গোলপোস্টের নিচে দুই পেনাল্টি স্পেশালিস্ট

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৪৮ এএম

বাঘ-চিতার বৈশিষ্ট্য কী? শিকারের দিকে শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে। বাগে আসার পর সেকেন্ডের ব্যবধানে তা ছোঁ মেরে আয়ত্বে নিয়ে নেয়। বাঘ-চিতা কিংবা কালো কুঁচকুঁচে পুমা যাই বলুন সবগুলোর ওই একই কাজ। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বা ডমিনিক লিভাকোভিচদের অনায়াসে এদের মনোযোগ ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

কীভাবে! এরা যে পেনাল্টি স্পেশালিস্ট। তাদের শিকার ওই ‘ছোট বল’ পায়ে বিপক্ষের ফুটবলার একদম ১২ গজ দূরে দাঁড়িয়ে। দৌড়ে এসে শট নেওয়ার সময়ও গোলরক্ষকদের হেলদোল নেই। অথচ শট নেওয়ার পর যখন বলটি হাওয়ায় ভাসল অমনি বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুহূর্তেই তা তালুবন্দি করবেন নয়ত ফিস্ট করে ফিরিয়ে দেবেন। পাশে ২৪ ও উচ্চতায় ৮ ফুটের পোস্টে নিজের চারপাশ খালি থাকলেও তাতে বল ঢুকতে দেবেন না কিছুতেই। ঠিক যেন বাঘ-চিতার মতোই শিকারি এই পেনাল্টি স্পেশালিস্টদ্বয়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলে চোখ রেখে শিকার ধরে ফেলা। কোয়ার্টার ফাইনালে নিজের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে একজন নেদারল্যান্ডস, অপরজন ব্রাজিলকে বিদায় করেছেন। আলাদা দুই ম্যাচে স্বমহিমায় প্রমাণ করেছেন নিজেদের বিশেষত্ব। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার মার্তিনেজ ও ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার লিভাকোভিচ সত্যিকার অর্থেই পেনাল্টি স্পেশালিস্ট।  

এ দুই গোলরক্ষকের পেনাল্টি সেভের ইতিহাস দারুণ সমৃদ্ধ। মার্তিনেজ গত কোপা আমেরিকায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে সেমিফাইনালের টাইব্রেকারে ফিরিয়েছিলেন তিন শট। ওই কীর্তি তাকে এনে দিয়েছিল বিশ্বব্যাপী খ্যাতি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দুর্বল দল অ্যাস্টন ভিলার গোলরক্ষক হয়েও ওই ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার নাম্বার ওয়ান হয়ে যান। রক্ষণবূহ্যের পর তিনি দলটির গোলপোস্টের আগে সুদৃঢ় দেয়াল। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ভার্জিল ফন ডাইক ও স্টিভেন বার্গউইসের শট ফিরিয়ে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দেন মার্তিনেজ। ম্যাচ শেষে জানান একটু আগের ভুল শোধরানোর দায়ভার ছিল তার কাঁধে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে হওয়া সমতাসূচক গোলটি আটকাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে মার্তিনেজ বলেন, ‘আমি দলকে গোল আটকে সহায়তা করতে পারিনি। তাই আমি জানতাম এখানে (পেনাল্টি) আমাকে কিছু করতেই হবে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই যে আমি দুটো সেভ করতে পেরেছি। আমি আরও সেভ করতে পারতাম। ফুটবলে মাঠে কথা বলতে হয়। ওরা (নেদারল্যান্ডস) ম্যাচের আগে অনেক কথা বলছিল যা আমাকে তাতিয়ে দেয় এবং ভালো করার শক্তি দেয়।’ পুরো আর্জেন্টিনার জন্যই শুক্রবার রাতে নেদারল্যান্ডস কোচ লুই ফন গাল ছিলেন চক্ষুশূল। এই কোচকে দেখতে পারেননি মার্তিনেজও, ‘আমার মনে হয় তার মুখ বন্ধ রাখা উচিত।’ এছাড়া স্প্যানিশ রেফারি অ্যান্তোনিও মাতুয়েরও সমালোচনা করতে থামেননি আর্জেন্টাইন গোলি, ‘সে সবকিছু ডাচদের দিয়ে দিচ্ছিল। ১০ মিনিট ইনজুরি সময় দিয়েছে কোনো কারণ ছাড়াই। ডি বক্সের একটু বাইরে নেদারল্যান্ডসকে ২/৩ বার ফ্রিকিক দিয়েছে। সে চেয়েছিল ওরা যেন স্কোর করে।’ এমনকি সামনের ম্যাচগুলোতেও এই রেফারিকে আর চাইছেন না মার্তিনেজ, ‘আশা করি সামনে আর এই রেফারিকে পাব না। সে একদম অথর্ব।’

মার্তিনেজের এই কীর্তির চার ঘণ্টা আগে একই কীর্তি গড়েন লিভাকোভিচও। ক্রোয়েশিয়ান এই গোলরক্ষক দলটির ইতিহাস ধরে উঠে এসেছেন যেন। গত বিশ্বকাপেও ফাইনালে ওঠার পথে দুবার পেনাল্টিতে নকআউটের ম্যাচ জিতেছিল ক্রোয়েশিয়া। সেবার নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক ডমিনিক সুবাসিচ। এবারও দুটি ম্যাচে পেনাল্টি থেকেই জিতল দলটি। উত্তরসূরির পদাঙ্ক মেনে এবার জাপানের পর ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি জয়ের নায়ক লিভাকোভিচ। এর আগে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে মোট ১১ সেভ করেছেন তিনি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাকে নিয়ে একটি লেখাও ছিল না ক্রোয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমে। অথচ টানা দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ওঠার দিনে তিনিই শিরোনামে। ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ের দিন ম্যাচসেরা এই গোলরক্ষক বলেন, ‘প্রথমত আমরা খুব অভিজ্ঞ এবং আমরা ফাইটার হিসেবেই তৈরি হয়েছি। আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখি না এবং নিজেদের সেরাটা দেই। এটাই আমাদের সফলতার রেসিপি।’ নিজের সেরা অস্ত্রকে নিয়ে ক্রোয়েশিয়া কোচ জøাতকো দালিচ বলেন, ‘লিভাকোভিচ তার কাজটা করেছে। পেনাল্টির বাইরে সে পুরো ম্যাচজুড়েই আমাদের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে। ব্রাজিল বেশ কয়েকবার ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল কিন্তু লিভাকোভিচ সবগুলোই রুখে দেয়। প্রতিটা কঠিন মুহূর্তে সে আমাদের জন্য দাঁড়িয়েছে।’  নকআউটের সিঁড়ি চড়ে দুই দল এখন সেমিফাইনালে। দুই গোলরক্ষকের জন্যও তাই অ্যাসিড টেস্ট অপেক্ষা করছে। রক্ষণে দারুণ ক্রোয়েশিয়া আর আক্রমণে সেরা আর্জেন্টিনা যতই নিজেদের সেরাটা দিক না কেন দিন শেষে ভাগ্য গড়ে দেবেন এ দুই পেনাল্টি স্পেশালিস্টের যেকোনো একজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত