নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকাটি এখন মাদকের স্বর্গরাজ্য। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মাদক উদ্ধারের জন্য ওই এলাকায় অভিযানে গেলে র্যাবের সঙ্গে মাদক কারবারিদের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। এ সময় শাহীনুর রহমান ওরফে সিটি শাহীন নিহত হয়। এ সময় র্যাবের চার সদস্য আহত হন। র্যাবের দাবি, মাদক কারবারিদের গুলিতেই মারা গেছে শাহীন।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে উত্তরা র্যাব-১-এর সিপিসি-১-এর পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যান) আশরাফুজ্জামান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে তিনটি মামলা করেছেন।
আশরাফুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে তারা জানতে পারেন চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বালুর মাঠে মাদক কারবারিরা মাদকের একটি বড় ধরনের চালান বিক্রয় ও হস্তান্তর করার জন্য অবস্থান করছে। এমন সংবাদে র্যাব-১-এর একটি বিশেষ দল সেখানে পৌঁছে অভিযান পরিচালনা শুরু করে। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদক কারবারিরা তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে র্যাবও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। র্যাবকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। প্রায় ১০-১৫ মিনিট গুলিবিনিময় হয়। একপর্যায়ে মাদক কারবারিরা গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। এরপর স্থানীয় লোকজন ও রূপগঞ্জ থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল তল্লাশি করে শাহীনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পান। তার পাশে থাকা একটি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি ও ২০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে র্যাব। তাৎক্ষণিক তাকে ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
মাদক কারবারিদের হামলায় র্যাব-১-এর সদস্য পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আসাদুল ইসলাম, নায়েক আমির হোসেন, করপোরাল গানার সোহেল মিয়া ও নায়েক আরিফুল ইসলাম আহত হন।
তবে নিহত সিটি শাহীনের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শাহীনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সে একজন ইন্টারনেট ব্যবসায়ী।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, নিহত শাহীন চনপাড়া ইউনিট স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য সচিব ছিল বলে স্বজনরা দাবি করেছেন।
তবে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘শাহীন চিহ্নিত মাদক কারবারি। তাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিলাম। শাহীনের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে র্যাব-১ বৃহস্পতিবার দুপুরে চনপাড়া বস্তিতে অভিযান চালায়।’
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে শাহীনে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার বড় ভাই রাহুল রহমান কামাল জানান, তিনি ওয়ারীতে থাকেন। আর শাহীন রূপগঞ্জ পূর্ব চনপাড়া এলাকায় দুই ছেলে ও স্ত্রী ইতিকে নিয়ে থাকত। বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা খবর পান, চনপাড়া থেকে র্যাব পরিচয়ে শাহীনকে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর তাকে গুলি করা হয়েছে এমন খবরও পান তারা। তিনি বলেন, ‘শাহীনের নামে মামলা ছিল জানতাম। তবে কী মামলা তা বলতে পারি না। এর আগে কয়েকবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল। একজনের নামে মামলা থাকতেই পারে। তাই বলে তাকে ধরে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলবে এটা কোন ধরনের বিচার।’
শাহীনের আরেক বড় ভাই কাওসার আহমেদ শামীম জানান, শনির আখড়ায় শাহীনের ফার্নিচারের ব্যবসা রয়েছে। এ ছাড়া এলাকায় সুদের কারবার করত। এলাকার সবাই তাকে খুব ভালো জানত বলে তিনি দাবি করেন। শরীয়তপুরের সখীপুর থানার তালুকাকান্দি গ্রামের মৃত মজিবুর রহমানের ছেলে শাহীন। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার বিভিন্ন মহল্লা ও ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় পাঁচটি বাহিনী। এসব বাহিনী মাদক কেনাবেচা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ‘অজ্ঞান’ ও ‘মলম’ পার্টিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত। এদের একেকজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে অপরাধ করেই যাচ্ছে। পুলিশ গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠালেও জামিনে এসে ফের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই জানান, প্রথম বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে জয়নাল আবেদীন, দ্বিতীয়টির নেতৃত্বে শাহীন মিয়া ওরফে সিটি শাহীন, তৃতীয় বাহিনী চালায় সাদ্দাম হোসেন ওরফে স্বপন, চতুর্থ বাহিনীর প্রধান মো. রাজা এবং পঞ্চম বাহিনীর নেতা আনোয়ার হোসেন। তাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার সিটি শাহীন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় এবং এর আগে আনোয়ার হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তারা সবাই বিউটি হত্যা মামলার আসামি। বিউটির স্বামী হাসান হত্যা মামলার আসামিও তারা।
রূপগঞ্জ থানার ওসি এএফএম সায়েদ বলেন, এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় মাদক নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
