ব্রাজিলের নিউক্লিয়াস ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড মার্শাল

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪২ পিএম

কাসেমিরো

অদৃশ্য কারিগর বলে যে শব্দটি আছে, কাসেমিরোর ক্ষেত্রে তা হুবহু মিলে যায়। ব্রাজিল দলে তারকা একজন আছেন নেইমার। তার পাশে রিচার্লিসন, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বা রদ্রিগোরা কেমন খেলেন তা নিয়ে মাতামাতি সবার। অথচ খেলাটা যে ঠিক করে দেন তার নাম উচ্চারিত হয় কম। কাসেমিরো সেই একজন। মধ্যমাঠ থেকে ডিফেন্স আর আক্রমণভাগের ‘কানেকশন ওয়ার’ (সংযোগ তার) এই ফুটবলার। মাঠে শুধু মাঝের লাইন-ই নয়, দুই পাশের দুই দিকে মানে উইঙ্গারদেরও নিজের ডানা মেলে একীভূত করে ফেলেন কাসেমিরো। সব মিলিয়ে মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো ব্রাজিলের লাইনআপ এক সুতোয় গেঁথে চলা একজন সত্যিকার অর্থেই ব্রাজিল দলের নিউক্লিয়াস।  

যে কোনো দলে কাসেমিরোর প্রয়োজন কতটুকু বা তার অবদান কী তা রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফি কেসে তাকালেই বোঝা যায়। বা ব্রাজিল দলেও তাকাতে পারেন। ঠিক আগের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কাসেমিরো না থাকায় হেরেই গিয়েছিল ব্রাজিল। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ওই লড়াইয়ের আগেরটিতে মানে শেষ ১৬-তেই মাথায় আকাশভাঙা খবর হজম করতে হয় সেলেসাওদের। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখেন কাসেমিরো। এর আগে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও হলুদ কার্ড দেখতে হয়। দুই ম্যাচ টানা কার্ড দেখায় কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেননি। আর ওই ম্যাচে মধ্যমাঠের সেনানীর না থাকা হাড়ে হাড়ে টের পায় ব্রাজিল। মধ্যমাঠ থেকে ঠিকঠাক বলের জোগান না আসায় গোল করতে পারেনি তারা। ফল ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়।

এবার সেই ভয়ে পড়তে হচ্ছে না ব্রাজিলকে। কাসেমিরো আগের ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেননি। ইনজুরির ভয়টাও নেই। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অবশ্যই ব্রাজিল তারকা খেলছেন। বরাবরের মতো এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকার স্বপ্ন একটাই যে করেই হোক পরের রাউন্ডে পা রাখা। সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ব্রাজিলের জয়ের নায়ক কাসেমিরো বলেন, ‘আমাদের একমাত্র লক্ষ্য এখন সেমিফাইনালের জন্য কোয়ালিফাই করা। আমাদের এই গ্রুপটার জন্য যারা এতদিন নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়ে এসেছে ওই পর্বে যাওয়াটা খুবই জরুরি। তবে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এমন একটি অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে নামতে যাচ্ছি যারা জানে ফুটবলটা কীভাবে খেলতে হয়।’

