বিদেশিদের নজর কাড়তেই দুই দলের শোডাউন

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৪৬ এএম

দেশের রাজনীতিতে বিদেশ নির্ভরতার বিষয়টি বেশ পুরনো। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বিদেশিদের হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা বেড়েছে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ধরে রাখা আর ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপির ক্ষমতার চেয়ারে বসার এই লড়াই বিদেশিদের আরও সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া বিদেশিদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা স্বার্থও রয়েছে। সেই স্বার্থের কারণে সুবিধাজনক দলকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চায় বা রাখতে চায়। 

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরির বিষয়ে এসব তথ্য। অন্য আরও লক্ষ্যের সঙ্গে দুই দলের বড় সমাবেশের লক্ষ্যও তাই বিদেশিদের আস্থা আনা।

দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশিদের দিকে বেশি নজর বিএনপির। আবার চাপমুক্ত থাকতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তাদের হাতে রাখতে নানা কৌশলে রাজনীতি করে চলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি।

প্রকাশ্যে বিদেশিদের নজর কাড়তে শোডাউন বা বড় বড় জমায়েতের কথা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কোনো নেতারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।

তবে দুই দলের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, শক্তিধর কয়েকটি দেশের কর্তাব্যক্তিরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে তেমন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ জনমত যেদিকে শক্তিধর দেশের সমর্থনও সেদিকেই থাকবে। বাংলাদেশের মানুষের চাওয়ার বাইরে তারা কোনো পক্ষ হতে চায় না। তবে গণতন্ত্র ধ্বংস হোক এমন কোনো পথেও দেশের কোনো রাজনৈতিক দলকেও তারা চায় না। 

তাই বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে শোডাউনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তেমনি আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন প্রমাণে শোডাউনের দিকে ঝুঁকেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। দুই দলের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের কর্মসূচিও এখন বিদেশিদের নজর কাড়ার লক্ষ্যে নেওয়া হয়। কর্মসূচির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জানান দিতে চায় যে, সরকার ও দল দেশের মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে, থাকবে। অন্যদিকে সরকার জনবিচ্ছিন্ন সেটা প্রমাণ করতে নানা কায়দায় রাজনীতি করে চলেছে বিএনপি। নিজেদের পক্ষে বিদেশিদের সমর্থন টানতে দেশের জনগণকেই অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তাই দুই দলেরই যেকোনো কর্মসূচিতে মানুষের উপস্থিতি ঘটাতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। পৃথক কর্মসূচি আয়োজন করতে গিয়ে কার চেয়ে কে বেশি লোকসমাগম ঘটাতে পারে সে চেষ্টায় থাকে দুই দলই।

সূত্র জানায়, বিদেশিরাও জনসমর্থন কোন দিকে সেটা দেখতে চায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের বাইরে গিয়ে কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকবেন না তারা, ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা তাদের বক্তব্যে এমনটাই জানিয়ে দিয়েছেন। বিদেশি কূটনীতিকরা আরও জানিয়েছেন, দেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন রাজনীতিতে ও নির্বাচনে দেখতে চান তারা। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে জনগণের দাবির সঙ্গেই বিদেশিরা থাকবেন।

সূত্র জানায়, কোনো কোনো দেশের দূত বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। তাহলে তারাও পক্ষে অবস্থান নেবেন। তাই বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে সংগঠনকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি জনগণ তাদের সঙ্গে আছে, সেটা প্রমাণে গণসমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়াতে বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। সমাবেশে আসা লোকজনের খাবার, থাকার ব্যবস্থা করেছে। তাঁবু টানিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কর্মসূচিগুলো শুধু দেশের জনগণের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও নজর কেড়েছে। বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলা, কর্মসূচি করতে না দেওয়া ইত্যাদি। সবই আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।’ তিনি বলেন, “এতদিন এসব বিষয় বাংলাদেশের দূতাবাস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা আরও বিস্তার লাভ করেছে। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি’। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন বিষয় আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষè নজরে রয়েছে।”        

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় কখনো নরম ও কখনো গরম অবস্থানও দেখিয়ে আসছেন। সে তুলনায় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সুসংহত করতে বিভিন্ন পথ অনুসরণ করে চলেছে। সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশিদের সোচ্চার করে তুলতে বিএনপি টাকা খরচ করে লবিস্টও নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির অপপ্রচারের জবাব দিতে সরকারের পক্ষেও লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। রাজনীতির মাঠে এ নিয়ে নানা সময় দুই দলই কথার লড়াই করে।

আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জনসভা নিয়ে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ। লোকসমাগমকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনসভাগুলোতে স্বয়ং দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকছেন। আওয়ামী লীগের জনসভা সফল করতে যেখানে জনসভা করা হয় তার আশপাশের জেলার নেতা ও দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি লোকসমাগমের ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক পরিম-লে সরকার ও দলের জনপ্রিয়তা ও শক্তি জানান দেওয়া।

রাজনীতিতে ব্যাপক লোক জমায়েতের যে কৌশল সেটা অনুসরণ করে দুই দলই প্রমাণ করতে চায় নিজ নিজ জনসমর্থন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মসূচিগুলো শেষ হলে লোকসমাগম নিয়ে কর্মসূচির সফলতা ব্যর্থতা নিয়ে দুই দলের নেতারাও বিতর্কে জড়ান। কর্মসূচি শেষে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলই তাদের কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের সমাগম ঘটেছে বলে দাবি করে। 

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশ তোষণের রাজনীতি আওয়ামী লীগ করে না। তবে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় এই নীতিতে বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগ। এই নীতি অনুসরণ করেই দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি প্রতিনিয়তই বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নোয়ায়। বিএনপি দেশের বিরুদ্ধে বিদেশিদের কাছে অপপ্রচারে লিপ্ত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত