‘তুমি চরম একটা ভুল পথে হাঁটছ’

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ০২:৫৬ এএম

চরম ভুল একটি পথকে সঠিক মনে করে আমি ও আমার সন্তান ওই পথে ছিলাম। এ কারণে আমার বুক খালি করে সন্তান আজ বান্দরবানে পাহাড়ে পড়ে আছে। জানি না সে বেঁচে আছে কি না, আর কখনো ওকে দেখতে পাব কি না। আমি আমার আদরের ধনকে ফিরে পেতে চাই।

গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জ থেকে ঘরছাড়া তিন যুবককে আটক করার ঘটনায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব আকুতি জানান দুটি বিমানের কেবিন ক্রু আম্বিয়া সুলতানা এমিলি।

সুলতানা এমিলি বলেন, ২০২১ সালে নিজ সন্তানের গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে সন্তানসহ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ধর্মজ্ঞান না থাকায় সহজেই ওই গৃহশিক্ষকের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে সন্তানকে যেতে দিয়েছেন কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে। এমনকি পরিবারের কাছ থেকে এসব তথ্য গোপন রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিষয়টি জানতে পেরে সুলতানা এমিলিকে তার ভুলটা ধরিয়ে দেয় র‌্যাব। বোধোদয় হওয়ার পর এখন তিনি সন্তানকে ফেরাতে উদগ্রীব। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি স্বীকার করে বলেছেন, ‘অ্যাকাডেমিক শিক্ষিত হলেও কোরআন-হাদিসে দক্ষতা কম থাকায় ব্রেনওয়াশের শিকার হয়েছি। আমি মাস্টার্স কমপ্লিট করে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেছি। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, চরম ভুল একটি পথকে সঠিক মনে করে আমি ও আমার সন্তান ওই পথে ছিলাম। আর এ কারণে আমার বুক খালি করে সন্তান আজ বান্দরবানে পাহাড়ে অর্ধমৃত অবস্থায় আছে। মা হিসেবে এটা আমার চরম ব্যর্থতা। কোরআন-হাদিস সম্পর্কে দক্ষতা কম থাকায় বুঝতে পারিনি কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল। আমাকে ও আমার সন্তানকে মিসগাইড করা হয়েছে। জঙ্গিদের গ্রুপ, তাদের সংগঠন, কার্যক্রম সবকিছু আমার কাছে গোপন করা হয়েছিল। কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে আমার কাছে ভুলগুলোকে সঠিক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।’

‘৫ নভেম্বর র‌্যাব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা নানা আলোচনা ও ধর্মীয় রেফারেন্স দিয়ে আমাকে বোঝায় যে আমি যা করেছি ভুল করেছি। আমি এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড, তারা বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে কী কী করাচ্ছে, দেশের বিরুদ্ধে কী ধরনের ষড়যন্ত্র করছে এসব কিছু র‌্যাব সদস্যরা আমাকে বুঝিয়ে বলেছেন যোগ করেন সুলতানা এমিলি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সন্তান বাসা ছেড়েছে ২০২২ সালের ১৫ মার্চ। তার শিক্ষক আল-আমিন দেশের বাইরে থাকতেন। তিনি ২০২১ সালে দেশে এসে পড়ানো শুরু করেন। আল-আমিন আমাদের এতটাই আস্থা অর্জন করেছিলেন যে, তার সব কথা আমরা সরলমনে বিশ্বাস করতাম। আমরা পরিবারের সবাই তাকে খুব পছন্দ করতাম, ভালো জানতাম। এই গৃহশিক্ষক আমাকে ও আমার ছেলেকে মোটিভেটেড করে ফেলেন। তিনি কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে। তার কথা ছিল যে ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড হলে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি প্রথম দিকে সন্তানকে বলতাম যে তুমি অনেক ছোট। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িও না, তুমি পড়াশোনা করো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আল-আমিন আমার সন্তানকে তার আয়ত্তে নিয়ে নেন। প্রথমে আমি আমার সন্তানকে বাধা দিলেও একপর্যায়ে সন্তানের জেদের কাছে হেরে যাই। পরে আমার সন্তানই আমাকে এসব বিষয় বুঝিয়েছে।’

সুলতানা এমিলি বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছিল আমার সন্তান প্রশিক্ষণের জন্য যাবে এবং সেটা অনেক ভালো প্রশিক্ষণ। এতে সে অনেক কিছুই জানবে। সে আমাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে পারবে, যোগাযোগ করতে পারবে। প্রয়োজনে আমরাও তার সঙ্গে দেখা করতে পারব। কিন্তু এখন তারা যে কর্মকাণ্ড করছে, সেসব আমার কাছে গোপন করা হয়েছিল। আমি এর কিছুই জানতাম না। ছেলের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি আমার। ও বেঁচে আছে, না মরে গেছে কিছুই জানি না। সন্তানের উদ্দেশে বলতে চাই আব্বু, যদি তুমি আমার মেসেজ পেয়ে থাকো, তোমাকে বলছি, তুমি চরম একটা ভুল পথে হাঁটছ। তুমি তোমার মাকে বিশ্বাস করতে পারো। কখনো এই মাকে যদি ভালোবেসে থাকো, তাহলে ফিরে এসো। আমি তোমাকে রিকোয়েস্ট করছি, আত্মসমর্পণ করো। প্রশাসন তোমাদের প্রতি অনেক সদয়, যেটা তোমরা জানো না এখনো। তোমাদের মতো অল্পবয়সীদের ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে, তোমরা তা বুঝতে পারছ না। তোমরা যদি আত্মসমর্পণ করো, তাহলে তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত