ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক গানের অন্যতম শিল্পী কবির সুমনের এবারের বাংলাদেশ সফর নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যথেষ্ট আলোচনার রসদ জুগিয়েছে কবির সুমনের এবারের কনসার্ট। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠান করার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পেয়ে শিল্পীকে দেশে আমন্ত্রণ জানানো, সংবাদ সম্মেলন, টিকিট বিক্রি যাবতীয় কাজ শেষে জানা যায় এই ভেন্যুতে অনুষ্ঠান করা যাবে না। ডিএমপি তাতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু সুমন ভক্তরা নন, সংস্কৃতিকর্মী, মিডিয়াকর্মী থেকে ইন্টেলেকচুয়ালরাও সমালোচনা করেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের ঠিক আগের দিন বিকালে আয়োজকরা জরুরিভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে যে মনোভাব পোষণ করেন তাতে মনে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের পক্ষে যে ধরনের জনমত গঠিত হয়, সেটি অনেকটা ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’র মতো অবস্থা। আয়োজকরা জানান, শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা থাকা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু দেশ ও দেশের স্বার্থ আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য যদি আমাদের শো-টাও না হয়, তাতেও আমাদের কোনো আফসোস থাকবে না। অর্থাৎ অনুষ্ঠানের ভেন্যু পরিবর্তন হওয়ায় তাদের বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়নি। তারা শুধু টিকিট ক্রেতাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কারণ অনেক শ্রোতা নতুন ভেন্যু সম্পর্কে জানতে না পেরে আগের ভেন্যুতে চলে আসতে পারেন, এতে তাদের সময় কিছুটা ক্ষেপণ হবে। তবে সেখানে আয়োজকদের স্বেচ্ছাসেবী দল থাকবেন, যারা শ্রোতাদের নতুন ভেন্যুর ঠিকানা বলে দেবেন। এজন্যই বোধ হয় সুমনের এবারের তিন দিনের আয়োজনের প্রথম দিন অর্থাৎ গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে হওয়া শোটি যে সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সেটি হয়নি।
প্রথমে শো শুরুর কথা ছিল দুপুর ২টা থেকে। কিন্তু নতুন ভেন্যু পাওয়ার পর আয়োজকরা জানান, গেট ওপেন হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। সাড়ে ৪টায় শো শুরু হবে। কিন্তু শো শুরু হয় সোয়া ৫টায়। এর আগে শ্রোতারা অডিটরিয়ামে ঢোকার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। টিকিটের শোয়ে শ্রোতারা কিছুতেই সুমনের গান ছাড়া অন্যকিছুকে ভালোভাবে নেননি। তাইতো অনুষ্ঠানের টাইটেল স্পন্সর বেঙ্গল চায়ের কর্মকর্তা বেশ লম্বা বক্তৃতা দিতে গেলে তাকে হাততালির মাধ্যমে স্টেজ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
এরপরই এলেন সুমন। সেই চিরচেনা হাসিমুখে সুমন। পরনে হাফহাতা জলপাই রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি। সালাম ও আদাব দিয়ে শুরু করলেন তিনি। শুরুতে বসেই নিজের সংগীত ক্যারিয়ারের ছোট্ট বর্ণনা দিলেন। তাতে উঠে এলো মাত্র ১৭ বছর বয়সেই আকাশবাণী কলকাতায় আধুনিক ও রবীন্দ্রসংগীতে উচ্চ শ্রেণির শিল্পী হিসেবে এনলিস্টেড হন। কিন্তু নজরুল সংগীত অনেক পছন্দের হলেও অডিশনে ভালো গাইতে পারেননি বলে বি গ্রেড পেয়েছিলেন। গান শুরুর আগে মঞ্চে ডেকে নিলেন তিনজন সহশিল্পীকে। সে ব্যাপারেও নিজস্ব রসবোধের সঙ্গে জানালেন, আগে একাই মঞ্চে উঠতাম, কাউকে লাগত না। এখন বুড়ো হয়েছি। উঠতে বসতে কষ্ট হয়, তাই সাহায্যের দরকার হয়, হতেই পারে বুড়ো বয়সে। আমার দুরারোগ্য স্নায়ুর অসুখ হয়েছিল। এজন্য এখন আর গিটার বাজাতে পারি না, আর কোনোদিন পারবও না। ফলে আমার সঙ্গে বাজানোর জন্য বন্ধুদের দরকার হয়। এজন্য আমার অবশ্য কোনো দুঃখ নেই। গুরুদের কৃপায় এখনো একটু আধটু গান গাইতে পারি, এটাই আনন্দ।’
গানের একপর্যায়ে মজা করে বলেন, ‘শরীরের যে অবস্থা, তাতে মনে হয় শুয়ে শুয়ে গাইতে পারলে আরও ভালো হতো (হা হা হা)।’ এ কথা শুনে দর্শকরা বলে ওঠেন, আমাদের তাতেও চলবে। সুমনের প্রথম দিনের প্রথম পরিবেশনা ছিল তার বিখ্যাত গান ‘একেকটা দিন’। এরপর একে একে গেয়ে শোনান তার জনপ্রিয় গানগুলো। আরও ছিল কিছু রবীন্দ্রসংগীত।
কবির সুমনের বিখ্যাত গান ‘তোমাকে চাই’-এর ত্রিশ বছর উদযাপন উপলক্ষে ‘পিপহোল’ আয়োজিত এই তিন দিনের কনসার্টের প্রথম দিন ছিল আধুনিক বাংলা গানের আসর। একই মঞ্চে আগামী ১৮ তারিখ তিনি করবেন বাংলা খেয়ালের অনুষ্ঠান। আর শেষ অনুষ্ঠানটি করবেন আধুনিক বাংলা গানের, ২১ অক্টোবর।
