অস্কার ব্রুজন। সন্দেহাতীতভাবেই এ সময়ে দেশের ক্লাব ফুটবলে সেরা ও সফল বিদেশি কোচ। তার অধীনে গেল পাঁচ বছরে হওয়া তিনটি ফুটবল মৌসুমে বসুন্ধরা কিংস হ্যাটট্রিক লিগ শিরোপাসহ জিতেছে ছয়টি শিরোপা। দেশসেরা ক্লাবের স্প্যানিশ এই কোচের মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ। বাংলাদেশের ফুটবল এর পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশ্বকাপ প্রসঙ্গও।
আরেকটি মৌসুম শুরু হচ্ছে। নিশ্চয় একটা শিহরণ কাজ করছে আপনার মধ্যে। অতীতে কোনো দলই পারেনি টানা চারটি লিগ শিরোপা জিততে। বসুন্ধরা কিংসের সামনে এখন সেই অনন্য রেকর্ডের হাতছানি...
অস্কার ব্রুজন : প্রতিদিন, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ট্রেনিং সেশন এবং প্রতিটি ম্যাচই আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জের। কারণ আমাদের ক্লাব সবসময় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায়। সেটা বাস্তবায়ন করাই আমাদের কর্তব্য।
শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে এবারও কিংস কাগজে-কলমে সেরা দল গড়েছে। আপনার কি মনে হয় এই দলটি আগের চেয়েও শক্তিশালী?
অস্কার ব্রুজন : ফুটবল কেবল শরীরী খেলা নয়, একই সঙ্গে বুদ্ধি খাটিয়েও খেলতে হয়। কীভাবে, কখন, কতটুকু দৌড়াতে হবে, কখন শান্ত থাকতে হবে, কখন মেজাজী রূপ নিতে হবে, কখন চাপ প্রয়োগ করতে হবে, চাপের মুখে কীভাবে খেলতে হবে, কীভাবে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হবে, নিজের উন্নতিতে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও কতটা সে অন্যের উন্নতিতে সহায়তা দিতে প্রস্তুত দল গঠনের আগে আমরা এই মানদণ্ডগুলো নির্ধারণ করি। নতুন কাউকে নেওয়ার বেলায় দেখি সেই খেলোয়াড় এই মানদণ্ডগুলো ছুঁতে পারছে কিনা।
গত মৌসুমে রক্ষণভাগ নিয়ে আপনাদের ভুগতে হয়েছে। এ বছর দেখলাম এই জায়গাটায় আপনারা বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন। বেশ ক’জন ডিফেন্ডারকে দলে নিয়েছেন...
অস্কার ব্রুজন : পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই দেখবেন, আমরা শেষ তিনটি মৌসুমে সবচেয়ে কম গোল হজম করেছি। একটা আক্রমণনির্ভর দলের জন্য এটা দারুণ একটা প্রাপ্তি। রক্ষণভাগে কিছু কিছু জায়গা আমরা শক্তিশালী করেছি ঠিকই, তবে তা শুধুমাত্রই খেলোয়াড়দের মধ্যেই লড়াইয়ের মনোভাবটা বাড়িয়ে দিতে।
রিজার্ভ বেঞ্চও বেশ সমৃদ্ধ মনে হচ্ছে?
অস্কার ব্রুজন : আমরা চেষ্টা করেছি সেরাদের নিয়ে দল গড়তে। তবে মাঠে সেরা হতে হলে আপনাকে একটা সঠিক রুটিন অনুসরণ করতে হবে। যেখানে অনুশীলনেই দিতে হবে বেশি জোর। সাফল্য পেতে এর বিকল্প নেই। যত বেশি অনুশীলন করবেন, তত কম ভুল হবে, আপনার দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। গেল তিনটি মৌসুমে আমাদের সাফল্যের অন্যতম রহস্য ছিল এটাই।
শীর্ষ পর্যায়ে আসার পর থেকেই কিংস আস্থা রেখেছে আপনার ওপর। দেখতে দেখতে চারটি বছর কাটিয়ে ফেললেন। নিজের কাজ নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?
অস্কার ব্রুজন : আমি মনে করি এই প্রশ্নের জবাবটা অন্যরাই ভালো দিতে পারবে। আমি গর্বিত এ কারণেই যে, আমরা যারা বসুন্ধরা কিংসের হয়ে কাজ করছি; তারা প্রত্যেকেই নিরলস চেষ্টা করছি ভালো কাজের মধ্য দিয়ে সমাজকে একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে।
এ বছর অন্য দলগুলো কেমন মনে হচ্ছে? বিশেষ করে যারা হতে পারে আপনাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ?
