দেশে ডেঙ্গু রোগীর পাশাপাশি মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গতকাল বুধবার এ বছর মোট মৃত্যু ১০০-এর ঘর পেরিয়ে ১০৬-এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে চলতি অক্টোবরের ১৮ দিন শেষে মৃত্যু ৫০-এর ঘর পেরিয়ে ৫১ হয়েছে; অর্থাৎ এ বছরে মৃত্যুর ৪৮ শতাংশই হয়েছে ১৮ দিনে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ২২ বছরের মধ্যে এ বছর গতকাল পর্যন্ত মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ১৭৯ জনের মৃত্যু ছিল সর্বোচ্চ সংক্রমণের বছর ২০১৯ সালে। সে বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ৮০২ জন।
গতকালের আগে পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল গত বছর। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন রোগী এবং মারা গিয়েছিল ১০৫ জন। এ বছর শেষ হতে এখনো বাকি আড়াই মাসের মতো। সে হিসাবে গড় দৈনিক রোগী ও মৃত্যু বছর শেষে এ বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড এবং রোগী অনুপাতে মৃত্যু আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন অবস্থায় ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এটাই এ বছরে এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল ১২ অক্টোবর, ৮ জনের। সেদিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৬৪৭ জন। গতকাল রোগী ভর্তি হয়েছে ৮৬৪ জন।
ডেঙ্গুতে এ বছর মৃত্যু বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাওয়া এবং রোগীদের শারীরিক জটিলতা বেড়ে যাওয়াকেই দেখছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি দেরিতে হাসপাতালে আসা ও চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হওয়াকেও কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. শেখ দাউদ আদনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু নিয়ে সবার মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটা হচ্ছে ডেঙ্গুর ধরন বদলানোর জন্য। তিন বছর পর পর ভাইরাসের ধরন বদলায়। ২০১৮-১৯ সালের দিকে একবার এ রকম হয়েছিল। এ বছর আবার হচ্ছে। ভাইরাসের ধরন বদলালে শরীরের অ্যান্টিবডি আগের ভাইরাসের সঙ্গে পেরে ওঠে না। তখন নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এতে রোগীদের মধ্যে জটিলতা বাড়ে। মৃত্যুও এ কারণেই এবার একটু বেশি।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় ভোগান্তি কমাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জুম মিটিং করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি, ডেঙ্গু চিকিৎসায় আমাদের সরকারি গাইডলাইন আছে, সেই গাইডলাইন অনুযায়ী যেন চিকিৎসা করে। এর বাইরে যদি তারা অন্য কোনো পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে, এর দায়ভার শুধু তারা নেবে, তা নয়; আমাদের নজরে কোনো অসামঞ্জস্য ধরা পড়লে বা অভিযোগ এলে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। হাসপাতালগুলো যেন শুধু ডেঙ্গুর পরীক্ষা করে, অযাচিত কোনো পরীক্ষা না করে, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রায় ২২ বছর ধরে ডেঙ্গু আমাদের ভূখ-ে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা বুঝতে পেরেছি কোন পরীক্ষা লাগবে ও কীভাবে চিকিৎসা দেওয়া লাগবে। এর বাইরে রোগীরা যেন কোনো ভোগান্তির শিকার না হয়। ডেঙ্গু পরীক্ষায় ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা, সেটাই নিতে হবে সবাইকে।’
তিনি আরও বলেন, সবার উদ্দেশে পরামর্শ, নিজে মশা থেকে বাঁচুন, মশারির ভেতরে থাকুন। নিজের বাড়ি নিজে পরিষ্কার রাখুন। যে বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী আছে, সেই বাড়ির আশপাশেই এডিস মশা আছে। সুতরাং মশা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। বাসাবাড়িতে নিজের প্রতিরোধ নিজেকে করতে হবে। উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মৃত্যুর ব্যাপারে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশিদ উন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি রোগীরা ডেঙ্গু পরীক্ষা করান এবং শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন বা হাসপাতালে আসেন, তাহলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা দেরি করে হাসপাতালে আসছেন এবং অবহেলা করছেন। এখানে মাঝখানে এক দিন দুজন রোগী মারা গেছে। তারা আসার চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছে এবং খুব খারাপ অবস্থায় এসেছিল। এই দুজনের ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য রোগ ছিল। দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দেওয়া যায়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার রোগীদের অবস্থা অন্যান্য সময়ের তুলনায় কিছুটা জটিল। রোগীরা খুব তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে যায়। কারও প্রেশার কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ খেতে পারছে না। তাই উপসর্গ দেখা দিলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে এবং শনাক্ত হলে অবশ্যই চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসায় দেরি হলে মৃত্যুঝুঁকি থাকে।
১৮ দিনেই অর্ধশত মৃত্যু : এ বছর জানুয়ারিতে প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর মে পর্যন্ত গত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে কেউ মারা যায়নি। বছরের প্রথম একজন মারা যায় জুনে। এরপর থেকেই রোগীর পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়তে থাকে। জুলাইয়ে মারা যায় ৯ ও আগস্টে ১১ জন। এর পরের মাসেই সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ওই মাসে মারা যায় আগের মাসের তিন গুণের বেশি, অর্থাৎ ৩৪ জন। কিন্তু চলতি অক্টোবরে মৃত্যুর সংখ্যায় এ বছরের আগের সব রেকর্ড ভেঙে যায়। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৮ দিনেই মারা গেছে ৫১ জন; অর্থাৎ এই ১৮ দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সে হিসাবে এ মাস শেষ হতে এখনো ১৩ দিন বাকি। এই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা না কমলে এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে।
মোট মৃত্যুর ৫৩% ঢাকায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে মারা গেছে ৬২ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
ঢাকায় মোট মৃত্যুর ৫৩ শতাংশ বা ৩৩ জন মারা গেছে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ১২ জন। এরপর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে মারা গেছে ১০ জন ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) ৮ জন।
ঢাকায় বাকি ৪৭ শতাংশ বা ২৯ জন মারা গেছে বেসরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যে বেশি মারা গেছে ধানম-ির স্কয়ার হাসপাতালে, ৫ জন। ইবনে সিনা হাসপাতালে মারা গেছে ৪ জন ও মিরপুরের ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন।
ঢাকার বাইরে বেশি মৃত্যু কক্সবাজারে : এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪৪ জন মারা গেছে ঢাকার বাইরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে কক্সবাজারে ২২, যা মোট মৃত্যুর ২১ শতাংশ এবং ঢাকার বাইরে মোট মৃত্যুর ৫০ শতাংশ; অর্থাৎ ঢাকার বাইরে যত রোগী মারা গেছে, তাদের অর্ধেকই কক্সবাজারের।
ঢাকার বাইরের চার সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ১৫ জন, যা ঢাকার বাইরের মোট মৃত্যুর ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন মারা গেছে। এরপর চট্টগ্রাম জেলায় ৫ এবং নরসিংদী ও ফেনীতে ১ জন করে মারা গেছে।
তিন বছর ১০০-এর ওপরে মৃত্যু : দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ২২ বছরের মধ্যে তিন বছর ডেঙ্গুতে ১০০-এর ওপরে মৃত্যু ছিল। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে সর্বোচ্চ সংক্রমণের বছর ২০১৯ সালে, ১৭৯ জন। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে এ বছর। ২০২১ সালে মারা গেছে ১০৫ জন। এ ছাড়া ডেঙ্গুর শুরুর বছর ২০০০ সালে মারা গেছে ৯৩ এবং ওই বছর হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছিল ৫ হাজার ৫৫১ জন। এরপর ২০০২ সালে হাসপাতালে ভর্তি ৬ হাজার ২৩২ জনের মধ্যে ৫৮ জন, ২০০১ সালে ভর্তি ২ হাজার ৪৩০ জনের মধ্যে ৪৪ জন এবং ২০১৮ সালে ভর্তি ১০ হাজার ১৪৮ জনের মধ্যে ২৬ জন মারা যায়।
