খুলনায় রেলস্টেশন ও আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির ৩৭০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত শনিবার রাত ১০টার দিকে রেলস্টেশনের মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার বাদী হয়ে এ মামলা করেন। অন্যদিকে খুলনার সমাবেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ‘মিথ্যাচার ও উসকানিমূলক’ বক্তব্য রেখেছেন। এ ছাড়া কয়েকটি গণমাধ্যম অসত্য ও অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন খুলনার আওয়ামী লীগ নেতারা। গতকাল রবিবার খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তারা এ অভিযোগ করেন। বিএনপির ‘মিথ্যাচার, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নাশকতার’ প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
খুলনা রেলওয়ের স্টেশনের মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার জানান, শনিবার বিএনপির গণসমাবেশে আসা অনেক নেতাকর্মী রেলস্টেশনের ভেতরে ঘোরাঘুরি করছিলেন। পুলিশ তাদের বাইরে যাওয়ার আহ্বান জানালে তারা ক্ষিপ্ত হয়। একপর্যায়ে দুপুরে তারা মেইন গেট, বুকিং কাউন্টার ও সার্ভার রুমের গ্লাস ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
খুলনা রেলওয়ে থানার ওসি মোল্লা মো. খবির আহমেদ বলেন, রেলস্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায় শনিবার রাতে বিএনপির অজ্ঞাতনামা ১৭০ নেতাকর্মীর নামে রেলওয়ে থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার।
অন্যদিকে বিভাগীয় গণসমাবেশের দিন ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগে বিএনপির আরও ২০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল বিকেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাজী মোবাক্ষের বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় ৫৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। দৌলতপুর থানার ওসি কামাল হোসেন মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন : বিএনপির ‘মিথ্যাচার, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নাশকতার’ প্রতিবাদে গতকাল সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। এ সময় লিখিত বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, বিভাগের ১০ জেলা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এ সমাবেশে যোগ দিয়েছে। তাদের পথে কোথাও কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় তারা নিজেরাই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সমাবেশের আগে এ অঞ্চলের মালিক-শ্রমিকরা নিরাপত্তার স্বার্থে এবং তাদের কিছু দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিবহন বন্ধ রাখে। এর সঙ্গে সরকার বা আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, বিএনপির মিথ্যা অভিযোগ, উসকানি ও নানা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মুখে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তাদের ফাঁদে পা দেয়নি। অবশেষে বিভাগীয় গণসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। বিরোধীপক্ষকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার কথা থাকলেও খুলনা আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। নগরীর দৌলতপুর এলাকার নতুন রাস্তা মোড়ে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা করে ভাঙচুর করা হয়। এতে দুজন আহত হয়েছে, যারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা নগরীর শিববাড়ী মোড় টাইগার গার্ডেন হোটেলের সামনে চারটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আটজন নেতাকর্মী আহত হন। অথচ এসব সংবাদ অনেক পত্রিকায় আসেনি। একপেশে সংবাদ পরিবেশন করায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডি বাবুল রানা, জেলা সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার অধিকারী, খুলনা-৬ সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাবু, কামরুজ্জামান জামাল, আশরাফুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম, সৈয়দ আলী, সফিকুর রহমান পলাশ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেল প্রমুখ।
খুলনায় হামলায় ৩০০ নেতাকর্মী আহত : বিএনপি
খুলনায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ কর্মসূচি বানচালে নানা স্থানে ক্ষমতাসীনদের হামলায় ৩০০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গত শনিবার রাতে মহানগর বিএনপির পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে অভিযোগ করে বলা হয়, কোথাও গুলি করে, কোথাও কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে নেতাকর্মীদের। ট্রলার ডুবিয়ে দিয়ে এবং ঘাটে ভিড়তে বাধাগ্রস্ত করে সমাবেশে আসা ঠেকানো হয়েছে। হকিস্টিক, রামদা, লোহার রড, লাঠিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল ক্যাডাররা।
এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড এবং সমাবেশে অংশ নেওয়ার প্রবেশ পথে তাদের দিনভন মহড়া আতঙ্ক ছড়িয়েছে জনমনে। প্রতিটি মোটরসাইকেলে কমপক্ষে তিনজন করে শত শত মোটর সাইকেলের বহরে বিএনপি ও এর নেতাদের কটূক্তি করে দেওয়া হয়েছে উসকানিমূলক স্লোগান।
ফুলতলা থেকে খুলনায় আসার প্রাক্কালে থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও বারবার নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বাশারকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ আবুল বাশারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। একইভাবে মোকামপুর এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহত হন ১৫ জন। গাজীরহাট এলাকায় বিএনপিকর্মীদের ওপর হামলার সময় আব্দুল জলিল নামে একজন কর্মী নদীতে পড়ে যান। এখনো তার সন্ধান মেলেনি। খালিশপুর থানার বৈকালীতে বিএনপি অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
গ্রেপ্তার করা হয়েছে মহানগর বিএনপির সদস্য খন্দকার হাসিনুল ইসলাম নিকসহ ১৩৭ জনকে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি প্রদান এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হচ্ছে। তছনছ করা হয়েছে মৎস্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আছিয়া সী ফুড। দুটি বিএনপি অফিস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাস ও লঞ্চ ধর্মঘটের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে নেতাকর্মীরা বিকল্প ব্যবস্থাপনায় খুলনায় আসতে থাকেন। তবে পথে পথে তাদের গাড়ি আটকে রাখা, ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী কেড়ে নেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যায়।