অস্কার ব্রুজন : বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটা বড় খবর হলো, প্রায় প্রতিটি দলই ব্যালেন্সড দল গড়ে চাইছে শিরোপার লড়াইয়ে থাকা দলগুলোর প্রতি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে। বিশেষ করে বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী ও শেখ জামাল এই সেরা তিন দলকে ছাপিয়ে অন্যরাও চাইছে কিছু অর্জন নিজেদের করে নিতে। তাই তারা দল গঠনে মনোযোগী হয়েছে। ভালো প্রতিপক্ষের সংখ্যা যখন বাড়বে তখন খেলাগুলোও হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
আপনার আক্রমণভাগের কথা একটু বলুন। ব্রাজিলিয়ান ত্রয়ীকে নিয়ে নিশ্চয় প্রত্যাশাটা বেড়েছে?
অস্কার ব্রুজন : আমি কারও কথা আলাদাভাবে বলব না। আমাদের পাঁচ বিদেশিই ভিন্ন ভিন্ন পজিশনের ও আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তারা প্রত্যেকেই তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জানে। এর মধ্যেই দলের কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তারা মাঠে আলো ছড়ানোর জন্য এখন প্রস্তুত। আক্রমণভাগে নতুনের সংযুক্তি অবশ্যই আমাদের গোলের দক্ষতা ও আনুপাতিক হার বাড়াবে। আমরা এমন একটা দল, যারা প্রচুর আক্রমণ গড়তে ভালোবাসি। গোলের দক্ষতা বাড়ানো মানেই দলের শক্তি আরও বেড়ে যাওয়া।
দলবদলের দিন মাঠ নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন...
অস্কার ব্রুজন : কেবল আমরা নই, বিপিএলের প্রতিটি দলই চায় ভালো মাঠে, ভালো সুযোগ-সুবিধার মধ্যে খেলতে। যখন আপনি ভালো মাঠে খেলবেন, তখন মানুষ ভালো ফুটবল দেখতে পাবে; যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা দেবে। খেলাটার প্রতি তাদেরও ভালোবাসা জন্মাবে।
এ বছর কিংসের এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের প্লে-অফ খেলার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে গেল তিন বছর কিংসের না পারাটা নিশ্চয় কষ্ট দেয়?
অস্কার ব্রুজন : সবচেয়ে ইতিবাচক যে আমরা ও জাতীয় দল একই সঙ্গে চাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে আলাদাভাবে চেনাতে। তবে তার জন্য আপনাকে সঠিক পথে এগুতে হবে। কিংস ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটা শক্ত জায়গা তৈরি করতে চাইছে। শেষ দুটি এএফসি কাপে আমরা অল্পের জন্য পরের ধাপে যেতে পারিনি। এই না পারাটা আমাদের জন্য শিক্ষা। এই ব্যর্থতাই আরও শক্তিশালী করে তুলবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভালো করার স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দিতে ক্লাব ম্যানেজমেন্টও তাদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিচ্ছে।
কিংস ধীরে ধীরে সমর্থকপুষ্ট হয়ে উঠছে। এটা নিশ্চয় একটা ইতিবাচক ব্যাপার?
অস্কার ব্রুজন : এর মধ্যেই আমাদের একটা বড় ফ্যানবেজ গড়ে উঠেছে, যাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও নিবিড়। প্রতিটি জেলার মানুষ টিভিতে এখন আমাদের খেলা দেখতে মুখিয়ে থাকে। দেশজুড়ে শত শত সমর্থককে যখন ক্লাবের জার্সি পরে মাঠে আসতে দেখি, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে।
শেষ প্রশ্ন কে জিতবে এবারের বিশ্বকাপ?
অস্কার ব্রুজন : একজন স্পেনের নাগরিক হিসেবে আমি চাইব শিরোপা জিতুক আমার দেশ। আমার হৃদয় বারে বারে সে কথাই বলছে। তবে মাথায় বলছে অন্য কথা। এই আসরে কাগুজে সেরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। এদেরই বিশ্বকাপ জয়ের বেশি সম্ভাবনা দেখছি।
