রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে প্রায় এক হাজার শিল্পকারখানা। শিল্পায়নের প্রভাবে এই উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রার মানেরও হয়েছে উন্নয়ন। সবশেষ পূর্বাচল উপশহর এই এলাকার উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাদক কারবার, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। এলাকার রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পুরো উপজেলায় বর্তমানে সক্রিয় ৬০টিরও বেশি কিশোর গ্যাং। যার প্রায় সবকটিই মাদক কারবারে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার প্রায় সব এলাকায় সহজলভ্য হওয়ার কারণে কিশোররা নিজেদের হাত খরচের টাকা দিয়ে সহজেই কিনতে পারছে মাদক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের মাদক সেবনের পরিমাণও। এক সময় মাদক সেবনের বিষয়টি জানার পর বাড়ি থেকে বন্ধ হয়ে যায় হাত খরচ দেওয়া। মাদক সেবনের টাকার জন্য তখন অনেকেই যোগ দেয় কিশোর গ্যাংয়ে। বন্ধ হয়ে যায় তাদের লেখাপড়া। আর ‘বড় ভাই’খ্যাত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিশোর গ্যাং সদস্যদের আশ্রয়-প্রশয় দেয়। এসব কথিত বড় ভাইরা কিশোর গ্যাং সদস্যদের দিয়ে মাদক বিক্রি, হত্যা, ছিনতাই, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করায়। এছাড়া রাস্তাঘাটে ছিনতাই, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, মহল্লায় নতুন ভাড়াটিয়া দেখলেই বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাসার ভেতরে গিয়ে হেনস্তা করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা, তাদের ভাষায় যাকে বলে ‘ফিটিং’ দেওয়া। শুধু তাই নয়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দিনভরই চলে তাদের আড্ডা, নারীদের দেখে করা হয় বাজে মন্তব্য, আবার আধিপত্য বিস্তারের জেরে নিজেদের মধ্যে মারামারি এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটে প্রায়ই। উপজেলার প্রতিটি জনপদে অনেকটা ফিল্মিস্টাইলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব কিশোর গ্যাং সদস্য।
উপজেলার গোলাকান্দাইল এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে রাজন গ্রুপ, উজ্জ্বল গ্রুপ, ডেঞ্জার গ্রুপসহ ১০টির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। হাটাবো এলাকায় রতন গ্রুপসহ পাঁচটির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এছাড়া তারাব পৌরসভা, যাত্রামুড়ার বেড়িবাঁধ, পূর্বাচল ৩০০ ফুট এলাকা, কাঞ্চন, রূপসী, বরপা, দাউদপুর, ভুলতা, মুড়াপাড়া, চনপাড়া ও সাওঘাট এলাকায় রয়েছে আরও প্রায় ৫০টির মতো কিশোর গ্যাং। কাজ শেষে বেতন নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার পথে অনেক গার্মেন্টসকর্মীই এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের হাতে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। সবশেষ গত ৮ নভেম্বর গোলাকান্দাইলের আধুরিয়ায় চাঁদার টাকা না দেওয়ায় রাশেদ মিয়া নামে তেলের দোকানের এক কর্মচারীকে ছুরি মেরে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। রূপগঞ্জ থানা পুলিশের তৎপরতার অভাবে কিশোর গ্যাং সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেন বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে যেখানেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে সেখানেই আমরা পুলিশ পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। গত কয়েক মাসে বেশকিছু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ কারণে গত দুই মাস ধরে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত অনেকটাই কমে গেছে।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রত্যেক বাবা-মায়েরই উচিত তার সন্তান কার সঙ্গে মিশছে তার খোঁজ খবর রাখা। তাহলেই আর কিশোররা বিপথে যেতে পারবে না।’
