মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাধনার স্বরূপ

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:২৬ পিএম

রবীন্দ্রনাথ তার ‘কালান্তর’ গ্রন্থের একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘ধর্ম যদি অন্তরের জিনিস না হইয়া শাস্ত্রমত ও বাহ্য আচারকেই মুখ্য করিয়া তোলে, তবে সেই ধর্ম যত বড়ো অশান্তির কারণ হয়, এমন আর-কিছুই না।’ কথাটির নিহিত তাৎপর্য আজ আমরা দুনিয়াজুড়ে উপলব্ধি করতে পারছি। রবীন্দ্রনাথের মতো অতটা হয়তো তীব্রভাবে নয়, কিন্তু তার পরও বলি, সেদিনে পিছিয়ে-পড়া মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে একজনকে অন্তত পাই, যার লেখালেখির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ-কথিত কঠিন সত্যিটাই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই লেখক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী। আজ যাকে আমরা বলতে গেলে ভুলেই গিয়েছি। কেন ভুলে গিয়েছি সেইটা বুঝতে পারা কঠিন হবে না, যদি আমরা তার চিন্তার চৌহদ্দিটা খানিকটা হলেও পরিমাপ করতে পারি।

২. মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ ‘ধর্মের কাহিনী’ প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। সেই গ্রন্থের ‘পূর্বাভাস’-এ তিনি বলেছিলেন, ‘মনে হইয়াছে সৎ হওয়াই বুঝি মানব-জীবনের প্রধান কাজ। বাল্যকালের সেই অস্পষ্ট ধারণা বয়সের সহিত ক্রমে স্পষ্ট হইয়াছে।’ ধর্মের সঙ্গে সততার ধারণাকে যুক্ত করে এক দিন তার মনে হয়েছিল, ‘ধর্মই বুঝি মানুষের সবেধন এক নীলমণিসাত রাজার ধন এক মানিক।’ শুধুই এইটুকুই নয়, তার এ-ও মনে হতো, ‘ধর্মই বুঝি মানুষের জীবনের সাধ, সাধের সুখ, সুখের স্বপ্ন। সকলেই বুঝি কেবল ধর্ম পথেরই পথিক।’ কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে বাস্তব জগতের দিকে তাকিয়ে তিনি ঠিক এর বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পেয়েছেন। আর স্বপ্নভঙ্গের সেই বেদনা নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ ভীত স্তম্ভিত হইয়া দেখিতেছি, ধর্ম কোথায়ও নাই। বৈশাখ মাসের বাতাসে শুষ্ক পাতা যেমন করিয়া উড়িয়া যায়, আজ জনসমাজ হইতে ধর্মও তেমনিভাবে উড়িয়া গিয়াছে।’ শুধু এইটুকু যোগ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; ক্ষুব্ধতায় নিজের বেদনাবোধকে এসবের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছেন, ‘সত্য, সাধুতা, ন্যায়, দয়া ও পরোপকার আজ স্বপ্নের কাহিনী।’

এই অংশটুকু পাঠ করতে গিয়ে আমাদের কারও-কারও মনে পড়বে কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। এয়াকুব আলীর এই প্রবন্ধটি প্রকাশের অনেকগুলো বছর পরে আমাদের সাহিত্যের ‘নির্জনতম’ কবি বলবেন তার চৈতন্য আর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এসব নিষ্ঠুর অথচ বাস্তব একপর্যায়ের কথা, যা আমাদের সমাজ জীবনের সঙ্গে তো বটেই, ব্যক্তিগত জীবনেও মিলেমিশে একাকার হয়ে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে জখম করে রাখে প্রতিনিয়ত। কী বলেছিলেন জীবনানন্দ? তিনি লিখেছিলেন‘চারিদিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড়অলীক প্রয়াণ।/ মন্বন্তর শেষ হলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল;/ মানুষের লালসার শেষ নেই/ উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু ক্ষণ/ অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ/ অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ/ নেই।’

৩. দয়া-দান-অতিথি-সেবা নিত্যদিনের কর্মযজ্ঞ এবং সেই সঙ্গে মানুষের আচার-ব্যবহারের কথা বলতে গিয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরী নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝি-বা লিখেছিলেন, ‘দেখিয়াছি মফঃস্বলের কোন লোক কলিকাতায় গিয়া জুয়াচোরের হাতে পড়িয়া সর্বস্ব খোয়াইলে তাহার মরণ নিশ্চিত।’ কেন এই কথা? প্রাবন্ধিক জানিয়েছেন, ‘তিন দিন ধরিয়া কলিকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইলেও কেহ তাহাকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করে না।’ শুধু তা-ই নয়; এয়াকুব আলী আরও লিখেছেন, ‘বড় বড় ধপ্ধপে দালানে উঁকি দেওয়ারও তাহার কোন অধিকার নাই।’ অবশেষে তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্মের এক অতি প্রিয় অনুষ্ঠান (“অতিথি-সেবা”) এইরূপে আমাদের ধর্মের সংসারে শুকাইয়া মরিতেছেভ্রুক্ষেপ করিবার কেহ নাই।’

বিচিত্রভাবে চারপাশের বিভিন্ন দিকের প্রতি দৃষ্টিপাত করে গ্রন্থের উপসংহারে এসে লেখক বলেছেন, ‘এইরূপে মানবসমাজের যেদিকে ও যে স্তরেই দৃষ্টিপাত করি, সেইদিকে কেবল অধর্মেরই পূর্ণ প্রসার দেখিতে পাই’ আর তারই পরিণামে লেখকের ভাষায়, ‘ধর্মকে কোথায়ও খুঁজিয়া পাই না।’ ধর্মকে খুঁজে পাননি তিনি, শুধু তা-ই নয়, প্রতিদিনকার জীবনযাপনের যে-আনুষঙ্গিক আচরণবিধি, যার মধ্যে একটি সুসংগত জীবনবোধের পরিচয় পাই আমরা, সেই পরার্থপরতা, পরোপকার, জীবসেবা, একটু দয়া, মমত্ববোধ, প্রাণের সহানুভূতি পর্যন্ত লেখক কোথায়ও খুঁজে পাননি। তার পরিবর্তে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, ‘ধর্মবোধ এমনিভাবে লুপ্ত হইয়াছে যে, যে-লোক একটুকু সরল ব্যবহার ও সরল বিশ্বাসী হয়, পাঁচ পয়সা দিব বলিয়া দুই পয়সা দিতে না জানে, বিবিধ কলাকৌশলে...পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গিয়া’ খাইতে না জানে, সেই লোক এই সমাজে ‘নিতান্ত অকর্মণ্য, বোকাচন্ডী বলিয়া স্থির হয়।’

৪. এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেও বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু মনুষ্যধর্মকে তার থেকে বিযুক্ত করতে চাননি কখনো। এটি চাননি বলেই মানুষ সম্পর্কে তিনি বিশ্বাস করতেন, সে শুধুই জড়পদার্থ নয়, সে চৈতন্যস্বরূপ। আর ‘চৈতন্য মানেই যে আধ্যাত্মিকতা’ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও, ভারতীয় দর্শনের এই তত্ত্বটিকে তিনি একেবারেই অস্বীকার করেননি। মানুষকে উদ্দেশ করে সে-কারণেই তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি গরু নও, বানর নও, ব্যাঘ্র নওতুমি মানুষ। এই জড়দেহ তাহার ক্ষুদ্র সীমার পরপারে, হে পুণ্য ও চৈতন্যস্বরূপ! তোমার তরে স্বর্গের ও বিভু মিলনের অপার শান্তি, তৃপ্তি ও আনন্দ সঞ্চিত রহিয়াছে। কেন ভুলিবে, কেন ডুবিবে, কেন মরিবে?’ প্রতিটি মানুষকে এয়াকুব আলী একটা মর্যাদাবান সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সময়ের বিচারে তিনি যে একজন অগ্রসর মানুষ ছিলেন, সেটি প্রমাণিত হয় তার চিন্তার অভিব্যক্তিতে, যা কি না এইসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ অবাক হতে হয় এ কারণেই যে মানুষটি জন্মেছিলেন ফরিদপুরের পাংশা থানার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে, ১৮৮৮ সালে (১৮ই কার্তিক, ১২৯৫ বঙ্গাব্দ)। চোখের অসুখে ভুগতেন বলে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পড়াশোনাটাও শেষ করতে পারেননি।

৫. এয়াকুব আলী চৌধুরীর জীবন সম্পর্কে জানাতে গিয়ে প্রাবন্ধিক-গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম লিখেছেন, মাত্র ‘৪৭-৪৮ বৎসর বয়সে তিনি ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। জীবনের শেষ কয়েকটি বৎসর তাকে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় গ্রামের বাড়িতে দিন কাটাতে হয়।’ তিনি নিজে একজন আত্মসচেতন ও প্রতিভাধর মানুষ ছিলেন বলেই, সমাজের ইসলাম ধর্মানুসারী মানুষকে এইভাবে বলতে পেরেছিলেন, ‘প্রতিভা তোমার মনুষ্যত্বের স্পর্ধা, জ্ঞান ও চৈতন্য তোমার মানবতার গরিমা! কেন ভুলিবে, কেন ছোট হইবে, কেন পাপ করিবে?’ আমরা বুঝতে পারি নিজের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে তিনি কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি, দেখতেও চাননি। সেটিকে গোটা মানবসমাজের স্পর্ধা ও গরিমার সঙ্গে সে-কারণেই যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রচলিত অর্থে ধার্মিক ছিলেন ঠিকই, আর তার ধর্মচর্চার মধ্যে আমরা সক্রিয়তার মনোভাব নানাভাবে দেখতে পাই। যে-সক্রিয়তা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যেও বলিষ্ঠভাবে ছিল বলে মনে করি। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘সম্প্রতি সুশিক্ষিত বাঙ্গালিদিগের মধ্যে হিন্দুধর্মের আলোচনা দেখা যাইতেছে। অনেকেই মনে করেন যে, আমরা হিন্দুধর্মের প্রতি ভক্তিমান হইতেছি। যদি এ কথা সত্য হয় তবে আহ্লাদের বিষয় বটে।’ কেন আহ্লাদের বিষয়, সেটি খোলাসা করতে গিয়ে ভাববাদী বঙ্কিম তার দৃঢ় বিশ্বাসের কথা এইভাবে আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘জাতীয় ধর্মে পুনর্জীবন ব্যতীত ভারতবর্ষের মঙ্গল নাই।’ কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি এটিও বলতে দ্বিধা করেননি, ‘হিন্দু হাঁচি পড়িলে পা বাড়ায় না, টিকটিক ডাকিলে “সত্য সত্য” বলে, হাই উঠিলে তুড়ি দেয়।’ এগুলোকে তিনি ধর্ম বা ধর্মীয় আচার হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তার মতে, ‘এ সকল হিন্দুধর্ম নহে। মূর্খের আচার মাত্র। যদি ইহা হিন্দুধর্ম হয়, তবে আমরা মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি যে, আমরা হিন্দুধর্মের পুনর্জ্জীবন চাহি না।’ অন্যদিকে তার রচিত ‘ধর্মের কাহিনী’ গ্রন্থটি সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বলেছিলেন, ‘এই পুস্তক সংসারে সর্বজনীন পাপ-স্রোতের বিরুদ্ধে ধর্মের এক স্বাভাবিক আর্তনাদ।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘মানুষকে সংসারে ধর্মের নামে ধর্মকে ফাঁকি দিয়া নিত্যনিয়ত অধর্ম করিতে দেখিয়া অন্তরে যে দারুণ বেদনা অনুভব করিয়াছি, এই ক্ষুদ্র পুস্তক তাহারই প্রকাশ মাত্র।’ এয়াকুব আলীর এই কথাগুলি পাঠ করতে গিয়ে ধর্ম প্রসঙ্গে কার্ল মার্কসের কয়েকটি কথা মনে না-পড়ে পারে না। এটিও তার চিন্তার অগ্রসরতারতাই আরেকটি নমুনা।

৬. অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম তার প্রবন্ধে এয়াকুব আলীর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে আমাদের আরও কিছু তথ্য জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ছিল তার জীবন। পক্ষান্তরে তার জীবনও অনেক দুঃখ-কষ্টে পরিকীর্ণ। সাংবাদিক হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল এবং এ-সময়ই তিনি বিভিন্ন সাময়িকপত্র ও সাহিত্য-সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।’ এই তথ্য জেনে আমরা বিমর্ষ বোধ করি যে, ‘দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হয় বলে তার গ্রন্থ-সংখ্যা খুব বেশি নয়।’ শ্রদ্ধেয় আবদুল কাইয়ুম ঠিকই বলেছেন। এয়াকুব আলীর প্রকাশিত গ্রন্থ-সংখ্যা মাত্র চারটি। ব্যঞ্জনাময় গদ্যে রচিত ‘ধর্মের কাহিনী’ নিয়ে আমরা সামান্য আলোচনা করেছি। এ ছাড়া রয়েছে‘নূরনবী’ (১৯১৮), ‘শান্তিধারা’ (১৯১৯) ও ‘মানব-মুকুট’ (১৯২২)। তার অপ্রকাশিত রচনার একটি সংকলন ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

৭. রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে, ব্যক্তি মানুষের ‘সর্বজনীন মনকে উত্তরোত্তর বিশুদ্ধ করে উপলব্ধি করাতেই মানুষের অভিব্যক্তির উৎকর্ষ।’ অভিব্যক্তির সেই উৎকর্ষের অনেকখানি আমরা মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর রচনায়, চিন্তায়, তার অটল সাধনার মধ্যে দেখতে পাই। লেখাই বাহুল্য যে, সেই সাধনারই প্রকাশিত মর্ম-মাধুরী হচ্ছে তার রচনাকর্ম। ১৯৪০ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই সাধক-লেখক প্রয়াত হন। আমরা তার স্মৃতির গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত