ব্যাংক খাতের সংকট কভিড বা যুদ্ধের জন্য নয়

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৩৮ এএম

দেশের বিদ্যমান ব্যাংক-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ব্রিটিশরাও এত টাকা লুট করেনি, যত টাকা বর্তমানে ব্যাংকগুলো থেকে লুট হয়েছে। একটা গোষ্ঠী আস্তে আস্তে ব্যাংক গিলে খাচ্ছে। এ ছাড়া কভিড বা ইউরোপে যুদ্ধের কারণে ব্যাংক খাতে সংকট দেখা দেয়নি। এই খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। দেশে এ অর্থনীতির সংকটে নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ নেই। গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘সংকটে অর্থনীতি : কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে?’ শীর্ষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কভিড কিংবা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে নয়। এ খাত দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতার মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, মূলত দুর্বল সুশাসন ও সংস্কারের অভাবে এই খাত ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এর যদি উন্নতি না হয় তাহলে ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ঘাটতি রয়েই যাবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। এই নম্বর সবার মুখস্থ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাস্তবে যেটা দেখানো হয়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি। এটা অর্থনীতিবিদরা এবং আইএমএফ বলছে। এর ভেতরে যদি আরও বেশ কিছু আনা হয়, ঋণের পরিমাণটা বেশি হবে। স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট, লোন যেগুলো রয়েছে কোর্ট ইনজাকশনের মধ্যে এগুলো হিসাব দেওয়া হলে সেটা দ্বিগুণের বেশি হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক, আইন ও তথ্যগত দুর্বলতার কারণে ব্যাংক খাতে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে এখন চারজনের একটি পরিবারে মাছ-মাংসসহ খেলে মাসে খরচ হয় ২৩ হাজার ৬৭৬ টাকা। আর যদি একই ধরনের পরিবার মাছ-মাংস না খেয়ে শুধু নিরামিষ খায় তবে খরচ হয় ৯ হাজার ৫৫৭ টাকা।

সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ হিসাব ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমাদের সিভিল সোসাইটিতে ভয়ংকর মিসম্যাচ আছে। এটা সিরিয়াস সমস্যা। আপনারা অর্থনীতিতে কালো মেঘ দেখছেন, আমি দেখছি সিলভার রেখা।’

মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ঘাটতি আছে স্বীকার করছি। কভিডের মধ্যেও আমাদের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল। আমাদের অনেক জায়গায় আমরা ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করছি। এখন আর ১০ বছরে জনশুমারি হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অর্থনীতি চালাচ্ছি জেনেশুনেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান হাবিব মনসুর, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী বিশেষ আলোচক হিসেবে সংলাপে অংশ নেন।

সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতির মূল সংকটের একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বলতা। তারা বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে, অথচ ভারতের মতো রাষ্ট্রে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষিত হয়। এটা তো বাজেট না যে বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতে মূলত স্বচ্ছতার অভাব। ডেটা পাওয়া কোনো ব্যাপারই না। কয়েক বছর আগে ব্যাংক খাত সংস্কার করা হলো, কিন্তু দেখা গেল এটা উল্টো রথে গেল। তাদের জিজ্ঞেস করেন কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কীভাবে বাড়ল, তারা কোথায় এ বিনিয়োগ বাড়াল।

ড. আহসান হাবিব মনসুর বলেন, ‘ঝড়ের আগে পরিবেশ খুব ঠান্ডা থাকে। কিন্তু যখন প্রলয় এসে যায় করার কিছু থাকে না। দেশের অর্থনীতিরও একই অবস্থা। ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও ক্রমান্বয়ে কমছে। কিন্তু ভারতের মতো রাষ্ট্রে তা ১৯ থেকে ২০ শতাংশ। তাদের ক্যাপাসিটি টু অ্যাবজর্ব আর আমাদের ক্যাপাসিটি টু অ্যাবজর্ব কি এক হলো? অনেকে বলেন, জানুয়ারির মধ্যে ডলার সংকট কেটে যাবে, আমি বলি আগামী ছয় মাসেও ডলার সংকট কাটবে না। আরও বেশি সময় লাগতে পারে। ব্যাংকে সংকট এত প্রকট যে অল্প কয়েক দিনে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, এটা তো তলাবিহীন বাস্কেটের মতো।’ তিনি বলেন, রিজার্ভের হিসাবে কোনো আন্তর্জাতিক নিয়ম নেই। রেগুলেটরি সংস্থা কিছুই করব-টাইপের ভাব নিয়ে বসে আছে। সরকারকে ধন্যবাদ, আইএমএফের সঙ্গে খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে।’

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির সংকটে মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে দেখলে হবে না। দুটোকে আলাদা করে দেখুন। দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে দুটো কারণেএকটি আন্তর্জাতিক, আরেকটি অভ্যন্তরীণ বাজারের অনিয়ম। তিনি বলেন, সাপ্লাই বাড়লে দেশের মূল্যস্ফীতি কমতে সাহায্য করবে। মিনিমাম ওয়েজ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির সমাধান সম্ভব নয়। আইএমএফের কাছ থেকে সঠিক পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত কী জানি না, পরামর্শগুলো সবাই জানি। কারণ তাদের পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হলে আইএমএফ অর্থ ছাড় করে না।’

এ সময় অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, সাবসিডি যদি দিতেই হয় পুঁজিবাজারে দেন। গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানির বিরুদ্ধে সরকার এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিল, ফলে তার দাম এত কমে গেছে যে বিনিয়োগকারীদের মাথায় হাত। আর বিএসইসির ফ্লোর প্রাইস দিয়ে তো শেয়ারবাজার চালানো যায় না।

সংসদ সদস্য শামীম পাটোয়ারী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি নীতিহীন অর্থনীতির দিকে যাচ্ছে। আমরা সংসদে ভুলগুলো উত্থাপন করলে তা উত্থাপন পর্যন্তই থাকে। বর্তমানে যেভাবে ব্যাংক লুট চলছে, ব্রিটিশরাও এভাবে এ দেশ লুট করেনি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ডিনার করে ফুর্তি করা নয়। প্রচুর মানুষ কীভাবে বিদেশে বাড়ি বানিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করুন। আমরা দেশে দক্ষ লোক না বানিয়ে অদক্ষ ভিখারি বানিয়ে ফেলেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত