মাসিক ৩ লাখ টাকার চুক্তিতে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বান্দরবানের কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল বলে জানিয়েছে র্যাব। পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেছেন, তিন বছরব্যাপী প্রশিক্ষণের জন্য ২০২১ সালে কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা নাথান বমের সঙ্গে নতুন জঙ্গি সংগঠনটির আমিরের চুক্তি হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র-গুলিসহ সাত জঙ্গি ও কেএনএফের তিন সদস্য গ্রেপ্তার হয়। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রশিক্ষণ সম্পর্কে এসব তথ্য দিয়েছে বলে গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যৌথ বাহিনীর চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে বান্দরবান জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, নতুন ওই জঙ্গি দলের যে সদস্যদের এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ছত্রছায়ায় প্রশিক্ষণ ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের তথ্য তারা পেয়েছিলেন। এর ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির সাইজামপাড়া ও বান্দরবানের রোয়াংছড়ি বাজার এলাকায় র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে র্যাব-৭ ও র্যাব-১৫ অভিযান চালায়। সেই অভিযানে ১০ জনকে গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সাত সদস্য হলো সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের মৃত সৈয়দ আবুল কালামের ছেলে সৈয়দ মারুফ আহমদ ওরফে মানিক (৩১), পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির মো. শাহ আলমের ছেলে ইমরান হোসাইন ওরফে শাওন (৩১), ঝিনাইদহের শৈলকুপার মৃত গোলাম কিবরিয়ার ছেলে কাওসার ওরফে শিশির (৪৬), সিলেটের বিয়ানীবাজারের ফজলুল হকের ছেলে জাহাঙ্গীর আহম্মেদ ওরফে জনু (২৭), বরিশালের মুলাদীর নয়ন মৃধার ছেলে ইব্রাহিম ওরফে আলী (১৯), সিলেটের গোলাপগঞ্জের আতিকুল আলমের ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে বাপ্পি (২৩) ও সুনামগঞ্জের ছাতকের আবদুস সালামের ছেলে রুফু মিয়া (২৬)। আর কেএনএফের গ্রেপ্তার তিন সদস্য হলো বান্দরবানের রোয়াংছড়ির লাল মুন সয় বমের ছেলে জৌথান স্যাং বম (১৯), লাল মিন সম বমের ছেলে স্টিফেন বম (১৯) ও জিক বিল বমের ছেলে মাল সম বম (২০)।
তাদের কাছ থেকে ৯টি বন্দুক, ৫০ রাউন্ড বন্দুকের গুলি, ৬২টি কেস কার্তুজ, ৬টি হাতবোমা, ২টি কার্তুজ বেল্ট, ১টি দেশীয় পিস্তল, বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র, ওয়াকিটকি, মানচিত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে র্যাব।
কেএনএফের ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ : সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘উগ্রবাদী সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ায় জড়িত হয়ে অনেক তরুণ দেড় মাস থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন এলাকায় শারীরিক প্রশিক্ষণ ও তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানের জন্য পটুয়াখালী, ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় জ্যেষ্ঠ সদস্যদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সেফ হাউজে তাদের রাখা হতো। পরবর্তীকালে প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ তরুণদের বান্দরবানের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় পরবর্তী ধাপের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতো।’
২০২১ সালে কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা নাথাং বমের সঙ্গে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার আমিরের যোগাযোগ শুরু হয় জানিয়ে এ র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘কেএনএফের ছত্রছায়ায় জামাতুল আনসার সদস্যদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকা এবং কেএনএফের সব সদস্যের খাবার খরচ বহন করা হতো। কেএনএফের ক্যাম্পে এ জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শুরু হয় চলতি বছরের শুরুতে। কেএনএফের সঙ্গে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ের ব্যাপারে চুক্তি ছিল। এ সংগঠনটি অর্থের বিনিময়ে জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে এক সশস্ত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। সংগঠনটির নামে ফেইসবুকে একটি পেজ খুলে দাবি করা হয়েছে, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলের বম, লুসাই, ম্রো, খুমি, খিয়াং ও পাংখোয়া জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। সংগঠনটি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলিকদম উপজেলাগুলো নিয়ে আলাদা রাজ্যেরও দাবি করেছে।
জঙ্গিদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দিত কেএনএফ : র্যাব কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানো, আইইডিসহ বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরি, চোরাগোপ্তা হামলা এবং প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার কৌশলসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
র্যাব জানায়, পার্বত্য অঞ্চলের প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশিক্ষণার্থী ছিল ৫০ জনের বেশি। নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার আমিরের নাম আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদ। সংগঠনটির শূরা কমিটির সদস্যরা হলেনÑ দাওয়াতি শাখার প্রধান আবদুল্লাহ মাইমুন, সামরিক শাখার মাসুকুর রহমান, সামরিক শাখার দ্বিতীয় ব্যক্তি মারুফ আহমেদ, অর্থ ও গণমাধ্যম শাখার মোশারফ হোসেন এবং প্রধান উপদেষ্টা শামীম মাফুজ।
গ্রেপ্তারদের অতীত কর্মকাণ্ড : র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার মারুফ ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া কিবরিয়া হত্যা মামলার আসামি হাফেজ নাঈমের ছোট ভাই। বড় ভাইয়ের পরামর্শে জামাতুল আনসারের শূরা সদস্য মাসুকুর রহমানের মাধ্যমে উগ্রবাদী এ সংগঠনে যুক্ত হয়। সে সিলেট অঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করত। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র প্রশিক্ষণসহ কার্তুজ সরবরাহ করত।
গ্রেপ্তার ইমরান হোসাইন শাওন ২০১০ সালে বরিশালের স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে হেলথ টেকনোলজি বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বরিশাল সদরের একটি প্যাথলজি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। সে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের সংগঠনের কার্যক্রমের বিষয়ে উজ্জীবিত করত। এ ছাড়াও সর্বশেষ বাড়িছাড়া ১২ জনের দলকে শাওন ঢাকায় একত্রিত করে সংগঠনের শূরা সদস্য মোশারফ হোসেনের কাছে হস্তান্তর করে।
গ্রেপ্তার কাওসার ২০০০ সালে ঝিনাইদহের এক ব্যক্তির মাধ্যমে হুজিতে যোগ দেয় এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ছয় মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ২০১৭ সালে সে ঝিনাইদহের এক ব্যক্তির মাধ্যমে সংগঠনে যোগ দেয়। সে বিভিন্ন সময় সংগঠনের যোগাযোগ ত্বরান্বিত করতে পার্বত্য অঞ্চলে যেত।
গ্রেপ্তার জাহাঙ্গীর সিলেটের একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছিল। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য সেবা অফিসে কাজ করত। সে অনলাইনে উগ্রবাদী ভিডিও দেখে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এ সংগঠনে জড়িয়ে পড়ে। সে বিভিন্ন মাধ্যমে সংগঠনের জন্য অর্থ তুলত। নিরুদ্দেশ তরুণদের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংগঠন থেকে তাকে একটি মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার ইব্রাহিম, জাহাঙ্গীর ও আবু বক্কর সিলেটের স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছিল। ২০২০ সালে বরিশালে গ্রেপ্তার হোসাইনের সঙ্গে ইব্রাহিমের পরিচয় হয়। পরে এ সংগঠনে জড়িয়ে পড়ে। আবু বক্কর শূরা সদস্য মাসুকুর রহমানের মাধ্যমে উগ্রবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। সে বিভিন্ন এলাকায় তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রশিক্ষণ শেষে পার্বত্য অঞ্চলে পরবর্তী ধাপের প্রশিক্ষণের জন্য আসে। রুফু মিয়া শূরা সদস্য মাসুকুর রহমানের মাধমে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনটিতে জড়িয়ে পড়ে।
গ্রেপ্তার ১০ জন কারাগারে : আটক সাত জঙ্গি ও কেএনএফের তিন সদস্যকে গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাঙ্গামাটির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তারের আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কোর্ট পুলিশের এএসআই আসাদুজ্জামান এ তথ্য জানান। এর আগে আটক ১০ জনকে গতকাল বিকেলে র্যাব ও পুলিশ পাহারায় রাঙ্গামাটিতে আনা হয়।
সম্প্রতি দেশের ১৯ জেলা থেকে কথিত হিজরতের নামে ৫৫ জন তরুণ জঙ্গিবাদে জড়াতে বাড়ি ছাড়ে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে খবর মেলে। গত ১৯ অক্টোবর বাড়িছাড়া ১২ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি ও রুমাতে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় জেলা প্রশাসন।
* প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
