ব্যবসায়ী কখনো রেগুলেটরের বা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিতে পারে না। সরকার যেহেতু বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কোম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাই সরকার জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা পেতে পারে না। এমন হলে তা হবে আইনি ব্যত্যয়, যা আইন লঙ্ঘনের শামিল।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আইন অনুযায়ী এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন করে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরি করা হয়েছে তাদের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন হওয়ার কথা। বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস-এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করার একক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির। আইন দ্বারা বিইআরসির এ ক্ষমতা নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু আমরা দেখছি এটা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। যেমন কিছুদিন আগেই নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, এলপিজি খাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কোম্পানির পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও ব্যবসা করছে। সরকারও এখানে একটি ব্যবসায়ী পক্ষ। আর সব ব্যবসায়ীকেই নিয়ন্ত্রণ করবে বিইআরসি। কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম, বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের এলপিজির মূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) না দিয়ে হাইকোর্ট বাধ্য করল বিইআরসিকে মূল্য নির্ধারণ করতে। সরকার একটি ব্যবসায়ী পক্ষ হিসেবে কীভাবে জ্বালানির দাম নির্ধারণের এখতিয়ার পেতে পারে?
দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নহীনভাবে বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের সরকারি-বেসরকারি সব কোম্পানির মধ্যে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমপ্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য মূল্য নির্ধারণ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব। অথচ জ্বালানি তেলের দাম কখনোই বিইআরসি নির্ধারণ করেনি। যদিও আইন অনুযায়ী বিইআরসিরই তা করার কথা। ডিজেল, পেট্রলের মতো জ্বালানি তেলের মূল্যহার নির্ধারণ করেছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। পাশাপাশি জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েলের মূল্যহার আইন লঙ্ঘন করে বিপিসি নির্ধারণ করে যাচ্ছে।
বলা হচ্ছে, সরকার চাইলে বিশেষ প্রয়োজনে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে। মূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার সরাসরি সরকারের হাতে গেলে শুনানি ছাড়াই জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করতে পারবে তারা। সোমবার ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২২’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জ্বালানি বিভাগকে নির্দেশনাও দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
সরকার বা নির্বাহী বিভাগের হাতে এমন আইন বদলানোর ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা কোন আইন বদলাতে পারবে সেটা বিশেষভাবে বিবেচ্য। যেমন জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানও সরকার বদলাতে পারবে। কিন্তু সরকার এমন কোনো আইন বদলাতে পারবে না যা সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকার অনেক সময় অর্ডিন্যান্স জারি করে অনেক কিছু করলেও পরে সেগুলো টেকেনি, বাতিল হয়েছে। যেমন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার রহিত করে যে ইনডেমনিটি আইন তৈরি করা হয়েছিল, সেটা বাতিল হয়ে গিয়েছে। সরকার বা নির্বাহী বিভাগের এমন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে বিচার বিভাগ সেসব বাতিল করতে পারে। ফলে সরকার যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন অমান্য করে, জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পেতে পদক্ষেপ নেয়ও তাহলে সেটা টিকবে না, বাতিল হতে বাধ্য।
সব অবস্থাতেই এটা মাথায় রাখতে হবে, সরকার যেহেতু নিজে জ্বালানি খাতে ব্যবসা করছে তাই সরকার একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক দুই ভূমিকায় থাকতে পারে না।
লেখক : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
