টেলিভিশন নাট্যাভিনেতা মীর সাব্বিরের একটি উক্তিতে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ সরগরম। লাইভ অনুষ্ঠানে পোশাক নিয়ে মন্তব্য করায় আক্রান্ত বোধ করেছেন এমন অভিযোগ করেছেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা ইসরাত পায়েল। এর পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা চলছে। অনেকে বলছেন উপস্থাপিকা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেননি কিন্তু পরে এটা নিয়ে কথা বলেছেন কারণ তিনি আলোচনায় থাকতে চান। আবার অনেকের মতে মীর সাব্বিরের এমন রসিকতা করা উচিত হয়নি। এসব ক্ষেত্রে যা হয় মঞ্চে অপ্রীতিকর কোনো কিছু ঘটলেও সেটাকে সামলে নিয়ে অনুষ্ঠান চালিয়ে নিয়ে যেতে হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের। সে কারণেই সঞ্চালনা বা উপস্থাপনার জায়গাগুলোতে উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন, স্মার্ট নারী-পুরুষকে বেছে নেওয়া হয়। সেদিনের ঘটনাতে ইসরাত পায়েলও একই কাজ করেছেন। তিনি আক্রান্ত হয়েছেন এমনটা অন্তত মঞ্চে প্রকাশ করেননি। কেননা তিনি সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পালন করছিলেন। অনুষ্ঠানের সুরটি কাটতে না দেওয়াতে তার পেশাদারি মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে।
কিন্তু অনুষ্ঠানের পরে তিনি অভিযোগ করেছেন যে তিনি এতে আক্রান্ত বোধ করেছেন। মঞ্চে এ ধরনের জোকস নতুন কিছু নয়, নারীরা খুব কম ক্ষেত্রে এসবের প্রতিবাদ করেন, অধিকাংশ সময়েই এড়িয়ে যান, যেমন রাস্তাঘাটের উটকো লোকের ছোটখাটো টিপ্পনী তারা প্রতিনিয়ত এড়িয়ে যান। ইসরাত পায়েল প্রতিবাদ করেছেন সেজন্য তাকে সাধুবাদ জানানো উচিত। কারণ এই চুপ করে থাকার চর্চা বন্ধ হওয়া দরকার।
প্রাপ্তবয়স্কদের যেসব জোকস চালু আছে সারা দুনিয়ায়, তার বেশিরভাগই নারীদের হেয় করে বানানো। কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে কথা হচ্ছিল সেই মঞ্চে, তিনি তার কবিতায় বলেছেন ‘অপরের মুখ মলিন করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই।’ বেশিরভাগ জোকসই কারও না কারও মুখ মলিন করে দেয়। তাহলে কি আমরা জোকস বলা বন্ধ করে দেব? তার দরকার নেই, কিন্তু মনে রাখতে হবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে অনেক কিছুর অর্থই বদলে যায়। বন্ধুচক্রে বা ঘরোয়া আড্ডায় আমরা যেসব জোকস বলি বড় পরিসরের একটা লাইভ অনুষ্ঠানে সেগুলো না বলাই হলো কাণ্ডজ্ঞান।
আমরা এখন এমন এক দুনিয়ায় বাস করি যেখানে মামুলি ছাই থেকে শুরু করে সোনার প্রলেপ দেওয়া লাখ টাকার আইসক্রিম সবকিছুরই ক্রেতা আছে। আমাদের অনেক প্রয়োজন এখন কৃত্রিম এবং আদতে তাকে প্রয়োজনও বলা যায় না, কিন্তু তার জন্য লাখ টাকা, কোটি টাকা খরচ করি আমরা। আইফোনের জন্য লোকে কিডনি পর্যন্ত বিক্রি করে দিচ্ছে। বাজারব্যবস্থায় আমাদের সামনে এমন সব রঙিন স্বপ্ন তুলে ধরা হয় যার কারণে বিলাসিতাকে আমরা প্রয়োজন ভাবি এবং তার জন্য নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রি করে দিতেও ভাবি না। বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড আপনাকে বলে দিচ্ছে কোন জিনিসটা আপনার ‘দরকার’, কোনটা এখন ‘ফ্যাশন’, কোনটা ‘ট্রেন্ডি’। এ-সবই ব্যবসার কৌশল। এমনকি বিজ্ঞাপনের খরচ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্রব্যের তৈরি-খরচের চেয়ে বেশি। সমাজ যেমন নারীকে আটকে রাখতে চায়, পুঁজিবাদী দুনিয়া চায় নারীর পণ্যায়ন।
এই যে পণ্যায়নের দুনিয়া, তার অন্যতম অভিশাপ হলো, ধনী-গরিবে বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। কারও বাসায় এত কাপড় যে রাখার জায়গা নেই আবার কেউ শতচ্ছিন্ন কাপড় গায়ে খোলা আকাশের নিচে জীবনপাত করছে। সবকিছুরই পণ্যায়ন হয়েছে এখন। যিনি ভাবছেন, আমি তো সারা দিন বিজ্ঞাপন দেখি কিন্তু কিছু কিনি না, তিনিও আসলে বাজারচক্রের বাইরে নন। কেননা বিজ্ঞাপন তাকে আটকে রাখছে ফোন অথবা টেলিভিশনের স্ক্রিনে। আটকে রাখছে তার সময়, উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতা। আপনি কতক্ষণ কোন বিজ্ঞাপন দেখবেন সেটাও ঠিক করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামক অত্যাধুনিক নতুন প্রযুক্তি। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর যৌনতা বিক্রির ইতিহাস অনেক পুরনো। এখন পুরুষের যৌনতাও বিকোচ্ছে বাজারে। তবে, কে কী বিক্রি করবে সেটাও তার স্বাধীনতা। তা নিয়ে কটূক্তি শোভন নয়।
আপনাদের হয়তো মনে আছে এ বছরের শুরুর দিকে অস্কারের মঞ্চেও এমন একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। অস্কারজয়ী বিখ্যাত অভিনেতা উইল স্মিথ তার স্ত্রী জেডা পিঙ্কেটের রোগ নিয়ে রসিকতা করায় ক্ষেপে গিয়ে চড় মেরেছিলেন উপস্থাপক ক্রিস রককে। এই চড় মারার ঘটনা নিয়েও সারা দুনিয়া সেদিন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদল বলেছিল উইল স্মিথ ঠিক কাজটি করেছে, অন্যদলের অভিমত ছিল প্রকাশ্যে এমন কাণ্ড করা উচিত হয়নি স্মিথের। তবে, লক্ষণীয় হলো, জেডা কিন্তু নিজের অপমানে নিজে কোনো ভূমিকা পালন করেননি, করছিলেন উইল স্মিথ। চড় মারার আগে তিনি স্ত্রীর অনুমতি বা পরামর্শ নেননি, এটিকে ‘স্বামী-সুলভ’ দায়িত্ব মনে করেছেন।
পোশাকের জন্য আমাদের দেশের নারীদের প্রতিনিয়ত কটূক্তির শিকার হতে হয়। আমাদের সমাজ এখনো নারীর স্বাধীনতা, তার স্বাধীন মতামত বা ইচ্ছেমতো পোশাক নির্বাচনের অধিকার মেনে নেওয়ার মতো অবস্থায় আসেনি। সম্প্রতি রাস্তাঘাটে অচেনা মানুষদের কাছেও পোশাকের জন্য হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বেশ কয়েকজন নারীকে। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে মীর সাব্বিরের অন্তত পোশাক নিয়ে প্রকাশ্যে এমন রসিকতা করা উচিত হয়নি, সেটা তিনি যত নির্দোষ মনেই করেন না কেন। তিনি নিজে অবশ্য ভুল স্বীকার করে বলেছেন তিনি কিছু ভেবে কথাটি বলেননি, তাৎক্ষণিকভাবে বলে ফেলেছেন। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এমনই যা আচমকা আমাদের আচরণে প্রকাশ পেয়ে যায়। মীর সাব্বিরের মতো বরিশালের স্থানীয় অনেকেই হয়তো এটিকে নির্দোষ রসিকতা ভাবতে পারেন, কিন্তু অনুষ্ঠানটি আঞ্চলিক ছিল না। তা ছাড়া আপাত নির্দোষ রসিকতাতেই নারীকে হেয় করার প্রচুর উপাদান থাকে। মানুষ এসব রসিকতাতে অভ্যস্ত থাকে বলে এগুলো বিশ্লেষণযোগ্য বা ভিন্নভাবে ভেবে দেখার মতো বলে মনে করে না।
অভিযোগ করার পর থেকে ইসরাত পায়েল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর কটূক্তির শিকার হচ্ছেন এবং এর সিংহভাগ তার পোশাক নিয়ে। আমাদের সমাজের পুরুষতান্ত্রিক এবং কর্র্তৃত্ববাদী আচরণ এসব কটূক্তি ও গালাগালের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। মেয়েদের যে ‘বড় গলায়’ কথা বলতে নেই সেটা আমাদের মেয়েশিশুরা ছোটবেলা থেকেই শুনে বড় হয়। আমরা সবসময় মেয়েদের দমিয়ে রাখতে পছন্দ করি। নারী কোনো অভিযোগ করলে আমরা বলি ‘মানিয়ে চলতে’। যেন মানিয়ে চলা শুধু নারীদের দায়িত্ব। নারীদের অভিভাবকের কোনো অভাব নেই এই সমাজে। পাশের বাসার আন্টি থেকে শুরু করে পথচলতি অচেনা লোক, সবাই নারীর মুরব্বি। নারী কেমন করে হাঁটবে, কথা বলবে, কোথায় যাবে, কী খাবে, কী পরবে সবটাই ঠিক করে দিতে চান এই অভিভাবকরা। মীর সাব্বিরের কথাতেও অভিভাবকত্বের প্রকাশ রয়েছে। উপস্থাপক পুরুষ হলে এই রসিকতা তার মাথায় আসত কি?
কিছু পেশা আছে যাদের কাজের ধরন এমন যে তারা না চাইলেও মানুষের প্রতি তাদের কিছু দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। অভিনয় এমনই এক পেশা। সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ অভিনয়শিল্পীদের অনুসরণ করেন, তাদের কাজকর্মে প্রভাবিত হন, তাদের মতো হতে চেষ্টা করেন। সে কারণে আমাদের মতো নারীবিদ্বেষী ও পশ্চাৎপদ সমাজে অভিনয়শিল্পীদের দায়িত্বও অনেক বেশি। ফলে মীর সাব্বিরের মতো মানুষদের আপাত নির্দোষ কিন্তু সামান্য রকমের ত্রুটিবিচ্যুতিও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
