আবেগে আর্জেন্টিনা ফুটবলে ফ্রান্স

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:০২ এএম

কাল রাতে কাতার ইউনিভার্সিটিতে বেস ক্যাম্পে মেসির কি ঘুম হয়েছিল? আল সাদে নিজেদের ক্যাম্পে কিলিয়ান এমবাপ্পেও কি দুই চোখ এক করতে পেরেছেন? আজ দুজনের সামনেই সত্যিকারের অমরত্ব লাভের সুযোগ। হয়তো বলতে পারেন ১৯ বছর বয়সেই তো এমবাপ্পে বিশ্বকাপ জিতে অমরত্ব পেয়েছেন। যদি বিশ্বকাপটাই অমরত্ব লাভের মাপকাঠি হয়, প্রায় শত বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে তবে তো অমর ফুটবলারের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা! চার বছর পরপর আসা বিশ্বকাপের মূল্য অনেক। তাই বলে এটাই সেরা নির্ণায়ক নয়। সেটা হলে ইয়োহান ক্রুইফ, ডি স্টেফানো, ইউসেবিওদের কথা কেউ মনে রাখত না। এই ফুটবল গ্রেটরা হারিয়ে যেতেন অতল গহ্বরে। বিশ্বকাপের ১৭ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার মেসি। আগের চারবারের একবারও বিশ্বকাপ জেতা হয়নি আর্জেন্টাইন তারকার। তাই তার নিজের কাছেই বিশ্বকাপটা অন্য সব অর্জনের চেয়ে আলাদা। বিশ্বাস করেন একটা শিরোপাই তাকে  দেবে অমরত্ব। সেটা পেতে আজ তার দলকে লড়তে হবে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি এমবাপ্পের ফ্রান্সের সঙ্গে। টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক হওয়ার হাতছানি এমবাপ্পের সামনে। দুই তারকার মহালড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামের মহামঞ্চ। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’র শো-স্টপার হতে নামছে তাদের দু’দল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। লোগোতে তৃতীয় তারকা বসানোর সুযোগ দু’দলের।        

সৌদি আররের কাছে হারার পরই যেন মেসি বুঝে গিয়েছিলেন, নিজের শেষটা শিরোপায় রাঙাতে তাকেই কিছু একটা করতে হবে। সেটাই করেছেন। এর পরের ছয় ম্যাচে মেসি খেলেছেন ভিনগ্রহের ফুটবল। তার ছোঁয়ায় দলটাও বদলে গেছে। দারুণ প্রত্যয়ী আকাশি-সাদাদের আজ অবশ্য দিতে হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ফাইনালের মঞ্চে দিদিয়ের দেশম এক ভয়ংকর দল নিয়ে হাজির হবেন। সেই দলের সেনাপতি হবেন এমবাপ্পে। দারুণ ছন্দে থাকা পিএসজির ফরোয়ার্ডও এই আসরে গর্জে উঠেছেন বারবার। মেসির মতোই গোল ৫টি, অ্যাসিস্টেও সমতা। অমরত্বের হাতছানি তো আছে ২৩ বছরের তরুণেরও। তো, কেন তিনি সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইবেন? সতীর্থ মেসির শেষ ম্যাচ বলে নিশ্চয় এক ইঞ্চিও ছাড় দেবেন না। তার দলের চোখও যে আর্জেন্টিনার মতো তৃতীয় বিশ্বকাপে। মেসিকে ছাপিয়ে আরেকবার সেরা হতে এমবাপ্পেকে ঘটাতে হবে গোল বিস্ফোরণ।

মেসির রাতটা নিকষ কালো অন্ধকারে ভরে দিতে এমবাপ্পে ছাড়াও আছেন আরও অনেকে। অসাধারণ রূপে আবির্ভূত হয়েছেন আন্তোইন গ্রিজমান। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল করিয়েছেন তিনি। এছাড়া চার গোল করে করিম বেনজেমাকে ভুলিয়ে দেওয়া স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিরু আছেন। আছেন ডান দিক থেকে নিখুঁত সব আক্রমণ রচনা করে দেওয়া উসমান দেম্বেলে। আর মেসির গতিরোধ করতে আছেন ভারানে, কোনাতে, থিও হার্নান্দেজ, শুয়ামেনির মতো সৈনিক। তাই আজ মেসিকে একা হাসলে চলবে না। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে মাংসপেশিতে অস্বস্তি যোগ হওয়ায় মেসির স্বরূপে আবির্ভূত হওয়া সম্পূর্ণই ঈশ্বরের হাতে। তার বাঁ পায়ে ঈশ্বর আরেকবার ভর করলেই হবে বিচ্ছুরণ। ছয় ম্যাচে চারবার ম্যাচসেরা হয়েছেন। তবে ফাইনালেই সামর্থ্যরে সেরাটা ঢেলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মেসির সেরাটা বেরিয়ে এলে কাজটা সহজ হয় আলবিসেলেস্তেদের। তাই বলে অন্যদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।

এমবাপ্পে, গ্রিজমানদের রুখতে হলে এক মুহূর্ত মনোযোগ হারানো চলবে না আকুনা, মলিনা, মনতিয়েল, রোমেরোদের। আর মাঝমাঠে অঁদ্রিয় রাবিয়, শুয়ামেনিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেসি ও মাকড়সার পায় খেলা জুলিয়ান আলভারেজকে বলের জোগানের দায়িত্বে থাকবেন রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেসরা। এ ছাড়া চোট কাটিয়ে ফেরা তারকা ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, লাউতারো মার্তিনেজরা আসবেন বেঞ্চ থেকে। দু’দলের দুই দুর্গ সামলানোর দায় এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং হুগো লরিসের। আর্জেন্টিনাকে সেমিতে নিয়ে আসতে কোয়ার্টারে টাইব্রেকারের নায়ক হয়েছিলেন মার্তিনেজ। আজকের ম্যাচ সেই ভাগ্য পরীক্ষায় গেলে অ্যাস্টন ভিলা গোলকিপারকে আরেকবার জাদু দেখাতে হবে, ‘আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছি। গত বছর (কোপা আমেরিকার ফাইনাল) ব্রাজিল ছিল ফেভারিট, এখন ফ্রান্স ফেভারিট। তারা একজন খেলোয়াড়নির্ভর দল নয়। পুরো দলটাই শক্তিশালী। তাদের আক্রমণভাগের সামর্থ্য জানা আছে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ 

ফরাসি অধিনায়ক হুগো লরিস তেকাঠির নিচে জাত চিনিয়েছেন মরক্কোর বিপক্ষে ভীষণ চাপের সেমিফাইনালে। অসাধারণ সব সেভে থামিয়ে দিয়েছেন মরোক্কান

রূপকথা। ফরাসি অধিনায়ক হুগো লরিস জানিয়েছেন আজ তাদের প্রতিপক্ষ শুধু মেসি নন, পুরো আর্জেন্টিনা দল ‘অনেকেই ভেবেছিল আমরা পারব না। তবে এখন আমরা ফাইনালে পৌঁছে গেছি, যেখানে অসাধারণ একটা দলের বিপক্ষে খেলতে হবে। এটা ঠিক, বিশ্ব ফুটবলকে মেসি অনেক কিছু দিয়েছেন, তবে কালকের (আজ) ম্যাচটা হতে যাচ্ছে ফ্রান্স বনাম আর্জেন্টিনা। যেকোনো মূল্যে সেটা আমরা জিততে চাইব।’

মহাদ্বৈরথের আগে ফরাসি শিবিরে দুশ্চিন্তার নাম ক্যামেল ফ্লু। বেশ কজন আক্রান্ত এই নতুন ভাইরাসে। যাদের আলাদা রাখতে হচ্ছে অন্যদের মধ্যে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। আগেই ভুগছিলেন রাবিয় ও দায়ত উপামেকানো। নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন দুই সেন্টারব্যাক ভারানে ও কোনাতে। ফরোয়ার্ড কিংসলে কোম্যানের মধ্যেও আছে উপসর্গ।

সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে দেশমকে ঠিকই কষতে হচ্ছে মেসিকে থামানোর ছক। ‘আমরা আমাদের মতো করে এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। সেসব ব্যবস্থাই নিচ্ছি যেগুলো নেওয়া প্রয়োজন’ কাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন ফরাসি কোচ, ‘বেশ কজন আক্রান্ত। তবে তাদের আজকের অবস্থা সম্পর্কে আমার জানা নেই।’ এই বিশ্বকাপটা আর্জেন্টিনা মেসির জন্য জিতুক, এমন চাওয়া লোকের সংখ্যা অনেক। লুসাইলে আজ আর্জেন্টাইন সমর্থকও থাকবে বেশি। সে কথা স্মরণ করে দিলে দেশম হেসে বলেন ‘আমি একা, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। এমনকি কিছু ফরাসিও হয়তো এমনটাই চাইছে। আমি জানি আর্জেন্টিনার পেছনে অনেক সমর্থক আছে। তাই মাঠে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ থাকবে এবং আর্জেন্টিনার জন্য গলা ফাটাবে। তারা গ্যালারি থেকে সারাক্ষণ অসাধারণ সব গান করে, যেটা চিত্তাকর্ষক। তবে এটা বিশ্বকাপ। আর আমরা গ্যালারির সঙ্গে খেলব না। খেলব মাঠে। এখানে দুটি দল একই লক্ষ্য নিয়ে নামবে। দুটি দলের সামনেই জার্সিতে তৃতীয় তারাটা যোগ করার সুযোগ।’

