গুজরাটে বিজেপি, হিমাচলে কংগ্রেস, কর্ণাটক কার

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৫৫ পিএম

বিজেপি শিবিরের ‘আত্মমর্যাদার লড়াই’ ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মভূমি গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচন। বিজেপি গুজরাটে জনপ্রিয় দল এবং এবারের বিধানসভা নির্বাচনের জয়ও ছিল নিশ্চিত। তবু বিজেপি শিবিরে এই বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে বেশ টেনশন দেখা গেছে। গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন ২০২২-এর সর্বশেষ ফলাফলে ১৮২টি আসনের মধ্যে ১৫৬টি আসনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি। এই প্রদেশে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ১৭টি আসন। দিল্লি ও পাঞ্জাব জয়ের পর গুজরাটে চমক দেখানোর ঘোষণা দিলেও মাত্র ৫টি আসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে।

এবারের গুজরাট বিধানসভায় একজন মুসলমানও বিধায়ক হয়েছেন। ১৮২ জনের মধ্যে ১০৫ জনই নতুন বিধায়ক। এটা একটা ভালো দিক কংগ্রেস ও বিজেপি বয়স্ক নেতাদের নেতৃত্বে রাখলেও নির্বাচনের মাঠে তরুণদের সুযোগ করে দিচ্ছে। গুজরাটে বিজেপির নিরঙ্কুশ সমর্থন থাকলেও বিজেপি নির্বাচনের আগে বেশ বিচলিত ছিল। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া বিভিন্ন বিধানসভা ও লোকসভার উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী পরাজিত হয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ উত্তর প্রদেশের লোকসভা উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের স্ত্রী ডিম্পল যাদব। গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লি ছেড়ে গুজরাটের গান্ধীনগরে ছিলেন। প্রায় ৩১টি জনসভা ও তিনটি রোড শোতে অংশ নিয়েছেন তিনি। একটি সহজ জয় পেতে এমন চাপ নেওয়া প্রমাণ করে ২০২৪ সালের লোকসভার আগে জনপ্রিয়তা প্রমাণে কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি না গেরুয়া শিবির।

হিমাচল বিধানসভা নির্বাচন : ডিসেম্বর এলে উত্তরের রাজ্য হিমাচলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে আসে। সারা ভারতবর্ষের ভ্রমণপিপাসু ও নবদম্পতিরা তাদের বিশেষ সময় কাটানোর জন্য এ সময়টায় ভিড় করেন পাহাড়ি এই প্রদেশটিতে। ডিসেম্বরে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নামলেও নভেম্বর থেকে রাজনীতির উত্তাপ শুরু হয় রাজ্যটিতে। গুজরাটের কাছাকাছি সময়ে হিমাচলেও বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিধানসভার ৬৮ আসনের মধ্যে ৪০টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে কংগ্রেস। ২৫টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে বিজেপি। এই জয় কংগ্রেসের জন্য বিশেষ অর্থবহ। বিভিন্ন প্রদেশের বিধানসভায় পরপর হারার পর নতুন একটি প্রদেশে সরকার গঠন করতে পারা নিঃসন্দেহে সর্বভারতীয় কংগ্রেসকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা ও নতুন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুনের রাজনৈতিক কৌশলে ‘অর্জন’ ও ‘সৌভাগ্য’ হিসেবে দেখা হবে এ বিজয়। হিমাচল প্রদেশ বিজেপির হাতছাড়া হওয়া তাদের জন্যও একটি বার্তা। গত মার্চে পাঞ্জাবে হারার পর আরেকটি হারের অভিজ্ঞতা হলো গেরুয়া শিবিরের। সারা ভারতবর্ষে কংগ্রেসের কোণঠাসা সময়ের সুযোগে যেভাবে একের পর এক জয় তুলে নিচ্ছিল বিজেপি সে অপরাজিত জয়ে পাঞ্জাব ও হিমাচল দুটি বড় ধাক্কা। এ ছাড়া প্রভাবশালী উত্তর প্রদেশে বিজেপি জয় পেলেও পপুলার ভোট ছিল ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। বিরোধীদের সম্মিলিত ভোট বিজেপির চেয়ে বেশি ছিল। ফলে আগামী লোকসভা নির্বাচন বিজেপির জন্য একেবারে নিশ্চিত বিজয়ের কোনো বার্তা রাখছে না।

হিমাচলে কংগ্রেস জিতলেও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে দলটিকে আরেক জটিলতায় পড়তে হবে। একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে। কংগ্রেসের পক্ষে এবারের নির্বাচনে জনপ্রিয় মুখ ছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিংহের স্ত্রী প্রতিভা সিংহ। তিনি এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছেন। এ ছাড়া সদ্য বিলুপ্ত সংসদের বিরোধী দলনেতা মুকেশ অগ্নিহোত্রীও মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। অন্যদিকে সেখানকার কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সুখবিন্দর সিংহ সুখুও মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবিদার। হিমাচলে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে কংগ্রেসকে জাতপাতের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়। ঠাকুর জাতিগোষ্ঠী ও ব্রাহ্মণ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য করার একটা রেওয়াজ আছে রাজ্যটিতে। ঠাকুর জাতিগোষ্ঠী থেকে মুখ্যমন্ত্রী করলে ব্রাহ্মণ জাতিগোষ্ঠী থেকে উপমুখ্যমন্ত্রী অথবা ব্রাহ্মণ জাতিগোষ্ঠী থেকে মুখ্যমন্ত্রী করলে ঠাকুর জাতিগোষ্ঠী থেকে উপ-মুখ্যমন্ত্রী করার রেওয়াজ রয়েছে। এই রেওয়াজে ঠাকুর জাতিগোষ্ঠী থেকে প্রতিভা সিংহ বা সুখবিন্দর সিংহ মুখ্যমন্ত্রী হলে ব্রাহ্মণ হিসেবে মুকেশ অগ্নিহোত্রী হতে পারেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী। মুকেশ মুখ্যমন্ত্রী হলে ঠাকুর বংশ থেকে কাউকে উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। এই জটিলতা নিরসনে প্রদেশ নেতাদের সমন্বয় করতে এরই মধ্যে দিল্লি থেকে শিমলা গিয়েছেন কেন্দ্র কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল।

দিল্লি পৌর নির্বাচন : গুজরাট ও হিমাচলের প্রাদেশিক নির্বাচন ছাড়াও এই মাসে মর্যাদাপূর্ণ দিল্লি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হওয়া অবিভক্ত দিল্লি পৌরসভার এই নির্বাচনে জয় পেয়েছে রাজ্য দিল্লির শাসক দল আম আদমি পার্টি (এপি)। এর ফলে ১৫ বছর পর দিল্লি পৌরসভার নিয়ন্ত্রণ হারাল বিজেপি। উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচন, হিমাচলের বিধানসভার পর খোদ দিল্লিতে আরেকটি পরাজয় পেল বিজেপি। যদিও এই পৌর নির্বাচনে বিজেপি দ্বিতীয় হলেও কংগ্রেস হয়েছে তৃতীয়।

কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচন : গুজরাট, হিমাচলের পর লোকসভা নির্বাচনের আগে কর্ণাটকের বিধানসভা অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের মে মাসে। যে হিজাব বিতর্কে সারা ভারত উত্তাল হয়ে উঠেছিল সে হিজাব বিতর্কের উত্থান দক্ষিণের কর্ণাটক রাজ্য থেকে। কেরালায় বামদের আধিপত্য, তামিলনাড়–তে ডিএমকের আধিপত্য থাকলেও কর্ণাটক রাজ্যে বিজেপির অবস্থান দক্ষিণের অন্যান্য প্রদেশের চেয়ে বেশ ভালো। ফলে গুজরাটের জয়ের ধারাবাহিকতা ও হিমাচলের পরাজয় থেকে ফিরতে বিজেপি এবার নতুন উদ্যমে মাঠে নেমে পড়বে। গুজরাটের জয় নিয়ে কংগ্রেসের কোনো বিশেষ প্রত্যাশা ছিল না, যেহেতু দীর্ঘদিন রাজ্যটি বিজেপি শাসন করে আসছে। কর্ণাটক নিয়ে কংগ্রেস বিজেপি দু-দলেরই ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজ্যটিতে ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ জেডিএস জোট সরকার গঠন করলেও এক বছরের মাথায় আস্থা ভোটে এই জোট সরকারকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। নির্বাচনে একক দল হিসেবে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও রাহুল গান্ধী চটজলদি জেডিএসের সঙ্গে জোট করে জেডিএসের কুমারস্বামীকে মুখ্যমন্ত্রী মেনে বিজেপিকে আটকে দেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বিজেপি বিভিন্ন প্রদেশে জোট ভাঙানো, নেতা বাগানো ও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট করার কৌশল নেন। তাদের প্রথম টেস্টটি হয় কর্ণাটকে। রাহুল গান্ধী যে কৌশলে এক বছর আগে বিজেপিকে সরকার গঠন করতে দেয়নি, ঠিক একই কৌশলে ২০১৯-এ কর্ণাটকের ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। ফলে ২০২২-এর কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচন নতুন এক ‘মর্যাদার লড়াই’ বিজেপি, কংগ্রেসের কাছে।

রাজনৈতিক প্রতিশোধের ব্যাপারও আছে এই নির্বাচনে। অন্যদিকে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে এটিই সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচন। হিমাচলে জয় পাওয়া আত্মবিশ্বাসী কংগ্রেস জেডিএসসহ বিজেপি বিরোধীদের নিয়ে ঐক্য করে এই নির্বাচনে জেতার চেষ্টা করবে, যেখানে নতুন কংগ্রেস সভাপতির জন্মস্থান কর্ণাটকে। কর্ণাটক থেকে তিনি দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত ছিলেন। রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা যখন কর্ণাটকে তখন বেশ কয়েকজন স্টারকে দেখা যায় তার সঙ্গে পা মেলাতে। সামনের বিধানসভায় নতুন চমক নিয়ে বেশ কৌশলে জয় পেতে চাইবে কংগ্রেস।  বিজেপিও ছেড়ে কথা বলবে না। তবে বিজেপির নির্বাচনের কৌশল ভিন্ন। ভারতজুড়ে এখন হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কার চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত ইতিহাস, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাবাক্য ছড়িয়ে মুহূর্তে একটি ম্যাসাকার তৈরি করার প্রবণতা দেখা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের আগে কর্ণাটকের হিজাব ইস্যু সারা ভারতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরে স্কুলে যেতে পারবে কী পারবে না এই বিতর্কটিই প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে। এর মধ্যে যুক্ত হয় উত্তর প্রদেশের জ্ঞানবাপী মন্দিরে শিবলিঙ্গ থাকার দাবি। এবার গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের ‘ব্রাহ্মণ সংস্কারী ধর্ষক’ দাবি করে মুক্তি দেওয়া হয়। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে যাওয়া কয়েকজন ‘অমুসলিম শরণার্থী’কে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

বিজেপি বরাবরই নির্বাচনের আগে এভাবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কিছু বিতর্ক উসকে দেয়। এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চান বিজেপি হিন্দু ধর্মের ত্রাণকর্তা, ‘ধর্ম বাঁচাতে’ তাদের ভোট দিতে হবে। গুজরাটের নিশ্চিত জয়ের পর কর্ণাটকমুখী রাজনীতি শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে ভারতে ফের নতুন ধর্মীয় বিতর্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সুবিধা দেবে বিজেপিকে। অন্যদিকে কংগ্রেস জোটসঙ্গী তৈরি ও জনপ্রিয় মুখ বাছাইয়ে নেমে পড়বে শিগগির। বিজেপি যেমন প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে জয়ী হয়ে এসেছে, কংগ্রেসও সভাপতির রাজ্যে জয়ী হতে মরিয়া।

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত