কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল শনিবার রাজশাহীতে সর্বশেষ বিভাগীয় গণসমাবেশ করবে বিরোধী দল বিএনপি। এরপরই ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে দলটির। রাজশাহীতে বিএনপির এ সমাবেশের দুদিন আগে থেকেই বিভাগের আট জেলায় গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হয়েছে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট। এ ছাড়া গত কয়েক দিন ধরে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ককটেল বিস্ফোরণ ও মজুদের সাজানো অভিযোগে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং ধরপাকড় চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা। অবশ্য ধর্মঘট এবং মামলা-গ্রেপ্তারেও থেমে নেই বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজশাহীমুখী বিএনপি নেতাকর্মীদের স্রোত। গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকেই সমাবেশস্থল রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানমুখী (হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ) বিএনপির নেতাকর্মীদের ঢল নামে। যা গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর ও রাতেও অব্যাহত ছিল।
দূর-দূরান্ত থেকে চাল, ডাল, মুড়িসহ অন্যান্য শুকনো খাবার নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেছেন তারা। স্রোতের মতো নেতাকর্মীরা আসছেন রাজশাহীতে। গত বুধবার রাতে নেতাকর্মীরা গাছতলায়, মাঠে এবং বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রাত কাটান। বুধবারই বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয় পুলিশ। এরপর থেকে শুরু হয় মঞ্চ প্রস্তুত এবং মাঠে বাঁশ-খুঁটি পোঁতার কাজ। তবে পুলিশের শর্ত অনুযায়ী, যারা প্রস্তুতির কাজ করবেন, শুধু তারাই সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন। এ ছাড়া সমাবেশের মাঠে নেতাকর্মীদের রাতে থাকার জন্য তৈরি করা প্যান্ডেল পুলিশের চাপে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা এখনো মাদ্রাসা ময়দানে ঢুকতে পারছেন না। তারা আশ্রয় নিয়েছেন মাদ্রাসা মাঠের পাশে হযরত শাহ মখদুম (রহ.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে। নেতাকর্মীরা খোলা আকাশের নিচে সেখানেই কম্বল মুড়ি দিয়ে রাত কাটান। তবে নেতাকর্মীদের কোনো কোনো দল তাঁবু টানিয়েছে।
এদিকে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে গতকাল সকাল থেকে রাজশাহী থেকে কোনো রুটে বাস ছেড়ে যায়নি। বাইরের কোনো বাস রাজশাহীতে প্রবেশও করেনি। ঢাকাগামী কোচগুলোও সকাল থেকে বন্ধ ছিল। বাস বন্ধের প্রথম দিনেই শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। বাস না চলায় অটোরিকশার মতো বিকল্প ছোট বাহনে মানুষ গন্তব্যে যাচ্ছেন। এ জন্য তাদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে হয়রানি। পরিবহন মালিক শ্রমিকরা বলছেন, সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধসহ ১০ দফা দাবিতে তারা এ ধর্মঘট ডেকেছেন। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে তাদের বিভাগীয় সমাবেশে যাতে নেতাকর্মীরা উপস্থিত হতে না পারে, সে জন্যই এ ধর্মঘট।
ঈদগাহ মাঠে খোলা আকাশের নিচে বিএনপি নেতাকর্মীরা : বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে দূর-দূরান্তের নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থল মাদ্রাসা মাঠের পাশে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাত ১২টার দিকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান নেন সেখানে। গতকাল সকালেও বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসেন। সেøাগান দিতে দিতে তারা মাঠে প্রবেশ করেন। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লোকজন ঈদগাহ মাঠে ঢুকছেন। যারা কিছুক্ষণ আগে এসেছেন তারা ব্যস্ত পলিথিন দিয়ে তাঁবু বানানোর কাজে। কিছু দূর পরপর বড় বড় হাঁড়িতে চলছিল রান্নার কাজ। নেতাকর্মীরা যেন উৎসবে মেতেছেন। তারা জানান, পরিবহন ধর্মঘট এড়াতে আগেভাগেই সমাবেশস্থলে চলে এসেছেন। গতকাল সকাল থেকে ঈদগাহ মাঠে নেতাকর্মীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আগের দিন বিচ্ছিন্নভাবে একা একা বা চার-পাঁচজন মিলে মাঠে ঢুকলেও গতকাল ৪০-৫০ বা ১০০-২০০ জন মিছিল করে মাঠে ঢোকেন। যারা আসছেন তাদের বেশিরভাগই তিন দিনের খাবার সঙ্গে করেই এসেছেন। এনেছেন শীতবস্ত্রও। এরই মধ্যে পুরো ঈদগাহ মাঠে তাঁবু টানানো হয়েছে। নেতাকর্মীরা নিজেরাই এসব তাঁবু টানাচ্ছেন। সঙ্গে করে আনা চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করছেন। ঈদগাহ মাঠের ভেতরে রাজশাহী বিএনপির পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে আসা আমিনুল ইসলাম জানান, তারা এসেছেন প্রায় ৬০০ জন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন পাঁচ মণ চাল ও তরিতরকারি। মুড়ি-চিড়া, বিস্কুটও সঙ্গে এনেছেন। তাঁবু টানানোর জন্য তারা নিয়ে এসেছেন পলিথিন। আবার শীতের কথা মাথায় রেখে সবাই এনেছেন গরম পোশাকও।
ট্রেনে চাপ বেড়েছে : ধর্মঘটের কারণে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনে ও ট্রাকে চেপে নেতাকর্মীরা আসছেন। এতে ট্রেনে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। গতকাল সকাল থেকেই রাজশাহীতে আসা সব ট্রেনে নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। স্টেশন থেকে বের হয়ে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে তারা মাদ্রাসা মাঠের দিকে যান। বাস বন্ধ থাকায় অনেকেই আসছেন ভাড়া করা ট্রাকে। ট্রাকে চেপে নওগাঁ থেকে আসা শামীম ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের সমাবেশের দিন আসতে দেবে না। তাই আগেই চলে এসেছি। খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে সবাই মিলে একটি ট্রাক ভাড়া করে এসেছি।’
পথে পথে বাধার অভিযোগ : সমাবেশে আসতে বিএনপি নেতাকর্মীদের পথে পথে পুলিশ বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। গতকাল দুপুরে সমাবেশের মাঠ পরিদর্শনকালে তিনি এ অভিযোগ করেন। দুলু বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগের প্রতিটি থানায় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা করা হয়েছে। তারপরও রাজশাহীর পথে ছুটছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। তবে কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ তাদের পথে পথে বাধা দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যত বাধাই আসুক না কেন, আমাদের সমাবেশ সফল হবে। মানুষ হেঁটে, সাইকেল, ভ্যান, টেম্পো, রিকশায় চড়ে হলেও এ সমাবেশে আসবে।’
আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন : বিএনপির সমাবেশের আগে গতকাল দুপুরে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ কুমারপাড়ার দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সমাবেশের নামে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী কোনো কর্মকা- এবং রাজশাহীর জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন করলে তা বরদাশত করা হবে না। রাজশাহীর সমাবেশকে ঘিরে বিএনপি যদি এইরূপ কোনো অশুভ তৎপরতা ও অপরাজনীতি করতে চায়, তাহলে রাজপথে থেকে রাজনৈতিকভাবে এর সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীতে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে তারা ইতিমধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। যখনই নির্বাচন এগিয়ে আসে ঠিক তখনই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।’
ধর্মঘটে নাটোরে ভোগান্তি : পরিবহন ধর্মঘটের কারণে নাটোরের সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। গতকাল শহরের বড় হরিশপুর বাইপাস, মাদ্রাসা মোড়, বেলঘড়িয়া বাইপাস ও তেবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় বাসের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বাস না থাকায় অনেকে জরুরি কাজে অটোরিকশা বা ভ্যানে চড়ে গন্তব্যে যান।
* প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নাটোর প্রতিনিধি
