প্রাণের সৃষ্টি রহস্য সমাধানে বিজ্ঞানীদের রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা (৩য় পর্ব)

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৩১ পিএম

নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টিতে সক্ষম প্রথম অণুজীবের সন্ধানে

১৯৬০ সালের পরে বিজ্ঞানীরা প্রাণের উৎস অনুসন্ধানে তিনটি মতবাদে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কারো ধারণা প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ের প্রাণকোষ গঠনের মাধ্যমে। আরেকদল বিজ্ঞানী মনে করেন, প্রাণের সূত্রপাত হয়েছিল শক্তি উৎপাদনের রাসায়নিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তৃতীয় আরেক দল বিজ্ঞানী বংশগতি এবং আপন কোষের প্রতিরূপ সৃষ্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শেষ দলের বিজ্ঞানীরা যে কোষটি নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে তার স্বরূপ কেমন ছিল সেটা অন্বেষণের চেষ্টা করেন। এই বিজ্ঞানীরা প্রথম থেকেই জোর দিয়ে বলেন প্রাণের উৎপত্তি হয় মূলত আরএনএ দিয়ে।

আরএনএ সকল প্রাণের উৎস, বিজ্ঞানীদের এই চিন্তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ ছিলো। বিশেষত আরএনএ এমনকিছু করতে পারে যেটা ডিএনএ করতে পারে না। আরএনএ হল একটা নমনীয় সূতা সদৃশ মলিকিউল। অন্যদিকে ডিএনএ হল দুইটা সূতা, যারা নিজেরা পেঁচিয়ে স্তরে স্তরে বিভিন্ন আকারে সাজানো থাকে। আরএনএ’র আচরণ অনেকটা প্রোটিনের মতো। লেজলি ওরগেল এবং ফ্রান্সিস ক্রিক এর ধারণা ছিলো আরএনএ হয়তো প্রোটিনের মতো এনজাইমও গঠন করতে পারে। আপনার অন্ত্রে থাকা এনজাইম খাদ্যের জটিল মলিকিউলকে ভেঙে শর্করা বা চিনিজাতীয় সাধারণ সরল খাদ্য উপাদানে পরিণত করে যাতে দেহকোষ তা শক্তি হিসেবে সহজেই গ্রহণ করতে পারে। এনজাইম ছাড়া প্রণীর বাঁচা সম্ভব না। যদি তাই সত্য হয় তাহলে ধরে নিতে হবে পৃথিবীতে আরএনএ-ই ছিলো প্রথম জীবন্ত অণু। কিন্তু কয়েক দশক ধরে এই ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিলো না।

অবশেষে, ১৯৮২ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী টমাস রবার্ট চেক আরএনএ’র মধ্যে এনজাইম আবিষ্কার করেন। এরফলে প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিলো আরএনএ দিয়ে এই ধারণা আরো পোক্ত হল।

টমাস রবার্ট চেক জন্মগ্রহণ করেন আমেরিকার আইওয়া শহরে এবং সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। শিশুকাল থেকেই চেক পাথর এবং খনিজ উপাদানের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ অনুভব করেন। তিনি যখন নিম্ন মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র তখনই স্থানীয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের গবেষণাগারের দরজায় উঁকি দিয়ে শিক্ষকদের কাছে খনিজ উপাদানের গঠন প্রণালী দেখতে চেয়েছিলেন। তবে পরে তিনি জৈব রসায়নবিদ হন এবং তার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল আরএনএ।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে টমাস রবার্ট চেক এবং তার কিছু সহকর্মী কোলারাডো বোলডার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে এককোষী প্রাণ ‘Tetrahymena Thermophila’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই এককোষী প্রাণের অনুষঙ্গ সূতা সদৃশ বস্তুটি আরএনএ দিয়ে গঠিত। চেক আবিষ্কার করলেন আরএনএ’র একটা বিশেষ অংশ কখনো কখনো মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, যেন তাকে কাঁচি দিয়ে কেটে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। চেকের গবেষকদল যখন সব এনজাইম এবং অন্যান্য মলিকিউল পৃথক করে ফেললেন তখনো আরএনএ-র ঐ অংশ নিজেকে কাঁচির মত কাটাকুটির কাজ করছিল। এরপর তারা আবিষ্কার করলেন প্রথম আরএনএ এনজাইম, তথা, আরএনএ’র এক ক্ষুদ্র অংশ যা নিজেকে বৃহৎ অংশ থেকে খণ্ডিত করতে সক্ষম।

চেক তার গবেষণামূলক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন ১৯৮২ সালে। পরের বছর অন্য একদল বিজ্ঞানী রাইবোজম নামের দ্বিতীয় আরেকটি আরএনএ এনজাইমের সন্ধান পেলেন। দুটি আরএনএ এনজাইম পাওয়ার সফলতা দ্রুত ইঙ্গিত দিলো সেখানে আরও অনেক কিছুর অস্তিত্ব আছে। এই আবিষ্কারের ফলে প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল আরএনএ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেই ধারণা আরো সত্য মনে হতে থাকলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুচেটস প্রদেশের কেমব্রিজের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওয়াল্টার গিলবার্ট এই ধারণার নাম দেন ‘আরএনএ ওয়ার্ল্ড’। পদার্থবিজ্ঞানী হলেও গিলবার্ট মলিকিউলার বায়োলজিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি হিউম্যান জেনোম সিকোয়েন্সিং নিয়েও কাজ করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ‘নেচার’ বিজ্ঞান সাময়িকীতে গিলবার্ট প্রস্তাব করেন প্রাণের যাত্রা শুরু হয় আরএনএ ওয়ার্ল্ড এর হাত ধরে।

গিলবার্ট যুক্তি দেখান প্রাণের বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে নিউক্লিওটাইড ঘনতরল থেকে আরএনএ অনুগুলো নিজেদেরকে জড়ো করে, ভিন্ন ভিন্ন আরএনএ কেটে-জোড়া দিয়ে প্রাণের উপযোগী সিকোয়েন্স সৃষ্টি করে। এরপর কোনোভাবে প্রোটিন এবং প্রোটিন এনজাইম তৈরির রাস্তা পেয়ে যায়। আর সেগুলো আরএনএ-তে প্রতিস্থাপিত হয় এবং তা থেকেই প্রাণকোষের উৎপত্তি হয়।

২০০০ সালে আরএনএ তত্ত্বের সমর্থনে এক নাটকীয় প্রমাণ পাওয়া গেল। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবরসায়নের অধ্যাপক টমাস আর্থার স্টিৎজ ৩০ বছর ধরে গবেষণার পর ‘রাইবোজম’ এর কাঠামো আবিষ্কার করেন। প্রমাণিত হয় যে, আরএনএ রাইবোজমের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি কোষেই থাকে এই রাইবোজম। ডিএনএ থেকে আরএনএ-তে স্থানান্তরিত তথ্য পাঠ করেই অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোকে একসাথে পেঁচিয়ে প্রোটিন তৈরি করে রাইবোজম। আর আপনার দেহের কোষগুলো থেকে উৎপন্ন এই রাইবোজম প্রোটিন দিয়েই আপনার দেহের বেশিরভাগ অংশ গঠিত হয়। রাইবোজোম কোষের আরএনএ বহনকারী হিসেবে পরিচিত ছিলো। কিন্তু ২০০০ সালে অধ্যাপক স্টিৎজ এবং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল রাইবোজোমের গঠনের বিশদ চিত্র খুঁজে পেলেন এবং আবিষ্কার করলেন রাইবোজোমের অন্তঃস্থলে অনুঘটকের কাজ করছে আরএনএ।

এই আবিষ্কার ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাইবোজম প্রাণের একটি মৌলিক উপাদান। এই অসামান্য আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে অধ্যাপক টমাস আর্থার স্টিৎজ রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান।

কিন্তু এরপরও সন্দেহ দূর হল না। আরএনএ থেকে প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল এই মতবাদের শুরুতেই দুটো সমস্যা বিদ্যমান ছিল। আরএনএ কি প্রকৃতই নিজে নিজেই প্রাণের সবধরনের ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম? পৃথিবীর প্রথম-যুগেই কি আরএনএ সৃষ্টি হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায় নি।

