মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার বীরাঙ্গনাদের সন্তানরা ‘যুদ্ধশিশু’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এ ছাড়া নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের পিতৃপরিচয় উল্লেখ করতে হবে না। বাবার নাম ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের সব সুবিধা বা অধিকার ভোগ করতে পারবেন। গত সোমবার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৮২তম বৈঠকে একজন বীরাঙ্গনার সন্তানের যুদ্ধশিশু হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এই তথ্য জানান।
তিনি আরও জানান, এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে যেসব নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এরই মধ্যে তাদের বীরাঙ্গনা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের বাবার নাম নেই। এ কারণে তাদের সন্তানরা যেন চাকরিক্ষেত্রে, রাষ্ট্রীয় নাগরিক অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার না হন, সে কারণে ওই সন্তানদের পিতার নামের প্রয়োজন হবে না। তারা যুদ্ধশিশু হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাবেন। আমরা এই সুপারিশ তথা প্রস্তাব কেবিনেটে পাঠাব। এরপর তা আইন হবে বা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ পাবে।’
বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের যুদ্ধশিশু হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া বলেন, ‘একজন বীরাঙ্গনার সন্তান আবেদন করেন। তিনি আবেদনে বলেছেন, তিনি কোথাও কোনো আবেদনে পিতার নাম উল্লেখ করতে পারছেন না। কারণ তিনি বীরাঙ্গনার সন্তান। আর বাবার নাম না লিখতে পারায় কোনো চাকরিও পাচ্ছেন না। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জামুকার বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।’
জামুকা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সিরাজগঞ্জের তাড়াশের বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত পচি বেগমের সন্তান মেরিনা খাতুন গত ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে যুদ্ধশিশু হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদনটি পাঠান।
আবেদনে মেরিনা খাতুন বলেন, ‘আমার মাতা মৃত পচি বেগমকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০১৮ সালের ৪ জুলাই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। যার গেজেট নম্বর ২০৫। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার মাতা পচি বেগম পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। সে সময় আমি তার গর্ভে জন্মগ্রহণ করি। সেই সময় আমার মাতা বিধবা ছিলেন।’
মেরিনা লিখেছেন, ‘আমার মা সেই সময় লোকলজ্জার ভয়ে আমাকে ভ্রুণেই শেষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যগুণে আমি বেঁচে যাই এবং মায়ের অন্য সন্তানদের দয়া ও ভালোবাসায় আমি বেড়ে উঠি। সম্প্রতি আমার মা পচি বেগম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও আমার কোনো পরিচয় আজও আমি নিশ্চিত করতে পারিনি।’
গত ১০ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ওই আবেদনটি জামুকার বৈঠকে উত্থাপনের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা হালনাগাদ নয়। সরকারি তালিকায় এখন পর্যন্ত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৪৮ জন থাকলেও এমআইএসে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ৪০২ জনের নাম।