তাই বলে নিজেদের পিছিয়ে রাখছেন না কাসেমিরো। গত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ ১৬ পর্যন্ত খুব বড় ফুটবল শক্তির মুখে পড়তে হয়নি ব্রাজিলকে। কোয়ার্টারে বেলজিয়ামের বিপক্ষে পেরে ওঠেনি। এবারও কোয়ার্টারে আসার পথে সহজ প্রতিপক্ষদের পার করে আসতে হয়েছে। এই প্রথম ইউরোপিয়ান বড় দলের বিপক্ষে নামছে ব্রাজিল। যারা গতবারের রানার্সআপ। কাসেমিরো জানান শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হলেও নিজেদের ওপর বিশ্বাস আছে তার। কারণ ম্যানইউ তারকা জানালেন গত আসরের চেয়ে এবারের দলটি বেশ ভালো, ‘চার বছর পর হয়েছে, নতুন ফুটবলার এসেছে এখন। এবার আমাদের বিকল্প অনেক। এতটাই যে দল বদলেও আমরা আমাদের মূল পরিকল্পনা ধরে খেলতে পারব। এই সুবিধাটা ২০১৮-তে ছিল না। তখন দলে পরিবর্তন আনলে আমাদের পরিকল্পনাও বদল করতে হতো। কোচ তিতে গত চার বছরে দলটিকে ওই ভাবে তৈরি করেছেন যেন সব ফুটবলার একই পরিকল্পনায় খেলতে পারে। আমরা সবাই এখন একটা কথা বলতে পারি। চার বছরে ব্রাজিল যদি সত্যিই কিছু অর্জন করে থাকে তবে এই প্রসেসটা। এখানে আমাদের পরিকল্পনাও বেশ কয়েকটি আছে কিন্তু সুখের কথা হলো সবাই সব পরিকল্পনাতেই মানিয়ে নিয়েছে।’ তিতের তৈরি ব্রাজিলের সব পরিকল্পনারই মূল বিন্দু এই কাসেমিরো। তাকে বিপক্ষ দলের লক্ষ্যবস্তু হতে হয় না। মধ্যমাঠে থাকেন বলে তাকে গোল করতেও হয় না বা গোল আটকাতেও ব্যস্ত থাকতে হয় না। এই সুযোগে খেলাটা তৈরি করে দিতে পারেন দারুণভাবে। অন্যদের নিয়ে বিপক্ষরা যখন ব্যস্ত তখন হুট করে ওপরে উঠে গোলও করে দেন। বা ডি বক্সের বাইরে আনমার্ক থাকা অবস্থায় লম্বা শটে গোলও করেছেন কত। সুইসদের বিপক্ষে ওই জয়ের পর নেইমার যেমন কাসেমিরোকে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডার বলেছিলেন। কখনো কারও মন্তব্যের বিপরীতে মন্তব্য না করা তিতে সেদিন নেইমারের কথায় সহমত জানান। নিজ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুর ব্যাপারে তো আর চুপ থাকতে পারেন না।  

লুকা মদ্রিচ

৩৭ বছর বয়সে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তো বাতিলের খাতাতেই পড়ে গেলেন। অথচ একই বয়সে লুকা মদ্রিচ ছাড়া ক্রোয়েশিয়া কল্পনাই করা যায় না। লিকলিকে শরীর নিয়ে এই বয়সেও পুরো ৯০ মিনিট খেলে চলেছেন ক্রোয়াট তারকা। শুধু খেলাই নয়, ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিচ্ছেন অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা দিয়ে। হয়ে উঠছেন তারুণ্যের আইডল। তাকে দেখে ছুটে চলার সাহস ও মনোবল দুটোই পাচ্ছেন ক্রোয়েশিয়ান তরুণরা। সেই ধারায় মদ্রিচের ডাকে মার্চপাস্ট করে গতবারের রানার্সআপরা আবার চলছে একই পথে। এ পথে তাদের আজকের বাধা ব্রাজিল। টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট ও অন্যতম সেরা দল। এই দলের সঙ্গেই ক্রোয়েশিয়ার ভরসা এই মদ্রিচ।

এই মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১৮ ম্যাচে ১৫টিতে শুরুর একাদশে ছিলেন মদ্রিচ। অথচ পুরো মিনিট খেলতে পেরেছেন মাত্র দুই ম্যাচে। রিয়াল কোচ আনচেলোত্তির ব্যাখ্যা দুটো। এক. মদ্রিচকে ইনজুরিতে ফেলতে চান না তিনি। দুই. ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ‘ফ্রেশ লেগ’ দরকার তার। ক্রোয়াট তারকার বয়সের দিকে তাকিয়েই নাকি তার ওপর চাপ কমাতে এই চেষ্টা আনচেলোত্তির। অথচ এই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার খেলা চারটি ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের আগে মাত্র একবারই উঠে গেছেন মদ্রিচ। তার কানাডার বিপক্ষে ৮৬তম মিনিটে। জাপানের সঙ্গে পেনাল্টিতে গড়ানো শেষ ১৬’র ম্যাচেও লম্বা সময় খেলেছেন মদ্রিচ। নির্ধারিত সময়ের পর ইনজুরি সময়েও ছিলেন। ২০০৬-এ ২০ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন মদ্রিচ। এরপর চতুর্থ বিশ্বকাপে খেলছেন ৩৭ বছর বয়সে। প্রথম বিশ্বকাপের ২০ বছর পর তার পঞ্চম বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এই বয়সী একজন ফুটবলারের টানা চার ম্যাচে এমন উপস্থিতি অবিশ্বাস্যই।

