‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য শেখ রাসেল। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর দেশে চলমান রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে আনন্দের দ্যুতি হয়ে জন্ম নেয়। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান রাসেল ছিল বাড়ির সবারই অতি আদরের, ছিল পরিবারের পুতুল। সবার সব দুঃখ-কষ্ট তার সঙ্গে দেখা হলে, কথা হলে মুহূর্তেই দূর হয়ে যেত। বঙ্গবন্ধু পরিবারের জাদুর কাঠি হিসেবে সব সুখই তাকে ঘিরে।’ এভাবেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের স্মৃতিচারণ করেন তার খালাতো ভাই জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি শেখ শহীদুল ইসলাম।
সাবেক এই শিক্ষামন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাসেল ছিল অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির। ছোটবেলা থেকেই ছিল ব্যতিক্রমী ও বুদ্ধিমান এবং বেশ মেজাজিও। মাত্র চার বছর বয়সে শিশু শ্রেণিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। রাসেলের কাছে ওই বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপালের প্রশ্ন ছিল, ‘এই স্কুলে কেন ভর্তি হতে চাও?’ অধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষককে তাক লাগিয়ে দিয়ে রাসেল উত্তর দেয়, ‘আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাই, এ জন্যই এই স্কুলে আসলাম।’
আজ ১৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অতি আদরের সন্তানতুল্য ছোটভাই শেখ রাসেলের জন্মদিন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বছর থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্মদিন ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসে, চোখের জল চিকচিক করতে থাকে খালাতো ভাই শেখ শহীদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘রাসেলকে চার বছর বয়সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়েছিল। প্রথন দিন আমি রাসেলকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে গিয়েছিলাম। শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে রাসেলকে। ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর আগে স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষিকা (প্রিন্সিপাল) ছিলেন রাজিয়া মতিন চৌধুরী। তার সঙ্গে রাসেলের ভর্তির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলাম। ওই শিক্ষিকা রাসেলকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘অনেক স্কুল আছে, তুমি এই স্কুলে পড়তে চাও কেন?’ রাসেলের পরিস্কার জবাব, ‘আমার ভাই-বোনেরা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, আমিও ইউনির্ভাসিটিতে পড়তে চাই, তাই এ স্কুলে আসলাম।’
শেখ রাসেলের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে শেখ শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘রাসেলের পড়াশোনায় সাহায্য করার জন্য বাসায় একজন গৃহশিক্ষক রাখা হয়েছিল। এই গৃহশিক্ষকের নাম ছিল গীতালি দাসগুপ্ত। তিনি আমাদের তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ফণীভূষণ মজুমদারের আত্মীয় ছিলেন। তিনি অনেক যতেœর সঙ্গে রাসেলকে পড়াতে থাকেন। এভাবেই রাসেলের লেখাপড়া চলে। আমি যখন রাসেলের স্কুলে যেতাম তার শিক্ষকরা তার বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কথা বলতেন। এভাবেই সে লেখাপড়া করে বড় হয়ে উঠতে লাগল।’
শেখ রাসেল বয়সে তার ১৬ বছরের ছোট ছিলেন জানিয়ে শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তাকে খুব আদর করতাম। আসলে রাসেল আদর নিতে পারত। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর পরিবার যখন গৃহবন্দি হয়ে যায় তখন রাসেলকেও তার পরিবারের সঙ্গে গৃহবন্দি হয়ে সময় কাটাতে হয়েছিল। বত্রিশ নম্বরের বাড়ি থেকে ধানম-ি ১৮ নম্বর সড়কে একটি ছোট্ট বাসায় গৃহবন্দি থাকতে হয়েছে পুরো পরিবারকে। ওই বাড়িতে থাকতে গিয়ে শিশু বয়সেই কারাগারের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল রাসেলকে।’
শেখ রাসেলের জন্মক্ষণের স্মৃতিচারণ করে তার এই খালাতো ভাই বলেন, ‘রাসেলের জন্মদিনের দিন তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় থাকতে পারেননি। কারণ সেদিন চট্টগ্রামে নির্বাচনের প্রজেকশন মিটিং ছিল। সেই প্রজেকশন মিটিংয়ে যোগদানের জন্য মিসেস ফাতেমা জিন্নাহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন মিসেস ফাতেমা জিন্নাহকে বলেছিলেন তার স্ত্রী সন্তানসম্ভাবা তিনি চট্টগ্রাম যেতে পারবেন না, তখন ফাতেমা জিন্নাহ বললেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে (শেখ মুজিবুর রহমান) ছাড়া চট্টগ্রাম যাবেন না। বঙ্গবন্ধু এই কথা তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেসাকে জানালে তিনি বলেন, ‘তুমি যাও, এদিকটা আমি সামলাব।’ এমনই এক পরিস্থিতিতে সেদিন ধানম-ি ৩২ নম্বরের বাসায় স্বাভাবিকভাবে শেখ রাসেলের জন্ম হয়। শেখ রাসেল ওই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করার পরপরই আমাদের বাড়িতে আনন্দ উল্লাস বয়ে যায়।’
শেখ রাসেলের নামকরণের নেপথ্যের তথ্য তুলে ধরে শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তার নাম রাসেল রেখেছিলেন, কারণ সেই সময় বার্ট্রান্ড রাসেল নামে একজন লেখক ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাপী সাধারণ জনগণের পক্ষে কথা বলতেন। বঙ্গবন্ধু বার্ট্রান্ড রাসেলের আদর্শে খুব আকৃষ্ট ছিলেন। কামাল ও জামালের (বঙ্গবন্ধুর দুই সন্তান) নামের সঙ্গে রাসেল নামটারও মিল ছিল। তাই তার নাম রাখা হয় রাসেল।’
রাজনৈতিক কারণে মাঝেমধ্যেই বাবা কারাবন্দি থাকায় রাসেল তার স্নেহ অনেকটাই কম পেয়েছেন জানিয়ে খালাতো ভাই বলেন, ‘ওর দুর্ভাগ্য হলো যে পিতার সাহচর্য সে বেশি পায়নি। ৬৪ সালের পরে (বঙ্গবন্ধু) রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়েছে শেখ মুজিবকে। ৬৬ সালে তিনি ছয় দফা আন্দোলন করলেন, তারপর থেকে ব্যস্ততার সঙ্গে তিনি কারাগারে বন্দি হন। ১৯৬৯ সালে যখন বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে বের হন তখন রাসেল ৫ বছরের শিশু। ওই সময়ে কারাগারে যখন আমরা বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যেতাম রাসেল আমাদের সঙ্গে যেত। সে তার বাবাকে ছেড়ে যেতে চাইত না। তখন তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে আসতে হতো। রাসেলের কাছে জেল ছিল আব্বার বাড়ি! ধানম-ির বত্রিশ নম্বর ছিল আম্মার বাড়ি! রাসেলের জীবনে এইটা একটা ঘাটতি।’
ছোটবেলা থেকেই রাসেলের ছবি তুলে অ্যালবাম করে রাখতেন, কিন্তু তা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হামলায় ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে হারিয়ে যায় বলে জানান শেখ শহীদুল ইসলাম। বাবার ¯েœহ থেকে রাসেলের বঞ্চিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা পেশ করলেন, এরপর কারাগারে চলে গেলেন। তখন আমরা দেখেছি যে রাসেল নিজের বুদ্ধিতে বুঝতে পেরেছিল এ বাড়িতে কিছু একটা হয়েছে এবং সে কষ্ট পেত। এই কষ্টটা সে নিজের মধ্যে চেপে রাখত। কারাগারে বাবাকে দেখতে গেলে সে বলত, ‘আব্বু তুমি বাড়ি চলো।’ সে তার বাবার হাত ধরে রাখত। ছেলের এরকম বাবার আদরের অভাব বেগম মুজিবকেই পূরণ করতে হতো। বেগম মুজিবই ছিলেন তার বাবা এবং মা। আমরা সবসময়ই দেখতাম বেগম মুজিব রাসেলের প্রতি একটু বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। সে যেন পিতার অভাব অনুভব না করতে পারে। সেইভাবেই তাকে যতœ করা হতো।’
এ প্রসঙ্গে শেখ শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলার আসামি করা হয় এবং তাকে আটক করে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যাওয়া হয়। এই সময়টাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেশ কিছুদিন আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এই সময় রাসেল বড় আনমনা হয়ে গিয়েছিল। তার মনোজগতের পরিবর্তন আনতে একটি ছোট তিন চাকার লাল সাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছিল। যাতে সে সাইকেলটা নিয়ে খেলাধুলা করে, মন খারাপ না থাকে। এভাবেই কেটেছে তার শিশুকাল, পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছিল।’
