লংমার্চে সশস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার এক দিন পর গতকাল শুক্রবার মুখ খুলেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার ওপর হামলার বিষয়ে জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও টেনেছেন তিনি। নিজের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ইউটিউব চ্যানেল থেকে ইমরান খানের ওই বক্তব্য সরাসরি প্রচার করা হয়।
ন্যায়বিচারের উদাহরণ টানতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টানেন ইমরান খান। তার দলের সঙ্গে জুলুম হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে কী হয়েছিল? সবচেয়ে বড় যে রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিতেছিল, তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল সামরিক বাহিনী। তাদের যে অধিকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি।’
ইমরান আরও বলেন, ‘১৮ বছর বয়সে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ১৯৭১ সালে খেলতে গিয়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তানের গণমাধ্যমের ওপর তখন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। আমার জানা ছিল না, সেখানকার মানুষের ভেতরে কী পরিমাণ ঘৃণা জমেছিল। কেন ঘৃণা জমেছিল? তারা নির্বাচনে জিতেছিল আর আমরা তাদের সেই অধিকার দিচ্ছিলাম না। প্রধানমন্ত্রী তাদের হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখানে (পশ্চিম পাকিস্তানে) বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা তাদের প্রধানমন্ত্রী হতে দেব না।’
এদিকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ওপর হামলার পর তার দলের ডাক দেওয়া বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান জুড়ে ব্যাপক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। বড় বড় শহরে তেহরিক-ই ইনসাফের কর্মীরা রাস্তা আটকে টায়ার জ¦ালিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। কোথাও কোথাও তারা পুলিশের দিকে ইট-পাথর ছুড়লে পাল্টা পুলিশও তাদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে। তবে বিক্ষোভকারীরা বলছেন, আগাম নির্বাচনের যে দাবিতে ইমরান খান লংমার্চ শুরু করেছিলেন তা আদায় না হওয়া অবধি বিক্ষোভ চলবে। আর ইমরান খান বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আগাম নির্বাচন বা রক্তাক্ত বিপ্লবের বিকল্প নেই পাকিস্তানে।
ডনের খবরে বলা হয়েছে, পিটিআই মহাসচিব আসাদ উমর এ বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ইমরান খানের দাবি না মানা পর্যন্ত এ বিক্ষোভ চলবে। আগের দিন এক ভিডিও বক্তব্যে আসাদ উমর বলেছিলেন, হত্যাচেষ্টার নেপথ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ও একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে সন্দেহ করছেন ইমরান খান। পিটিআই মহাসচিব আরও বলেন, ‘ইমরান খান বলেছেন, তার কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল, এ লোকগুলো তাকে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
এদিকে গতকাল বিকেলে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও ইমরান খান একই অভিযোগ আবারও তুলেছেন। অবশ্য এবার বলেছেন চারজনের কথা। তিনি তাদের বিচারের দাবি করেছেন। পাশাপাশি পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দেশটির প্রধান বিচারপতি, সেনাবাহিনীর প্রধান, নির্বাচন কমিশনসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীকে দায়ী করেছেন। পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থে তাদের অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানান।
টেলিভিশন ভাষণে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আগে থেকেই জানতাম ওয়াজিরাবাদ ও গুজরাটের মধ্যে আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কীভাবে আমি জেনেছি? অভ্যন্তরীণ লোকেরা আমায় বলেছে। ওয়াজিরাবাদের আগের দিন, তারা আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। পিটিআইপ্রধান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং মেজর জেনারেল ফয়সাল আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এ প্রচেষ্টার পেছনে একটি পরিকল্পনা ছিল এবং আমরা তা উদঘাটন করব। ইমরান বলেছেন, জাতি অবশেষে জেগেছে এবং এখন সামনে দুটি পথ, শান্তিপূর্ণ বা রক্তাক্ত বিপ্লব। তৃতীয় কোনো পথ নেই।
গতকাল দুপুরের পর বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়াও হয়েছে বলে জানিয়েছে ডন। কোয়েটায় মনন চকে পিটিআইয়ের বিক্ষোভে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের সাবেক ডেপুটি স্পিকার কাশিম সুরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানে বিক্ষোভকারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। ইমরানের বিরুদ্ধে হামলার প্রতিবাদে গতকাল বেলুচিস্তান জুড়ে ধর্মঘট পালিত হয়েছে। কিলা আবদুল্লা, নুশকি, পাশিন, সানজাউয়ি ও অন্যান্য জেলায় দোকানপাট, মার্কেট বন্ধ ছিল বলে সুরি জানিয়েছেন। রাজধানী ইসলামাবাদেও পিটিআইয়ের কর্মী-সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন। পেশোয়ার টোল প্লাজার কাছে বিক্ষোভে সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। করাচিতে ইমরানের সমর্থকরা রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। পরে তারা ইনসাফ হাউজের সামনে অবস্থান ধর্মঘটও করেন। শেরা ফয়সাল এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসও ছুড়তে হয়েছে। লাহোরে পাঞ্জাব গভর্নর হাউজের বাইরে পিটিআইয়ের কর্মীরা টায়ার জ্বালিয়েছেন। অনেক বিক্ষোভকারী গভর্নর হাউজে ঢুকে পড়তে ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙতেও চেষ্টা করেন বলে ডন নিউজ টিভির ফুটেজে দেখা গেছে। ফয়জাবাদে টোল প্লাজার কাছে পিটিআইয়ের কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছুড়তে শুরু করলে পরে পুলিশও কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। ফয়সলাবাদে বিক্ষোভে পিটিআইয়ের নেতাকর্মীরা ইমরানের ওপর হামলার স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন। খাইবার পাখতুনখোয়ার শাংলা জেলায় রাস্তা দখল করে বিক্ষোভ হয়েছে; বিক্ষোভকারীরা আলপুরি, পুরান ও অন্যান্য এলাকা অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান ২০১৮ সালে ভোটে জিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী সেনাবাহিনীর সমর্থন তখন তার দিকে থাকলেও কিছুদিন পর তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। সেনা সমর্থন হারানো ইমরানের বিরুদ্ধে এ বছরের শুরুতে জোট বেঁধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে দেশটির বড় দুই রাজনৈতিক দল। তাতে হেরে গত এপ্রিলে ইমরানের সরকারের পতন ঘটলে প্রধানমন্ত্রী হন মুসলিম লীগের শাহবাজ শরিফ।
ক্ষমতা হারানো ইমরান আগাম নির্বাচনের দাবি তুলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে লংমার্চের ডাক দেন। গত ২৯ অক্টোবর লাহোর থেকে শুরু হয় এ কর্মসূচি। রাজধানী ইসলামাবাদের পথে পঞ্চম দিনে বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদে সমাবেশে গুলিবর্ষণ হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন ইমরান খানও, তবে তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে পরে তার দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। গুলির ঘটনায় একজন নিহতেরও খবর পাওয়া যায়। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