জাপানের বিপক্ষে নকআউটের ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের নবম মিনিটে মদ্রিচকে তুলে নেন কোচ। তাও অনেকটা বাধ্য হয়েই। দলের মূল পেনাল্টি টেকারকে তুলে নেওয়ার ব্যাপারে ম্যাচ শেষে ক্রোয়েশিয়ার কোচ জøাতকো দালিচ জানান, ‘অনেক কথাই হচ্ছে মদ্রিচকে তোলার ব্যাপারে। ওই ম্যাচে মদ্রিচ, কোভাচিচ ও প্যারিসিচ তিনজনই খুব ক্লান্ত ছিল। বেঞ্চে আমাদের ফুটবলাররা প্রস্তুত ছিল নতুন শক্তি নিয়ে। তাহলে আমি কেন পেনাল্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ক্লান্ত ফুটবলার রাখব।’ একই সঙ্গে মদ্রিচের এই আসরেই জাতীয় দলের শেষের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছেন দালিচ, ‘এটা মদ্রিচের শেষ টুর্নামেন্ট না। সে অবশ্যই ক্রোয়েশিয়ার হয়ে খেলবে, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। কারণ সে পেশাদার একজন ফুটবলার। এমন একজনের খেলার বয়স সংখ্যার বয়সের সঙ্গে তুলনা হতে পারে না। আমাদের ওকে সামনেও প্রয়োজন।’ কিন্তু বিশ্বকাপের আগে মদ্রিচ বলেছিলেন এই আসরই তার শেষ। কিন্তু টুর্নামেন্টের মাঝপথে অবসরের প্রশ্নে উত্তর দেন, ‘আমি এখানে উপভোগ করছি। ভবিষ্যতের কথা এখনই বলতে পারছি না।’ ৯০ মিনিট করে টানা চার ম্যাচ যিনি খেলতে পারেন ৩৭ বছর বয়সে, তার পক্ষে খেলাটা উপভোগ করাই স্বাভাবিক। আর অবসরের কথা ভুলে যাওয়াও দোষের কিছু নয়।

নিজের অবসরের কথার এই নাটকীয় ‘ইউটার্ন’-এর মতো বিশ্বকাপ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াও যে নাটক পছন্দ করে তা জানালেন মদ্রিচ। গত বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠার পথে নকআউটের চারটির মধ্যে তিনটি ম্যাচেই ক্রোয়াটরা অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছে। এর দুটিতে আবার পেনাল্টি ভাগ্যে জিতেছে তারা। সেই একই পথে যেন এবারও হাঁটছে ক্রোয়েশিয়া। নকআউটের নিজেদের প্রথম ম্যাচেই পেনাল্টিতে জিতল তারা। ব্রাজিল ম্যাচে এমন কিছু হবে কিনা তা ভবিষ্যৎই বলে  দেবে। তবে মদ্রিচ আশ্বস্ত করলেন নাটকীয়তা বাদে হয় না ক্রোয়েশিয়ার! জাপানের বিপক্ষে পেনাল্টি জয়ের ম্যাচের পর রিয়াল তারকা জানান, ‘মনে হচ্ছে নাটকীয়তা ছাড়া আমাদের হয় না। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে কঠিন এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে কঠিন ম্যাচ জিতেছি আমরা। প্রথম গোল হজমের পর ফিরে আসা কোনো দলের জন্যই সহজ হয় না। আমরা তা করে দেখিয়েছি এবং খেলাটা পেনাল্টি পর্যন্ত টেনে নিয়েছি। গত বিশ্বকাপেও আমরা লম্বা ম্যাচ জিতেছি। এই বিশ্বকাপে প্রথম নকআউটে এমনটা হলো। হতে পারে এটা আমাদের বৈশিষ্ট্য যে লড়াই নাটকীয় হয়ে ওঠার পর আমরা জিতি!’ এই নাটকীয়তাই আলাদা করে তুলেছে ক্রোয়েশিয়াকে। বড় দলের বিপক্ষে সাহসও জুগিয়েছে। মদ্রিচরা জানেন নিজেদের চেয়ে এগিয়ে থাকা শক্তিদের নাটকীয়তা উপহার দিতে পারেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত