মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি বাণীকে ধারণ করে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে বাউল সম্রাট লালন সাঁইর তিন দিনের স্মরণোৎসব। এ মরমি সাধকের ১৩২তম তিরোধান দিবসে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া আখড়বাড়ীতে শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে আগামী বুধবার পর্যন্ত। করোনার কারণে আগের দুই বছর হয়নি এ স্মরণোৎসব।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমির উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহাবুবউল আলম হানিফ। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী দিনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন কুষ্টিয়া-কুমারখালী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম সরোয়ার জাহান বাদশা, পুলিশ সুপার মো. খাইরুল আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক হাজী রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, কুমারখালী পৌর মেয়র সামস্জুজামান অরুণ। দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল মনসুর। তৃতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী। আলোচনা সভা শেষে প্রতিদিন রাতে লালনমঞ্চে চলবে লালন সংগীতের আসর। খন্ড খন্ড মজমায় চলবে ভাবের আদান-প্রদান আর তত্ত্ব আলোচনা। লালনমঞ্চে লালন একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি ও লালনসংগীত শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর রাতভর চলবে সংগীতের আসর। আখড়াবাড়ীর মাঠে বসেছে গ্রামীণ মেলা।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, এর মধ্যে আখড়াবাড়ীর বাইরে মাঠে বিশাল প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। জড়ো হয়েছেন সাধু ভক্ত-অনুসারীরা। ঠাঁই নিয়েছেন সাঁইজির তীর্থভূমিতে। সাঁইজির মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আলী শাহ বলেন, আধ্যাত্মিক চিন্তার দার্শনিক মহামতি লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন দেশ-বিদেশে মুক্তচিন্তক গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানে এসে ভক্ত অনুসারীরা একেবারেই নিজস্ব ঘরানার রীতিতে আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সাঁইজিকে স্মরণ করেন।
নাট্যকার ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাউল সাধক ফকির লালন ছিলেন আধ্যাত্মিক দর্শন ও ভাবজগতের শিরোমণি। ফকির লালন সাঁইজি একাধারে গীতিকার, সুরকার, গায়ক, বাউল সম্প্রদায়ের গুরু, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে মানবতাবাদী মনীষী ও লৌকিক ধর্মাচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম পুরোধা। তার গানের বাণীগুলো দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গবেষণা ক্ষেত্রে বিস্তৃত। লালন কেবল বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষ নয়, গোটা বিশ্বের গবেষকদের কাছে আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকবৃন্দ লালনকে নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করছেন। তারাও ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন লালনচর্চা কেবল লালনদর্শনের ভিত্তিতেই সম্ভব। তবে এখন সেভাবে লালনচর্চা হচ্ছে না বলে মনে করেন এ গবেষক। তিনি বলেন, লালন নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন বা করছেন তারা সবাই অভিন্ন মত দেন যে, সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে লালনকে আটকে রেখে লালনচর্চার দ্বার মুক্ত করা যাবে না। এ কাজটি করতে হলে অবশ্যই এখানে দেশে দূরদূরান্ত থেকে আগত বাউল সাধুদের মনের ভাষা বুঝে তাদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে লালন ভাবনাকে প্রসারণের সুযোগ করে দিতে হবে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে আগত ভক্ত অনুসারী বাউল সাধকদের আচার অনুষ্ঠান পালনের সব রকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তাদের খাবার, সৌচকার্য, স্থান সংকুলানসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব রকম প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। আশা করি, সবকিছু সুন্দর পরিবেশের মধ্যদিয়ে শেষ করতে পারব।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. খাইরুল আলম জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি থাকছে সাদা পোশাকের পুলিশও। সিসি ক্যামেরা, তল্লাশি চৌকিসহ বিভিন্ন স্পটে নজরদারির জন্য পৃথক পৃথক টিম গঠন করা হয়েছে।
