প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের তৃতীয় ইনিংসেই ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন রংপুরের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের বিপক্ষে খেলেছেন অপরাজিত ২১০ রানের বিধ্বংসী ইনিংস, যেখানে ১৬টা চারের পাশাপাশি ছিল ১৩টা ছক্কা! বগুড়ায় জাতীয় ক্রিকেট লিগের পরের ম্যাচটা খেলতে যাওয়ার পথেই মামুন জানালেন তার অলরাউন্ডার থেকে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠা আর বিস্ফোরক ইনিংসের পেছনের গল্পটা।
রংপুরের ছেলে মামুন ছিলেন বছরের শুরুতে উইন্ডিজে বিশ্বকাপ খেলে আসা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। যদিও খেলেছেন একটা মাত্র ম্যাচ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৭ রানে অলআউট হওয়া সেই ম্যাচে ৪ রান করা মামুনকে কেউ মনে রাখেনি। রাখার কথাও নয়। এখন অন্তত ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মামুনকে চিনবেন, কারণ সদ্যই উনিশ পেরিয়ে কুড়িতে পা রাখা যে তরুণ অবলীলায় এক ডজনের বেশি ছক্কা মারতে পারে, তাকে চিনে রাখাটা দরকার।
প্রতিপক্ষ সিলেট আসরে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই জিতেছে। দলে আবু জায়েদ রাহি কিছুদিন আগেও ছিলেন টেস্ট দলের প্রথম পছন্দ। নাবিল সামাদ, রাহাতুল ফেরদৌসরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলছেন অনেক দিন ধরেই। আগের যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের তানজিম হাসান সাকিবও খেলেন সিলেটে। সব মিলিয়ে বোলিং আক্রমণটা ধারালো, তার ওপর আগের দু’দিনের বৃষ্টিতে উইকেটও খুব ব্যাটিং সহায়ক ছিল এমনটা বলা যাবে না। সেখানে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে জীবনের তৃতীয় ইনিংস খেলতে নেমেই অপরাজিত ডাবল সেঞ্চুরি! মামুন জানালেন, স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস আর সতীর্থদের আস্থার যোগফলেই এসেছে সাফল্য ‘আমাদের রংপুর দলে মিডল অর্ডারে জাতীয় দলে খেলা বা অনেক দিন ধরে খেলা বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারই আছেন। আমাকে বলা হয়েছিল খেলতে হলে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবেই খেলতে হবে। আমি এর আগে দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সময় কয়েকটা ম্যাচে শুরুতে নেমেছিলাম। রংপুরের হয়ে খেলতে নামার আগে মাসকো-সাকিব ক্রিকেট একাডেমিতে সালাউদ্দিন স্যারের কাছে কোচিং করি, দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রাও অনেক সহযোগিতা করেন।’
মিরপুরে চট্টগ্রামের বিপক্ষে আগের ম্যাচেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। ৩১ আর ১৮ রানের ইনিংসের চেয়ে মামুন নজর কেড়েছিলেন মমিনুল হককে আউট করে। সিলেটে বৃষ্টিতে দু’দিন ভেসে যাওয়ার পর, তৃতীয় দিনে দুপুরের দিকে যখন ব্যাট করতে নামেন তখন মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিলেন আউট না হওয়ার, ‘ব্যাট করতে নামার সময় আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া ছিল, আমি যেন আউট না হই।’ মামুন সেদিন তো নয়ই, আর আউটই হননি সে ইনিংসে। সতীর্থ ৭ জন ব্যাটসম্যান আউট হলেও মামুন ২১০ রানে থেকে গেছেন অপরাজিত। ৩৬৪ বল, ৫৫২ মিনিট ক্রিজে কাটানো মামুন জানালেন কোন বোলারকে কীভাবে খেলতে হবে সেই ধারণাটা দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছ থেকে পেয়েছেন ‘নাঈম (ইসলাম) ভাই, আকবর (আলী) ভাই, নাসির (হোসেন) ভাই খুব সহায়তা করেছেন। বলেছেন সোজা ব্যাটে খেলতে। রাহি (আবু জায়েদ) ভাইয়ের বল, সাকিব (তানজিম হাসান) ভাইয়ের বল আমার জন্য ইনসুইং হবে, সাবধানে খেলতে।’ বাঁহাতি স্পিনার নাবিল সামাদের প্রথম শ্রেণির ম্যাচের সংখ্যা ৯৯। সিলেটের এই বোলারের বিপক্ষেই সবচেয়ে বেশি চড়াও হয়েছিলেন মামুন। জানালেন, সোহরাওয়ার্দী শুভর কাছ থেকে পেয়েছিলেন টোটকাÑ ‘শুভ ভাই নিজেও বাঁহাতি স্পিনার। তিনি বলেছিলেন, নাবিল জোরে জোরে বল করবে। ফ্লাইট দেবে না। আমিও সেভাবেই খেলেছি।’
প্রথম দিনের (আসলে তৃতীয় দিনের) খেলা শেষে মামুন ছিলেন ৭৯ রানে অপরাজিত। চোখ ছিল শতরানে, দলের সবার কাছ থেকেই পাচ্ছিলেন উৎসাহ-উদ্দীপনা। রানটা তিন অঙ্কে পৌঁছানোর সময় উইকেটে মামুনের সঙ্গী শুভ। একটা সময়ে সাদা বলে জাতীয় দলের নিয়মিত এই অলরাউন্ডারই মামুনকে বলেছেন একশো তো সবাই করে। দেড়শো করো। দেড়শো করলে অনেক নামডাক হবে। আমি সাপোর্ট দিচ্ছে। কথাটা মন দিয়ে শুনেছেন মামুন। এরপর একশো থেকে দেড়শো এবং দেড়শো থেকেই দুইশো। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ক্যারিয়ারের প্রথম পঞ্চাশ ছাড়ানো ইনিংসটাই হয়ে গেল ডাবল সেঞ্চুরি। তারচেয়েও বড় কথা, ইনিংসে ১৬টা চার আর ১৩টা ছয়! এমন ইনটেন্ট আর ইমপ্যাক্টেরই তো খোঁজ করছে জাতীয় দল! মামুন জানালেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেরে খেলাই আমার অভ্যাস। যুব দলে আফগানিস্তানের বিপক্ষেও ১৮ বলে ৩১ রান করেছিলাম (আসলে ২০ বলে ৩২)। আমি সব পজিশনেই ব্যাট করতে পারি।’
মামুনের কণ্ঠে ঝরল অধিনায়ক আকবরের প্রতি কৃতজ্ঞতাও, ‘আকবর ভাই আমার এলাকার, অনেক আগে থেকেই চিনি। উনি আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন, ভরসা রেখেছেন ওপেনারের ভূমিকায়।’
নিজের সামর্থ্য, স্রষ্টায় বিশ্বাস আর সতীর্থদের আস্থায় নতুন ভূমিকাতে বাজিমাত মামুনের। অনেকের ভেতর থেকে চিনিয়েছেন নিজেকে। আসছে বিপিএলে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির চোখ থাকবে তরুণ এই ক্রিকেটারের দিকে। এক ইনিংসে যে ১৩টা ছক্কা আর ১৬টা বাউন্ডারি মারতে পারে, এমন ‘পাওয়ার হিটার’ই তো দরকার।