গিলবার্টের ঘোষণার পর ৩০ বছর ধরে দীর্ঘ গবেষণার পরেও প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে আরএনএ দিয়ে এই মতবাদের সমর্থনে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারলেন না বিজ্ঞানীরা। গিলবার্ট পেলেন অণুজীব কিন্তু সেটা প্রাণের সৃষ্টি রহস্য সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেল। যদি প্রাণ সৃষ্টি হয় আরএনএ অণুজীব দিয়ে তাহলে আরএনএকে অবশ্যই নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারতে হবে। কিন্তু আরএনএ নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে না। ডিএনএ’র দ্বারাও একাজ সম্ভব নয়। আরএনএ বা ডিএনএ যা কিছুই বলি না কেন নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে হলে তাদের দরকার হয় বিপুল পরিমাণ এনজাইম এবং অন্যান্য অণুজীব।

১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে কিছু জীববিজ্ঞানী একটু ভিন্ন পথে হাটলেন। তারা নেমে পড়লেন নিজেই নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে এমন আরএনএ সৃষ্টির প্রচেষ্টায়।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের জীনতত্ত্বের প্রফেসর জ্যাক উইলিয়াম সোসটাক প্রাণের উৎস সন্ধানে নিয়োজিত প্রথমদিককার বিজ্ঞানীদের একজন। শিশুকাল থেকেই তিনি রসায়নের প্রতি এত মুগ্ধ ছিলেন যে তার বাড়ির বেইজমেন্টে তার নিজস্ব একটা গবেষণাগার ছিল। তার নিজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লেও তিনি একবার রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটান। ফলাফলে যা ঘটেছিল তা ছিল বিস্ময়কর। বিস্ফোরণের ফলে একটা গ্লাসের টিউব তীব্র-বেগে ছুটে গিয়ে ছাদের দেয়ালে গেঁথে গিয়েছিল।

১৯৮০-র দশকের শুরুতে সোসটাক প্রমাণ করে দেখাতে সক্ষম হন কীভাবে আমাদের জীনগুলো বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে। তার এই গবেষণার ফলাফল তার জন্য নোবেল পুরষ্কার এনে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি এর পরে টমাস রবার্ট চেক এর আরএনএ এনজাইমের গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হন। সোসটাক বলেন, ‘আমি মনে করেছিলাম আরএনএ এনজাইম নিয়ে গবেষণা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। মোটের উপর সম্ভবত আরএনএ নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে।‘

১৯৮৮ সালে চেক এক বিশেষ ধরণের আরএনএ এনজাইমের সন্ধান পেলেন, যা ক্ষুদ্র আরএনএ মলিকিউল তৈরি করতে পারে এবং এই আরএনএ ১০ নিউক্লিওটাইডের সমান দীর্ঘ। সোসটাক তার আবিষ্কারকে সমৃদ্ধ করতে গবেষণা শুরু করলেন। গবেষণাগারে নতুন ধরণের আরএনএ এনজাইম সৃষ্টি করলেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর সোসটাক এমন এক আরএনএ এনজাইম সৃষ্টি করলেন যার বিক্রিয়ার অনুঘটক ক্ষমতা সাধারণের তুলনায় ৭০ লাখ গুণ বেশি গতিশীল। তারা দেখালেন আরএনএ এনজাইম প্রকৃত অর্থেই অনেক শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু তারা নিজেরা নিজেদের আরেকটি প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি প্রতিরূপ সৃষ্টির ধারে কাছেও যায় না। সোসটাক যেন অসম্ভবের দেয়ালে আঘাত করলেন।

তারপরে সবচেয়ে বড় সাফল্য এলো ২০০১ সালে অধ্যাপক সোসটাক’র সাবেক শিক্ষার্থী কেমব্রিজের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) জীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বারটেল এর হাত ধরে। বারটেল আর১৮ নামে আরএনএ এনজাইম সৃষ্টি করলেন যা বিদ্যমান আরএনএ জালের সাথে নতুন নিউক্লিওটাইড যোগ করতে পারে। শুধু আরএনএ’র সাথে যথেচ্ছ নিউক্লিওটাইড সংযুক্ত করাই নয় বরং একটি সিকোয়েন্সও ঠিকভাবে প্রতিরূপ করতে পারে। কিন্তু নিজেই নিজের অবিকল প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে না।

২০১১ সালে সবচেয়ে সফল পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন কেমব্রিজের মলিকিউলার বায়োলজি গবেষণাগারে ফিলিপ হোলিগার। তার গবেষকদল আর১৮ আরএনএ’র উন্নতি সাধন করে তার নাম দিলেন টিসি১৯জেড। এই নতুন আরএনএ নিজের নিউক্লিওটাইড ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরূপ করতে পারে।

তখন ক্যালিফোর্নিয়াতে লা জোলা’তে অবস্থিত ‘স্ক্রিপস রিসার্চ ইন্সটিটিউটে’ বিকল্প আরেকটা গবেষণা চলছিল জেরাল্ড ফ্রান্সিস জয়েস এবং ট্রেসি লিংকন এর নেতৃত্বে। ২০০৯ সালে তারা আরেকধরণের এনজাইমের সন্ধান পেলেন যারা নিজেদের অগোচরেই নিজেদের অবিকল প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে। নতুন সৃষ্ট এনজাইম দুটি ক্ষুদ্র আরএনএ’র সাথে যুক্ত হয়ে দ্বিতীয় আরেকটা এনজাইমের জন্ম দেয়। এই এনজাইম আর দুটি আরএনএ’র সাথে যুক্ত হয়ে আবার নতুন এনজাইম সৃষ্টি করে। প্রয়োজনীয় উপাদান এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এনজাইম সৃষ্টির এই সরল চক্র অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতেই থাকে। কিন্তু এনজাইম শুধু তখনই সফলভাবে কাজ করতে পারে যখন তাদেরকে সঠিক আরএনএ সূত্র দেয়া হয়। যা জেরাল্ড ফ্রান্সিস জয়েস এবং ট্রেসি লিংকনকে গবেষণাগারে তৈরি করে দিতে হত।

অনেক বিজ্ঞানী প্রথম প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছে আরএনএ দিয়ে, এমন ধারণা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কেননা যদি প্রাণের উৎপত্তি হয়ে থাকে আরএনএ অণুজীব দিয়ে তাহলে আরএনএকে অবশ্যই নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতেও পারতে হবে। আরএনএ’কে হতে হবে স্বয়ম্ভূ। কিন্তু আরএনএ নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে না। ডিএনএ’র দ্বারাও একাজ সম্ভব নয়। আরএনএ বা ডিএনএ যা কিছুই বলি না কেন নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে হলে তাদের দরকার হয় বিপুল পরিমাণ এনজাইম এবং অন্যান্য অণুজীব। আজ পর্যন্ত এটা প্রমাণ করা যায়নি যে আরএনএ নিজেই নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারতো। আরএনএ নিজেই নিজের আর একটা অবিকল প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে না এবং এটাই এই তত্ত্বের প্রধান দুর্বলতা। প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে আরএনএ থেকে, তত্ত্বটি (হাইপোথিসিস) বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে যখন রসায়নবিজ্ঞানীরা পারস্পরিক সম্পর্কহীন এবং বিচ্ছিন্ন বস্তুরাজি থেকে আরএনএ উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়। ডিএনএ’র তুলনায় আরএনএ অণুজীবকে মনে হল অনেক সাধারণ কিন্তু আরএনএ সৃষ্টি করা ভীষণ কঠিন এবং শ্রমসাধ্য কাজ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আরএনএ থেকে প্রাণের সূচনা হয়েছে তা প্রমাণ করা যাচ্ছে না। অনেক বিজ্ঞানীই নাকসিটকিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেন প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে আরএনএ থেকে এই তত্ত্ব শুধুই নিরেট ধারণা মাত্র, বাস্তবের সাথে লেশমাত্র সম্পর্ক নাই। তত্ত্বটা মোটেও সঠিক নয়।

১৯৯০-র দশকেই অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা ছিলো, সম্ভবত নবগঠিত পৃথিবীতে অন্যকোনো ধরণের জৈব-কণার উপস্থিতি ছিল, যা আরএনএ থেকে আরও সরল এবং আদিম জৈব-রাসায়নিক স্যুপ থেকে উদ্ভূত হয়ে নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। আর তা থেকেই আরএন, ডিএনএ এবং প্রাণকোষের সৃষ্টি।

১৯৯১ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পিটার নিলসেন দাবী করলেন প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছে পিএনএ দিয়ে। এই অণুজীব নিজের প্রতিরূপ নিজেই সৃষ্টি করতে পারে। এটা ছিল ডিএনএ-র ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত সংস্করণ। পিটার নিলসেন পূর্বের বিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে গেলেন নতুন উদ্যমে। ডিএনএ’র মধ্যে প্রাপ্ত এ, টি, সি এবং জি এনজাইম ঠিক রেখে শর্করার পরিবর্তে পলিএমাইডস অ্যামাইনো অ্যাসিড যুক্ত করলেন। তিনি তার সৃষ্ট এই নতুন অণুজীবের নাম দিলেন পলিএমাইডস নিউক্লিক অ্যাসিড, সংক্ষেপে পিএনএ। যদিও বিভ্রান্তিকরভাবে আমরা এখনো পিএনএ’কে জানি পেপটাইড নিউক্লিক অ্যাসিড নামে।

পিএনএ কখনো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় নি। তবে এর আচরণ অনেকাংশে ডিএনএ’র মত। পিএনএ’র সূতার মতো একটা প্রান্ত ডিএনএ’র একটা প্রান্ত দখল করে নিতে পারে। অণুজীবের এই মিলে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তদুপরি পিএনএ, ডিএনএ’র মত দুইটা প্রান্ত পেঁচিয়ে মইয়ের আকার ধারণ করতে পারে।

এই আবিষ্কারে স্ট্যানলি মিলার মুগ্ধ হলেন। তিনি প্রাণের বিকাশ হয়েছে আরএনএ থেকে এই তত্ত্বে ঘোরতর অবিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি ধারণা করেছিলেন প্রথম প্রাণের উপাদান সৃষ্টিতে পিএনএ বরং অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য এবং যুক্তিপূর্ণ দাবীদার।

২০০০ সালে স্ট্যানলি মিলার আরও শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপন করলেন। ইতিমধ্যে তিনি ৭০ বছরের অভিজ্ঞতায় পৌঁছে গেছেন। কিন্তু বিধি বাম, সেই সময়ে তিনি পরপর কয়েকটি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, ফলে তাকে গবেষণা ছেড়ে নার্সিং হোমে চলে যেতে হয়। তার কাজ আর সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। মিলার তার সেই ক্লাসিক্যাল ‘স্ট্যানলি মিলার-হ্যারল্ড উরে পরীক্ষা’ পুনরায় করে দেখেন। এবারের পরীক্ষায় মিলার মিথেন, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া এবং পানি ব্যবহার করলেন- এবং পিএনএ পেলেন। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, আরএনএ থেকে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় আদি পৃথিবীতে পিএনএ গড়ে উঠেছিলো।

অন্যান্য রসায়নবিদরা প্রাণের উৎপত্তির রহস্য সমাধানে এগিয়ে এলেন তাদের নিজস্ব বিকল্প নিউক্লিক অ্যাসিড নিয়ে।

২০০০ সালে আলবার্ট ইসেনমসার কৃত্রিম জেনেটিক পলিমার ‘থ্রেওস নিউক্লিক অ্যাসিড’ উদ্ভাবন করেন। থ্রেওস নিউক্লিক অ্যাসিড বা টিএনএ মূলত ডিএনএ কিন্তু এতে ভিন্ন ধরণের শর্করা আছে। টিএনএ সূতাও দুটো দ্বিমুখী কুণ্ডলী পাকাতে পারে এবং আরএনএ থেকে টিএনএ ও টিএনএ থেকে আরএনএ-তে তথ্যের অবিকল প্রতিরূপ আদান-প্রদান করতে পারে। এছাড়াও টিএনএ জটিলতর ভাজে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারে এবং প্রোটিন সংরক্ষণ করতে পারে। এথেকেই বোঝা যায় টিএনএ আরএনএ’র মতোই এনজাইমের কাজ করতে পারে।

একইভাবে ২০০৫ সালে এরিক মেগারস গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে গ্লাইকল নিউক্লিক অ্যাসিড (জিএনএ) উৎপাদন করলেন যেগুলো প্যাঁচানো কাঠামো তৈরি করতে পারে। এতক্ষণ যতগুলো নিউক্লিক অ্যাসিড নিয়ে আলোচনা হয়েছে তাদের কোনোটিই প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না, সৃষ্টি করা হয়েছে গবেষণাগারে। সুতরাং বলা যায়, যদিও প্রথম প্রাণ এইসব নিউক্লিক অ্যাসিডের মধ্য থেকে কোনো একটিকে দিয়ে যাত্রা শুরু করেও থাকে কিন্তু পরে তাদেরকে ত্যাগ করে ডিএনএ এবং আরএনএ-র ওপরই ভর করে। এটাও যদি সত্য হয় তাহলে এতদিনের চলমান বিতর্ক চলে যাবে আরএনএ এবং ডিএনএ’র পক্ষে অর্থাৎ প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল আরএনএ এবং ডিএনএ দিয়েই। এই মতবাদ হয়ত সত্য, কিন্তু বিজ্ঞানীদের হাতে এই দাবীর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

২০০৫ সালের মধ্যে আরএনএ মতবাদের বিজ্ঞানীরা প্রচণ্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। আরএনএ মতবাদের বিজ্ঞানীদের চিন্তা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ খুব যৌক্তিক এবং গোছানো পরিপাটি কিন্তু প্রাণের উৎস সম্পর্কে পুরোপুরি সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারেননি তারা।

অন্যদিকে, আরএনএ এনজাইম প্রকৃতিতেই বিদ্যমান ছিল এবং সুসংবাদ হলো সেই এনজাইমে প্রাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উপাদান রাইবোজোমের উপস্থিতিও ছিল। কিন্তু এমন কোনো আরএনএ’র সন্ধান পাওয়া গেল না যে নিজেই নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে এবং কোনো বিজ্ঞানীই প্রমাণ করতে পারলেন না যে আদিম ঘন তরল স্যুপ থেকে কীভাবে আরএনএ সৃষ্টি হয়েছিল।

বিকল্প নিউক্লিক অ্যাসিডগুলো হয়ত এর সমাধান দিতে সক্ষম কিন্তু হতাশার খবর হল, প্রাণের এইসব প্রাথমিক উপাদানগুলো প্রকৃতিতে আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল তার কোনো নির্ভুল প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।

ফলে উপসংহার দাঁড়ালো, প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিলো আরএনএ গঠনের মধ্য দিয়ে, এই তত্ত্ব হয়তো পুরোপুরি সত্য নাও হতে পারে।

১৯৮০-র দশক থেকে আরএনএ মতবাদের বিরোধী আরেকটি মতবাদ ধীরেধীরে তাদের ধারণার পক্ষে প্রমাণ যোগাড় করতে ব্যস্ত ছিল। নতুন মতবাদে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেখাতে লাগলেন প্রাণ আরএনএ বা ডিএনএ বা অন্যকোনো বংশগতির বস্তুকণা দিয়েও নয় বরং প্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিলো শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া হিসেবে। কারণ প্রাণকে বেঁচে থাকতে হলে সবার আগে দরকার হয় শক্তির।

(বিবিসি আর্থ-এ প্রকাশিত মাইকেল মার্শাল এর লেখা ’The secret of how life on earth began’ অবলম্বনে এই লেখা)

পরের পর্বে পড়ুন- প্রাণের উৎসের সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশে অভিযান

আরও পড়ুন...

প্রাণের সৃষ্টি রহস্য সমাধানে বিজ্ঞানীদের রোমাঞ্চকর অভিযাত্রার গল্প (১ম পর্ব)

প্রাণের সৃষ্টি রহস্য সমাধানে বিজ্ঞানীদের রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা (২য় পর্ব)

প্রাণের উৎসের সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশে অভিযান (৩য় পর্ব)

পূর্ণাঙ্গ প্রাণকোষ সৃষ্টির প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম (৫ম পর্ব)

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত