অন্তাখালী আসেন। জংলা পরিষ্কার করে আবাদি জমি তৈরি করেন। লবীন চন্দ্র মুন্ডার চার পুত্র আদু মুন্ডা, গঙ্গারাম মুন্ডা, মতিলাল মুন্ডা ও বাশিরাম মুন্ডা। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল ও রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন জারি হলে হাতকাটালি জমিতে জমিদারের রায়ত/প্রজা হিসেবে মুন্ডারা দখলস্বত্ব লাভ করেন। এরপর দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের জনমিতি, ভূমিদখল এবং রাজনীতিতে বহু উত্থানপতন হয়।

মতিলাল মুন্ডার এক পুত্র মুল্লুকচান মুন্ডা। মুল্লুকচান ১৯৪৮ সালে আটশ টাকার বিনিময়ে তাদের ৮ বিঘা স্বত্বদখলীয় হাতকাটালি জমি স্থানীয় মাদার গাইনের কাছে বন্ধক রাখেন। কিন্তু মাদার গাইন বন্ধকি জমিকে জাল দলিল করে নিজ নামে করে নেন এবং গফুর সরদারের কাছে বিক্রি করেন। শ্যামনগরে বহু রাস্তার মোড় আছে মানুষের নামে। নিলু মিস্ত্রির মোড়, ভিমের মোড়, পাচুর মোড়। আর এই পাচু সরদারের ছেলেই গফুর সরদার। ক্রয়সূত্রে মালিক হয়ে গফুর সরদারের উত্তরাধিকাররা এই জমি বহু বছর ভোগদখল করতে থাকেন। নরেন্দ্রনাথ ও ফণীন্দ্র মুন্ডা ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি এম শোকর আলী ও ইউপি সদস্য গাজী গোলাম মোস্তফার কাছে এ জমি বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের বিবাদী গফুর আলীর ছেলে রাশিদুল ইসলাম ও এবাদুল ইসলাম। সালিশে সব কাগজপত্র নিরীক্ষা করে ইউনিয়ন পরিষদ রায় দেয় বিবাদী পক্ষ রাশিদুল ও এবাদুল শুধু ১ নম্বর দাগের জমির ক্রয়সূত্রে মালিক এবং এই জমিই তারা ভোগদখল করতে পারবেন কিন্তু ১৪ নম্বর দাগের জমি ভোগদখল করতে পারবেন না। ইউনিয়ন পরিষদ ১৪ নম্বর দাগের জমি নরেন্দ্রনাথ ও ফণীন্দ্র মুন্ডাকে ভোগদখল করার অনুমতি দেয়। ২০২২ সালের জুন মাসে ইউনিয়ন পরিষদ আবারও বিবাদপূর্ণ জমির বাদী ও বিবাদী পক্ষকে নিয়ে বসে এবং সব কাগজপত্র নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয় আদালতে মামলা চলমান থাকায় যেভাবে ভোগদখল চলছে সেভাবেই চলবে এবং জমি নিয়ে কোনো ধরনের সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। কিন্তু ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিবাদপূর্ণ ৮ বিঘা জমিতে আবারও রাশিদুল ও এবাদুল দুবার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে যায়।

২০২২ সালের ১৯ আগস্ট সকাল ৭টার দিকে দা, শাবল, লোহার রড, লাঠি, কাঁচিসমেত প্রায় ২০০-২৫০ বাঙালি পুরুষের একটি দল নিয়ে রাশিদুল ও এবাদুল ধূমঘাট অন্তাখালী মুন্ডাপাড়া অবরুদ্ধ করে। ২০০ কেজি ধানবীজ থেকে জন্মানো পাতো (ধানচারা) সব বিনষ্ট করে এবং জমিতে জোর করে ট্রাক্টর নামিয়ে সদ্য রোপণ করা বীজতলা ল-ভ- করে দেয়। মুন্ডা নারীরা ঘরের কাজ ফেলে ধানচারা ও বীজতলা বাঁচাতে কাদাজমিনে নেমে ট্রাক্টর আগলে দাঁড়ান। নারীদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা শুরু হলে নরেন্দ্র মুন্ডা তাদের বাঁচাতে জমিনে নামেন। মুন্ডারা হামলাকারীদের হাতে-পায়ে ধরে বীজতলাটা বাঁচাতে চান, কারণ এই ধানচারা প্রায় ৫০ বিঘা জমিনে রোপণ করা সম্ভব ছিল। হামলাকারীরা নরেন্দ্র মুন্ডাকে বুকে-পিঠে আঘাত করলে তিনি কাদাজমিনে লুটিয়ে পড়েন। হামলাকারীরা নরেন্দ্র মুন্ডার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে। হামলায় বিলাসী মুন্ডা, রিনা মুন্ডা ও সুলতা মুন্ডা গুরুতর জখম হন। ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে পুলিশ আসে। ততক্ষণে হামলাকারীরা নিরাপদে সরে পড়ে। কাদাজমিন থেকে বহুকষ্টে অজ্ঞান নরেন্দ্র মুন্ডা ও জখমপ্রাপ্তদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নরেন্দ্রকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন ২০২২ সালের ২০ আগস্ট বিকেলে তিনি মারা যান।

মুক্তির নায়ক নরেন্দ্রনাথ

নরেন্দ্রনাথ মুন্ডার বাবা মুল্লুকচান ও মা গুণমণি দাসী। নরেন্দ্র মানিকখালীতে প্রাথমিকে পড়েছেন। কৌড়িয়ার গ্রোত্রের নরেন্দ্রনাথ এলাকায় ‘গোসাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। কাকাতো ভাই সুশীল মুন্ডার সঙ্গে নরেন্দ্রনাথও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন, পরে নরেন্দ্র সশস্ত্র যুদ্ধ থেকে সরে এসে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করতে থাকেন। সুশীল মুন্ডা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও নরেন্দ্র পাননি। সুমিত্রার সঙ্গে বিয়ে হয় নরেন্দ্র মুন্ডার। তাদের ৫ পুত্র ও ১ কন্যা। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে অরণ্য বাঁচাতে ইতিহাস কাঁপানো উলগুলান বিদ্রোহ সূচনা করেছিলেন বিরসা মুন্ডা। নরেন্দ্র যেন তারই উত্তরাধিকার।

সবখানেতেই ‘গফুরের জাল’

শুধু শ্যামনগরের অন্তাখালী নয়, মুন্ডাদের ভূমিদখলে সাতক্ষীরার তালায়ও দেখা গেল আরেক গফুর সাহেব। বেতনা নদীর ধারে তালার নগরঘাটা ইউনিয়নের এক ছোট্ট বসতি বাঁকখালী মুন্ডাপাড়া। জনসংখ্যা প্রায় ২০০ জন। এদের প্রায় সবাই খুলনার বেদকাশী বা শ্যামনগরের মুন্ডাপাড়া থেকে নিজ জন্মমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে এখানে এসেছেন। দিনমজুরি আর ইটের ভাটাই এখন তাদের নিয়তি। এদেরই একজন চিত্ত মুন্ডা, বাড়ি ছিল শ্যামনগরের ধূমঘাট অন্তাখালী। চিত্তর বাবা যতীন মুন্ডা। যতীনের বাবা বিনোদ, তার বাবা কিষ্টপদ, কিষ্টপদের বাবা অতুল, অতুলের বাবা সুধান্য, সুধান্যর বাবা গঙ্গারাম। আর এই গঙ্গারাম লবীন চন্দ্র মুন্ডার ছেলে। অন্তাখালীতে নিহত নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা ও বাঁকখালীর চিত্ত মুন্ডা সবাই একই বংশলতিকার। সাতক্ষীরার গফুর সাহেব বেতনা নদীর তীরে বাঁকখালী চকে ৭৫০ বিঘা জমির মালিক হন। জমি প্রস্তুত ও চাষাবাদের জন্য শ্যামনগর থেকে ১৯৪৮ সালের দিকে বেশ কয়েক পরিবার মুন্ডাদের বাঁকখালী আনা হয়। এ সময় শ্যামাচরণ, বিপিন, বিষ্টু, কালীপদ, গুরুচরণ, মানিকরাম, সুপদের সঙ্গে অন্তাখালী থেকে যতীন মুন্ডার পরিবারও বাঁকখালী চলে আসেন। প্রতি পরিবারকে তিন বিঘা করে চাষের জমি দেওয়ার কথা থাকলেও মুন্ডারা তা পাননি। ভূমিহীন মুন্ডাদের জন্য ২০০৫ সালে নিজে জায়গা কিনে ৩০ পরিবারের থাকার বন্দোবস্ত করেন ফাদার লুইজি। সাতক্ষীরার যেসব অঞ্চলে মুন্ডারা আছেন এবং উচ্ছেদ হয়েছেন সেসব জমির বসতিস্থাপনের ধারাবাহিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় মুন্ডারা নিজেদের তৈরি হাতকাটালি এবং স্বত্বদখলীয় জমি হারিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় বাঙালি প্রভাবশালীরাই মূলত মুন্ডাদের এসব জমি জবরদখল করেছেন এবং নিজ জমিন থেকে মুন্ডাদের উচ্ছেদ হতে বাধ্য করেছেন। শ্যামনগরের অন্তাখালীর গফুর সরদার কিংবা তালার বাঁকখালীর গফুর সাহেবের জালেই আজ বন্দি হয়েছে সুন্দরবনের মুন্ডাদের ভূমি-নিয়তি। এ জাল চুরমার করেই বিকশিত হোক সুন্দরবন অঞ্চলে মুন্ডাসহ সব প্রান্তজনের জনবসতির বিস্তার।

লেখক: লেখক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত