কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বশাসন নিশ্চিত চায় আইএমএফ

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫২ এএম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে হলে দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতেও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ কথা জানিয়েছে।

সারা বিশে^র কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে সুদহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। সরকারের নির্দেশে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। মুদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলেও বাংলাদেশে এটি দেখা যায় না। ঋণখেলাপিদেরও নানা সুযোগ-সুবিধা দিতে হচ্ছে সরকারের নির্দেশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে মনে করছে আইএমএফ। এমন পরিস্থিতিতে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন চেয়েছে।

গতকাল রবিবার সচিবালয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলিম উল্যাহর সঙ্গে বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদল এ প্রস্তাব দেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা বৈঠকের শুরুতেই দেশের আর্থিক খাতের ওপর একটি উপস্থাপনা হাজির করেন। তাতে সামগ্রিক আর্থিক খাত, খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সুশাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকারের হস্তক্ষেপের বিষয় উত্থাপন করলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা কখনো হস্তক্ষেপ করি না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পরামর্শ দিয়ে থাকি মাত্র।’

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকদের ‘রাজনৈতিক’ নিয়োগের ব্যাপারে আইএমএফের প্রশ্নের জবাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানায়, পরিচালক নিয়োগ হয় আইনের মাধ্যমে। তাতে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না।

ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ জানতে চাইলে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, মহামারী করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশের ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখনো চালু হয়নি। তারা ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করছে সরকার।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইএমএফকে জানিয়েছে, দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে কয়েকটি আইন সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। তিন-চারটি আইন সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এগুলোতে ঋণখেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। আইন পাস হওয়ার পর ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আশা করছে, এতে খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবে।

আর্থিক খাতের সংস্কার ও আইন সংশোধনের বিষয়গুলো কতদিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে আইএমএফ জানতে চাইলে নিদিষ্ট সময় উল্লেখ করেনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বলা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে, যাতে দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত হয় এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

চলতি বছর ২৪ জুলাই ব্যালান্স অব পেমেন্ট, বাজেট সহায়তা ও অবকাঠামো খাতের জন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ ঋণের বিষয়ে আলোচনা করতেই আইএমএফের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল গত ২৬ অক্টোবর ঢাকায় এসেছে।

প্রথম দিন প্রতিনিধিদলটি অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পরদিন বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে। গতকাল দলটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঋণ পাওয়ার শর্তগুলো চূড়ান্ত করতে আইএমএফের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠকে শর্ত চূড়ান্ত করা হবে। বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের কাছে একটি ঋণ পরিকল্পনা পাঠাবে প্রতিনিধিদলটি। নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের পর ঋণ বিতরণ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত