রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপক্সেমিয়া) বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অত্যন্ত জটিল একটি সমস্যা। বিশ্বে প্রতি বছর ৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারাত্মক অক্সিজেন ঘাটতিতে ভোগে। যার মধ্যে শিশুই ৩ কোটি ২০ লাখ। এমনকি দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবকাঠামো অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিউমোনিয়া নিয়ে আসা শিশুর প্রায় ৪২ শতাংশই হাইপক্সেমিয়ায় ভোগে। ফলে দেশে প্রতি বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়, যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। গতকাল বুধবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানান বক্তারা।
গতকাল দুপুরে মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআর,বি) বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে ‘মেডিকেল অক্সিজেন নিরাপত্তা’ শীর্ষক এ সভা আয়োজন করা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বির মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান।
সভায় বক্তারা বলেন, হাইপক্সেমিয়ায় আক্রান্ত যেকোনো রোগীর জন্য চিকিৎসা হিসেবে অক্সিজেন থেরাপি প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরিস্থিতিতে হাইপক্সেমিয়া ঘটতে পারে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নবজাতক থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, সেপসিস এবং যক্ষ্মা আক্রান্ত শিশু, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), হৃদরোগ এবং হাঁপানিসহ আরও অনেক। এনেস্থেসিয়াসহ প্রায় সব ধরনের বড় অস্ত্রোপচারকালে অজ্ঞান করার সময়ও মেডিকেল অক্সিজেন অপরিহার্য।
ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের চারপাশের বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ২১ শতাংশ এবং আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই তাতে আমাদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমাণ ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু যাদের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কম তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।’
বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসালিটি সার্ভে-২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এক-চতুর্থাংশেরও কম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে তিনটি অক্সিজেন উৎসের যেকোনো একটি রয়েছে। যার মধ্যে ১৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর বিদ্যমান ছিল, ২১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ফ্লো-মিটারসহ অক্সিজেন ভর্তি সিলিন্ডার পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র ৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অক্সিজেন সরবরাহ বা বিতরণের ব্যবস্থা এবং পালস অক্সিমিটার ছিল।
২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে পরিচালিত আইসিডিডিআর,বির নেতৃত্বাধীন আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে ৭২ শতাংশ হাসপাতালে পালস অক্সিমেট্রি যন্ত্রটি রয়েছে এবং মাত্র ৭ শতাংশের ক্ষেত্রে আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইসিস (রক্তে অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ, অক্সিজেনের ঘনত্ব, এসিড-ক্ষারের ব্যালেন্স ইত্যাদি পরিমাপ করার পরীক্ষা) করার ব্যবস্থা রয়েছে। অক্সিজেন সিকিউরিটি প্রদানের জন্য অক্সিজেনের অন্যান্য উৎসের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ হাসপাতালের কাছে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর যন্ত্র, ২ শতাংশের বন্ধ স্টোরেজ ট্যাঙ্কে তরল অক্সিজেন ছিল এবং ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে উক্ত হাসপাতালে একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট ছিল। এছাড়া সেন্ট্রাল ও সাব সেন্ট্রাল পাইপিং শুধুমাত্র ১৭ শতাংশ জেলা হাসপাতালে বিদ্যমান ছিল এবং ২০ শতাংশ জেলা হাসপাতালে পরিদর্শনের দিনে ফেল-স্পিটার উপস্থিত ছিল। এক-চতুর্থাংশ জেলা হাসপাতালে নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেশনসহ লো-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, যেখানে মাত্র ৭ শতাংশ জেলা হাসপাতাল নন-ইনভেসিভ এবং ইনভেসিভ দুই ধরনের ভেন্টিলেশনের সঙ্গেই বেসিক অক্সিজেন থেরাপি প্রদান করতে পারে।
আইসিডিডিআর,বির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস ডিভিশনের সিনিয়র বিজ্ঞানী (হাসপাতাল) ডা. মোহাম্মাদ জোবায়ের চিশতি বলেন, যখন কডিড-১৯ মহামারী বিশ্বে আঘাত হানে, তখন হাসপাতালে রোগীদের একটি বড় ঢেউ ভর্তি হয়েছিল অক্সিজেনের প্রয়োজনে। সারা বিশ্বেরই সব আকার-আকৃতির স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো অক্সিজেনের আকাশচুম্বী চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও ওই সময়ে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পালস অক্সিমিটার এবং বাবল সি-প্যাপের মতো স্বল্পমূল্যের উদ্ভাবনমূলক হস্তক্ষেপসমূহ গ্রহণ করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ইউএসএইডের ইভ্যালুয়েশন অ্যান্ড লিনিং অ্যাডভাইজার ও সিনিয়র রিসার্চার ড. কান্তা জামিল, ইউএসএইডের ড. ফিদা মেহরান, আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর (এমসিএইচডি) ডা. শামস এল আরেফিন, হেড অব রিসার্চ (এমসিএইচডি) ড. কামরুন নাহার, ডাটা ফর ইমপ্যাক্টের কান্ট্রি লিড ডা. মিজানুর রহমান এবং নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট সুস্মিতা খান।
দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশনে সহ-সভাপতিত্ব করবে বাংলাদেশ : চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা দ্য ল্যানসেটের ২০২৪ সালের মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটিবিষয়ক গ্লোবাল হেলথ কমিশনে সহ-সভাপতিত্ব করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। গতকাল বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে আইসিডিডিআর,বি ও ডাটা ফর ইমপ্যাক্ট আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, ২০২৪ সালে হতে যাওয়া মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি সংক্রান্ত ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশনে বাংলাদেশ সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এতে কমিশনারদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর (এমসিএইচডি) ডা. শামস এল আরেফিন। সেই সঙ্গে এক্সিকিউটিভ কমিটির কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রতিষ্ঠানটির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান।
এ ব্যাপারে ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, এই কমিশন হাইপক্সেমিয়ার ওপর দৃষ্টিপাত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, কীভাবে অক্সিজেন অ্যাক্সেসকে সংজ্ঞায়িত এবং পরিমাপ করতে হবে, কোন অক্সিজেন দ্রবণ কোন কোন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো কাজ করে তা নিয়ে কাজ করবে। এ ছাড়া কীভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা জাগরণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা সম্ভব তা নিয়েও কাজ করা হবে।
কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে আরও দায়িত্ব পালন করবে উগান্ডার মেকেরের বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