আকাশি-সাদাদের কোচ লিওনেল স্কালোনির অবশ্য চোট জাতীয় তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। এছাড়া কার্ড সমস্যাও তারা গেল ম্যাচে কাটিয়ে উঠেছে। যতই ভাইরাস হানা দিক, এই ফ্রান্সকে রুখতে হলে স্কালোনিকেও দেখাতে হবে ক্যারিশমা। আলোচনায় আছে এই ম্যাচে ৫-৩-২ ফরম্যাটে শুরু করবেন স্কালোনি। তবে এই আসরে এবারই প্রথম কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মোকাবিলা করতে যাচ্ছে তার দল। তাই আগের পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে এই ফাইনালকে মেলানোর সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষের শিবিরও হীরে-যহরতে ভরা। তাই কোচকে নিতে হবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে দলের ওপর স্কালোনির পূর্ণ আস্থা আছে। তার চোখে ফুটবলাররা প্রত্যেকেই সাফল্য পেতে জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত ‘এই দলটা এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। প্রত্যেকেই নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দিতে প্রস্তুত। এরকম একটা জায়গায় দলকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। এখন আমাদের সামনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দরজাটা খোলা। এই পথটা আমরাই তৈরি করে এখানে এসেছি। আশা করছি এই দরজা টপকে আমরাই সেরা হব।’

গত বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৪-৩ গোলে হেরে দ্বিতীয় পর্ব থেকে মেসিদের বিদায় নিতে হয়েছিল। সেই ম্যাচে এমবাপ্পে করেছিলেন জোড়া গোল। আজ অবশ্য তাকে নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই স্কালোনির। তার চোখে এটা মেসি-এমবাপ্পের চেয়ে বড় আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ম্যাচ, ‘এখানে আমরা একটি দলের সঙ্গে লড়াই করব। একজন ব্যক্তির সঙ্গে নয়। এই দলে আরও অনেক খেলোয়াড় আছে, যারা ওকে বল বানিয়ে দেয়। কিংবা ওর চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। তাই সবাইকে নিয়েই আমাদের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।’

আজ মেসিরা মাঠে যাবে তাদের ট্রেডমার্ক আকাশি-সাদা হোম জার্সি পরে। আগের পাঁচটি ফাইনালের তিনটি তারা খেলেছে নীল অ্যাওয়ে জার্সি পরে। তিনটিতেই হেরেছিল তারা। ১৯৭৮ ও ১৯৮৬তে হোম জার্সিতেই দু’বার বিশ্বসেরা হয় দলটি। আজ তাই পয়া জার্সিতেই দেখা যাবে তাদের। ফ্রান্সের গায়ে থাকবে সৌভাগ্যের নীল রঙা জার্সি। যে জার্সিতে তারা ১৯৯৮ ও ২০১৮তে বিশ্বকাপ জিতেছিল। এটি তাদের চতুর্থ ফাইনাল। ২০০৬-এ একবারই তাদের ফাইনাল থেকে শূন্য হাতে বিদায় নিতে হয়। আজ তাদের সামনে আছে পেলের ব্রাজিলকে ছুঁয়ে ফেলার সুযোগ। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পরপর তারা বিশ্বসেরা হয়েছিল। এই রেকর্ড এতদিন আর কেউ ভাঙতে পারেনি। ফ্রান্সের আছে সেই সুযোগ।

তবে কোটি ভক্তের প্রত্যাশা আজ রাতটা হোক শুধুই মেসির। দোহা বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের। ৮৮ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন লুইসাল স্টেডিয়ামের বেশিরভাগই আজ থাকবে তাদের দখলে। প্রিয় সমর্থকদের সামনে মেসির বিদায়টা হোক রাজসিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত