বরিশালে হোটেলে হোটেলে খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ০২:৫০ এএম

মাত্র দুদিন পর অর্থাৎ ৫ নভেম্বর বরিশালে অনুষ্ঠিত হবে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ। গণসমাবেশ ঘিরে বরিশালে বিএনপির রাজনীতি আবার চাঙা হয়ে উঠেছে। তারা চাইছে বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে যেকোনো উপায়ে বড় জমায়েত করতে। আর আওয়ামী লীগ মাঠে নেমেছে নিজেদের জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিতে। দুপক্ষের পরস্পরমুখী অবস্থানের কারণে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা।

এরই মধ্যে বরিশাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল ও তিন চাকার সব ধরনের যান চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। যেকোনো সময় আসতে পারে ঢাকা-বরিশালসহ অভ্যন্তরীণ সব রুটের নৌযান চলাচল বন্ধের ঘোষণা।

সব শঙ্কা কাটিয়ে বরিশালে জনস্রোত নামবে বিএনপি এমনটাই জানিয়েছে। গতকাল বরিশাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গণসমাবেশ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে দলটির হাইকমান্ড। বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরের প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে মহড়া দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। বিকেলে নগরের সদর রোডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ৫ নভেম্বর বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতে ‘খোঁজখবর’ নিতে শুরু করেছে পুলিশ। হোটেলমালিকরা বলছেন, নতুন করে বোর্ডার তোলার ব্যাপারে প্রশাসন থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ বলেছে, নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় মালিক সমিতির আওতায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। তবে কয়েক বছর আগে মালিক সমিতি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় সাবেক নেতারা কথা বলতে রাজি হননি।

জানা গেছে, এসব হোটেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন। হোটেল শাসমের ব্যবস্থাপক মানিক হাওলাদার বলেন, ‘নতুন বোর্ডার নিতে পারব না এমন নির্দেশ কেউ দেয়নি। তবে প্রশাসন বলেছে, কক্ষ ভাড়া দেওয়ার যে নীতিমালা রয়েছে তা যেন অনুসরণ করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘ভাড়া যিনি নেবেন তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি তুলে রাখাসহ হালনাগাদ তথ্য রাখতে বলা হয়েছে।’

হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালের উপব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান লিটন বলেন, ‘নগরীর ভালো হোটেলগুলো বোর্ডার ভাড়ার নীতিমালা অনুসরণ করে। আমরাও করি।’

হোটেল স্যাডোনা ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক জহির বলেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে আমাদের হোটেল বোর্ডারের চাপ বেশি। ১ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত একটি সিটও খালি নেই।’

বুধবার সন্ধ্যায় হোটেল রোদেলা ইন্টারন্যাশনাল ও কাঠপট্টি রোডের হোটেল ধানসিঁড়ি মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেন। এ খবরে অন্য হোটেলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ‘পুলিশি অভিযান’ চলছে। বিএনপির কয়েকজন নেতা এ অভিযোগ করেন।

হোটেল রোদেলা ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক সৈকত হোসেন বলেন, ‘আজকে (গতকাল) পুলিশ সদস্যরা এসেছিলেন। তবে আমাদের কিছুই বলেননি। তারা এসে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার চলে গেছেন।’ সৈকত বলেন, ‘আগামী ৬ তারিখ পর্যন্ত হোটেলের অধিকাংশ কক্ষ ভাড়া হয়ে গেছে।’

বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হোটেল থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। আশা করছি প্রশাসন এ কাজ করবে না। কারণ কেউ যদি বিধি মেনে হোটেলে ভাড়া দিয়ে থাকে তাহলে সেখানে কারও হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না।’

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আজিমুল করিম বলেন, ‘হোটেল তদারকি আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। হোটেল কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে নিয়ম অনুসরণ করছে কি না তার খোঁজখবর নিতেই হোটেলে যাওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে হোটেলে আমাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার হামালা-হয়রানির অভিযোগ : ‘হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং ধর্মঘট দিয়ে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুরের বিভাগীয় গণসমাবেশের জনস্রোত ঠেকাতে পারেনি। তেমনি আগামী ৫ নভেম্বর নদী-খালসহ দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা পরিবেষ্টিত বরিশালের বিভাগীয় গণসমাবেশেও জনগণের উত্তাল জনস্রোত ঠেকানো যাবে না। বিন্দুমাত্র দমানো যাবে না ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় শক্ত বিএনপির বিশাল কর্মী বাহিনীকে।’

বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ উপলক্ষে গতকাল বুধবার দুপুরে বরিশাল প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বরিশালের বিভাগীয় গণসমাবেশের প্রধান উপদেষ্টা বেগম সেলিমা রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চট্টগ্রামসহ দেশের ৪টি বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারি দল ও প্রশাসনের সব বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে গণসমাবেশগুলো মহাসমাবেশে রূপান্তরিত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারকে জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। দেশের সব বিরোধী দলও সরকার পতনের লক্ষ্যে যুগপৎভাবে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর বরিশাল তথা দক্ষিণ জনপদের মানুষ গণসমাবেশ সফল করে প্রমাণ করে দেবে দেশবাসী ভোটের অধিকার হরণকারী অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ চায়।

সেলিমা রহমান বলেন, বরিশালের গণসমাবেশ বাধাগ্রস্ত করতে আওয়ামী লীগ দলীয় সন্ত্রাসী এবং দলবাজ প্রশাসনের সমন্বিত অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা, জেলা শহর এবং মহানগরে হামলা-নির্যাতন শুরু করেছে। বরিশালের গণসমাবেশ ভ-ুল করতে আওয়ামী লীগ সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দলবাজ প্রশাসন তাদের সহায়তা করছে। বরিশাল জেলা বাস-মালিক গ্রুপ ৪ ও ৫ নভেম্বর ধর্মঘট ডেকেছে। ক্ষমতাসীন দলের চাপের মুখে বাস-মালিক গ্রুপ ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বরিশালের উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ ও বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির প্রস্তুতি সভায় সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা এবং পুলিশ হামলা চালিয়েছে। এতে বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পটুয়াখালী শহরে বিএনপির প্রচার মিছিলে আক্রমণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বরগুনার যুবদল নেতা মিরাজুর রহমান সৈয়দকে। বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার সরকারি দল ও প্রশাসন যৌথভাবে দমন নিপীড়নের মাধ্যমে বিএনপির সামগ্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রমকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিভাগীয় সমাবেশকে সামনে রেখে গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় গত কয়েকদিন ধরে নিপীড়নের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি গণসমাবেশ সফল করার আহ্বান জানিয়ে বেগম সেলিমা রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা ৫ নভেম্বরের গণসমাবেশ এবং ঢাকার মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করবে। এই সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি এদেশের মানুষের পাশে থাকবে। ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে মুক্ত করব গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে। দেশে ফিরিয়ে আনব ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত