গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতাই অবাক হয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ক্ষুব্ধও। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলের কারণে তারা কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছেন না। ভোট বন্ধের ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এমন বেকায়দায় পড়েছেন যে, তারা কথা বলতেও রাজি হচ্ছেন না। যারা বলছেন, তারাও সতর্কভাবে কথা বলছেন।
গাইবান্ধার ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, ভোট বন্ধ করার এখতিয়ার তাদের আছে। ভোট নিয়ে কোথাও কোনো নাশকতা, সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পেরেছি, কোনো কেন্দ্রে অন্য কেউ অনিয়ম করে ভোট দিচ্ছেএমন অভিযোগ উঠেছে।’ তিনি বলেন, ‘যদি কেউ এমন কাজ করে তাকে আইনের আওতায় আনা যেত। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্য অন্যকে ভোট বঞ্চিত করা যৌক্তিক কি না সেটা নির্বাচন কমিশন দেখবে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, ফারুক খান, কাজী জাফরউল্যাহসহ আরও কয়েক নেতাও একই মন্তব্য করেন। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন।
তবে দলের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাইবান্ধার ভোট বন্ধ করে দেওয়ার দুদিন পার হলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে কোনো অভিযোগ না করায় বিষয়টিকে হজম করে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভোট বন্ধের ঘটনা যেহেতু ঘটেই গেছে তাই ইস্যুটি কাজে লাগাতে হবে। সে জন্য নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার কথাটি বেশি বেশি আলোচনায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলটির প্রায় এক ডজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে ভোট বন্ধের বিষয়ে কথা বললে তারা দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, এটা তাদের জন্য এক ধরনের ধাক্কা। অবশ্য এই ধাক্কা তাদের নানা দিক থেকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। গাইবান্ধা উপনির্বাচন ইস্যুটি আওয়ামী লীগকে ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা ভাবনায় ফেললেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো অবস্থানে যাবে না দলটি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাপ বোধ করে তেমন কোনো বক্তব্য-বিবৃতিও দেওয়ার পরিকল্পনা নেই দলের নেতাদের।
আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইস্যুটি নিয়ে দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতা ও গাইবান্ধার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি ভেবেচিন্তে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে দলের হাইকমান্ডের। গাইবান্ধা আওয়ামী লীগ নেতাদেরও নির্বাচন কমিশনবিরোধী যে অবস্থান গত বুধবার ছিল, সেখান থেকেও তাদের ফিরে আসার নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে আরও জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করলে গাইবান্ধা নির্বাচনে যে প্রক্রিয়ায় ঢাকায় বসে নির্বাচন কমিশন ভোট বন্ধ ঘোষণা করেছে তাতে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা হতবাকই হয়েছেন। নেতারা মনে করেন, ইসির এ সিদ্ধান্ত সারা দেশের নেতাকর্মীদের মনোবলে আঘাত হেনেছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কমবেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও দেখছে আওয়ামী লীগ। তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাইবান্ধার ভোট নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ও খোঁজখবর নেবে তারা। প্রকৃত ঘটনা জানতে কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ শুরু করেছেন। নির্বাচন একেবারে বন্ধ ঘোষণা করার মতো বড় ঘটনা কী ছিলসেটি খুঁজে বের করা হবে। তিনি আরও বলেন, ত্রুটি-বিচ্যুতি পেয়ে থাকলেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কোনো অবস্থানে যাবে না। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবে। সে জন্যই মূলত ঘটনা অনুসন্ধান করবেন তারা।
সম্পাদকমন্ডলীর ওই নেতা বলেন, ইসির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হিতে বিপরীত হবে। বিএনপিসহ তাদের সঙ্গী অন্য রাজনৈতিক দল এতে সুবিধা পাবে। সেই আশঙ্কা থেকে নীরব ভূমিকা থাকবে আওয়ামী লীগের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাইবান্ধা ইস্যুতে বিষ খেয়ে হজম করার মতো ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে এটা মেনে নিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। সেটাই শ্রেয় বলে মনে করেন দলীয় হাইকমান্ড। ইসির সিদ্ধান্ত না মেনে সমালোচনায় গেলে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।’
সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে তাদের সেটি বিবেচনায় এনে ওই সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। আমরাও চাই ইসির প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ^াস ফিরে আস্কু।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ধরেই নিয়েছি নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতি আস্থা ফেরানোর জন্য এ কৌশল গ্রহণ করেছে।’
ওই মন্ত্রী আরও বলেন, ‘গাইবান্ধার উপনির্বাচন নিয়ে প্রাথমিকভাবে যেসব তথ্য আমাদের কাছে এসেছে এবং নির্বাচনী কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সেখানে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভোট বন্ধ করার ঘোষণা আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে হতবাক করেছে।’
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। আর তাই এ কমিশনের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে যেতে চায় না ক্ষমতাসীনরা। তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্য অনাহূত-অযাচিত মনে হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ছিল তার বক্তব্য। তাতে করে আওয়ামী লীগের অনেকের ভেতরেও সিইসি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাইনি আমরা। গাইবান্ধার উপনির্বাচনে যথাযথ আইনে ভোট বন্ধ হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন আমাদের ভেতরে আছে, সন্দেহও ঘনীভূত হয়েছে। আগামী নির্বাচন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হবে। কেন্দ্রে ইভিএম দখলে নিয়ে ভোট দেওয়ার অভিযোগ তোলা এবং ভোট বন্ধ ঘোষণা করা ইভিএম বিতর্ক উসকে দেওয়া বা ইভিএম বিরোধিতার কোনো ইঙ্গিত কি না সেটাও ভাবা হচ্ছে।’
গাইবান্ধার ভোট বন্ধ নিয়ে গতকাল ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে সিইসি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন আশা করি। গাইবান্ধা উপনির্বাচনে কী কারণে ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।’ তিনি বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা হয়নি উল্লেখ করেন প্রিসাইডিং অফিসাররা।’
আওয়ামী লীগের অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ গণমাধ্যমে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ হঠাৎ বন্ধের ঘোষণায় হতবাক হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু আমরা বা আমি হতবাক নই, দেশবাসীও হতবাক হয়েছেন।’
হাছান মাহমুদ বলেন, ‘নির্বাচনী এলাকায় কোনো জায়গায় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ৫০০ কিলোমিটার দূরে বসে কমিশন ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই ক্যামেরার ফুটেজ কেমন, কানেকটিভিটি কেমন সেটা তো বড় প্রশ্নের ব্যাপার।’
