সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছোট খামারিদের নীরব বিপ্লব!

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০১:২৬ এএম

আর কারও মুখাপেক্ষী নয়। আধুনিক পদ্ধতিতে খামার করা এবং সহজ বিপণন এখন নিজের হাতেই। দিন যত যাবে খামার বড় হবে। কেউ আর ছোট করে কথা বলতে পারবে না। খামারি হিসেবে যত ছোটই হই না কেন, আমরা খামারি, আমাদের সেই শক্ত পরিচয় আছে। নিজেদের নামে আছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। মুরগি, হাঁস, গরু-ছাগলের রোগ বালাই নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে আমরা পিজিরা (প্রডিউসার গ্রুপ) বসে বৈঠক করি। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে একেবারে ঢাকায় কেন্দ্র পর্যন্ত আমাদের সহজ যোগাযোগ। প্রতি মাসে সঞ্চয় করছি। আমাদের খামারের প্রাণীদের জন্য হেলথ কার্ড রয়েছে। ফলে এসব প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবায়ও আর বিশৃঙ্খলা হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমরা যেভাবে কাজ করছি, তাতে আগামীতে ছোট ছোট খামারিরা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব ঘটাবেন।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে (এলডিডিপি) কাজ করার মাধ্যমে এভাবেই নিজেদের জীবন বদলানোর কথা জানালেন সিরাজগঞ্জের তৃতীয় লিঙ্গের খামারি নাদিরা, নোয়াখালীর শাহীন, রংপুরের আকবর, বরিশালের সুফিয়া, দিনাজপুরের হারুনসহ অন্তত ৩০ জন খামারি।

এলডিডিপির আওতায় ২০১৯ সালে দেশব্যাপী প্রডিউসার গ্রুপ চালু করে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চার হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে চলতি বছর। প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, মার্কেট লিংকেজ ও ভ্যালু চেইন সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে এ প্রকল্প। আর এর মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর পরই কভিড মহামারীতে পড়ে দেশ। ফলে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজে বেশ ব্যাঘাত ঘটে। তারপরও এক বছর ধরে কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। বিশ^ব্যাংকের সহায়তায় চলমান এ প্রকল্পটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিস্ময়কর সাফল্য যোগ করবে। আর প্রকল্প শেষ হলেও সমবায় আন্দোলনের একটা বিপ্লব দেখবে জাতি। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত খামারিরাও প্রাণিসম্পদ খাতে তাদের নীরব বিপ্লবের কথা বললেন দেশ রূপান্তরের কাছে। শাহীন আক্তার বলেন, ২০১৯ সালের শেষের দিকে তার নেতৃত্বে একটি প্রডিউসার গ্রুপ (পিজি) গড়ে ওঠে। সেখানে ৪০ জন সদস্য রয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই খামারি। এলডিডিপির পক্ষ থেকে উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কীভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি পালন করা যায়, কীভাবে শেড তৈরি করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বিপণনেরও। প্রতি সপ্তাহে গ্রুপ লিডার বৈঠকের আয়োজন করেন। সবার জন্য সুবিধাজনক জায়গা এবং সময়ে এ বৈঠক করা হয়।

ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, চাঁদপুরসহ কয়েকটি জেলার পিজির আওতাভুক্ত খামারিদের কাছে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে উঠে আসে প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথা। সিরাজগঞ্জের তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের নিয়ে গঠিত পিজির সদস্য নাদিরা ও হিরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাঁচ বছর আগেও সমাজে আমাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণে আমরা নিজের ঘর পেয়েছি। এখন আমরা খামারি হিসেবে আইডি কার্ড পেয়েছি। আমাদের প্রত্যেকের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। আমরা মাসে মাসে টাকা জমাই। প্রাণীগুলোকে নিয়মিত আমরা উপজেলার ডাক্তারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সম্মান পেয়েছি। আর কী চাই?’

রংপুরের গঙ্গাচড়ার প্রডিউসার গ্রুপের সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগেও তারা নিজেরা গরু-ছাগল পালন করেছেন। কিন্তু কীভাবে এগুলো বিক্রি করবেন এবং কোনো সমস্যা হলে কী করবেন, তা বুঝতেন না। ভ্যাকসিন দিতে উল্টাপাল্টা হয়ে যেত। কিন্তু এখন তা হয় না। হেলথ কার্ড আছে। সেখানে সব লেখা থাকে। তারিখ অনুযায়ী তারা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এলডিডিপির এ সহায়তা তাদের নতুন উদ্যমে কিছু করার স্বপ্ন তৈরি করে দিয়েছে। বাড়ি বাড়ি খামার হবে, তাদের আর কোনো অভাব থাকবে না।

সম্প্রতি রাজধানীতে পিজির সদস্যদের এক অনুষ্ঠানে আসা বরিশাল ও যশোরের কয়েকজন লিডার দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার সময় তারা পিজি থেকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন এবং একেকজন খামারি সর্বোচ্চ ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন।

করোনার সময় দুধ, ডিম, মাংসের বিপণনে অসুবিধার কথা তুলে ধরে ডেইরি ও পোলট্রি খামারিরা বলেন, করোনায় যখন সবকিছু বন্ধ, তখন দুধ, ডিম ও মাংস কীভাবে বিক্রি করবেন, তা নিয়ে মহাসংকটে পড়ে যান। তখন এই পিজিই তাদের সব সমস্যার সমাধান করেছে। এলডিডিপির প্রকল্প থেকে তাদের জন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল করা হয়েছে। তারাই মাঠপর্যায় থেকে তাদের উৎপাদিত সব জিনিস নিয়ে আসত এবং তাদের আয় একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। অনেক ঝুঁকি নিয়ে উপজেলা এবং ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা লাইভ স্টক অফিসাররা তাদের কর্মীদের নিয়ে দুধ, ডিম, মাংস সংগ্রহ করতেন।

বরিশালের বাবুগঞ্জে প্রকল্পের প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (এলইও) ভেটেরিনারি চিকিৎসক রেহানা বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দেশি মুরগি, হাঁস, কবুতর ও কোয়েলের খামারিদের নিয়ে কাজ করেন। এই প্রডিউসার গ্রুপের প্রতি সাড়া দিন দিন বাড়ছে। এরই মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হয়ে গেছে। এখানে অনেক নারী গ্রুপ লিডার রয়েছেন; বিশেষ করে হাঁস-মুরগি এবং ছাগলের যে খামার, সেখানে আমরা মেয়েদের প্রাধান্য দিয়ে থাকি। নারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়টি দেখা হচ্ছে।’

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার এলইও ডা. সেলিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৪টি গ্রুপ আছে। এর মধ্যে ডেইরি গ্রুপ আটটি। একটি ছাগলের, একটি হাঁসের আর বাকিগুলো মুরগির। পিজি সদস্যরা এখন উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করার পদ্ধতি সব জানেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পশুপালন, পশুদের ভালো খাবার নিশ্চিত এবং রোগ-বালাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমরা গ্রুপ করে দিয়েছি। গ্রুপের সদস্যদের মধ্যেই গ্রুপ লিডার নির্বাচন করা হয়েছে এবং তারা নিজেরা উঠোন বৈঠক করেন। সেখানে আমাদের লাইফস্টক অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসাররা কাজ করেন এবং আরও দুজন লাইভ স্টক ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট কাজ করছেন। আবার প্রতিটি ইউনিয়নে এলএসপি বা লাইভ স্টক সার্ভিস প্রডিউসার একজন করে থাকেন।’

মাঠপর্যায়ের অন্তত ১০ জন এলইও ও গ্রুপ লিডারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের ৬১টি জেলায় গাভির ৩ হাজার ৩৩৪টি, গরু মোটাতাজাকরণের ৬৬৬টি, ছাগল ও ভেড়ার ৫০০টি এবং দেশি মুরগির ১ হাজারসহ ৫ হাজার ৫০০টি প্রডিউসার গ্রুপ গঠন ও সংহতকরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এই গ্রুপগুলোতে ১ লাখ ৬৫ হাজার পরিবার সংযুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতের প্রান্তিক খামারিদের বিভিন্ন ভ্যালু চেইনভিত্তিক প্রডিউসার গ্রপে যুক্ত করে জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত, বাজারজাতকরণ, ঋণ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তারা যাতে এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

এ সম্পর্কে এলডিডিপি প্রকল্পের চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রাব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাণিসম্পদে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে এলডিডিপি প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামীতে সমবায় বিপ্লব ঘটবে। একটা আদর্শ খামার করতে যা যা করা দরকার, এলডিডিপি তা করছে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ প্রকল্পটির মাধ্যমে আমরা জেলা পর্যায়ে ৫ হাজারের বেশি গ্রুপ গঠন করেছি। পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া সারা দেশে এই চেইন গড়ে উঠছে। ভবিষ্যতে এখানে যারা গ্রুপ মেম্বার আছেন কিংবা গ্রুপ লিডার আছেন, এই প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী  প্রাণিসম্পদে আমরা বড় রকমের একটি সাফল্য পাব। কারণ তাদের উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত একটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকার প্রাণিসম্পদে বাজার ব্যবস্থাপনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, এই প্রডিউসার গ্রুপের সদস্যরা অবশ্যই এর সুফল পাবেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত