সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলন। নির্বাচিত কমিটির নেতাদের ওপর দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ থাকবে অন্যান্য বারের চেয়ে বেশি। এই নেতৃত্বকেই বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা করতে হবে। বিজয়ী হতে হবে সংসদ নির্বাচনে।
আগামী ২৪ ডিসেম্বর হবে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এবার নিয়ে পঞ্চমবার সম্মেলন করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের ঐক্য সুদৃঢ় করার জন্য দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে নতুন নেতৃত্বকে। যে কারণে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ নেতাদের কবল থেকে আওয়ামী লীগকে বের করে এনে নিবেদিতদের হাতেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার কঠিন কাজটিও করতে হবে। সুসময়ে আদর্শহীন গোষ্ঠীর দাপটে দলের পুরনো ও ত্যাগী নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ দূর করতে হবে। দলের ইস্পাতকঠিন ঐক্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে নতুন কমিটিকে। সে কারণে এবারের সম্মেলন যেমন গুরুত্বের তেমনি চ্যালেঞ্জেরও।
অন্য একটি সূত্রের দাবি, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে প্রস্তুত করে তুলতে চান দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রহণযোগ্য ও ভাবমূর্তি সম্পন্ন, কর্মীদের কাছে প্রিয়-বিশ্বস্ত নেতৃত্ব উপহার দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই আওয়ামী লীগের। তাই যোগ্য-দক্ষ, কর্মীবান্ধব-সক্রিয় নেতারাই দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রাধান্য পাবেন। দলে কাজে পুরোপুরি সময় দিতে পারবেন এমন নেতারাই আওয়ামী লীগের চালিকা ৮১ জনের একজন হওয়ার সুযোগ পাবেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দলীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন। তিনি ছাড়াও সারা বছর নেতাকর্মীবেষ্টিত থেকেছেন ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দুই মেয়াদে এই পদে আছেন। নিয়মিত দলীয় কার্যালয়মুখী এই নেতা পরিবেশ নিয়ে প্রশংসনীয় অনেক কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসার কারণে বিভিন্ন পেশায় থাকা কর্মকর্তারা এই নেতার বন্ধু সার্কেলে রয়েছেন। তার অনুসারীর সংখ্যাও কম নয়, যারা জেলা-উপজেলা বা থানা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব বিষয় আমলে নিলে পদোন্নতির সুযোগ থাকছে তার। ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন দুর্গত অসহায় মানুষের পাশে। তিনিও পদোন্নতির আশা করছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এস এম কামাল হোসেন ও আফজাল হোসেন সাংগঠনিক জেলাগুলো সফর করে নেতাকর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা জেনেছেন। সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো ঢাকায় ডেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিরুদ্ধে অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সে কারণে সাংগঠনিক সম্পাদকদের দুই-চারজনের বাদ পড়া বিষয়টি যেমন দলে আলোচিত হচ্ছে, তেমনি পদোন্নতির সুযোগও আছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তার ব্যাপারে দলের নেতাকর্মীরা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী রাজনীতিতে সার্বক্ষণিক থাকার চেষ্টা করেন। দলের নেতাকর্মীদের অভাব-অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এই নেতা। বাসায়ও নেতাকর্মীদের সময় দেন। দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া ও উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান দাপ্তরিক কাজে সক্রিয় থেকেছেন সব সময়ই। তবে ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল মোস্তফা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ এইচ এন আশিকুর রহমানের মতো নেতারা সম্পাদকীয় পদে থাকলেও তাদের সাংগঠনিক কাজ কর্মে তেমন দেখা যায়নি। তবে আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ বিভিন্ন সময়ে দেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছেন, দলের ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুনুর রশীদ ক্রীড়ার মানোন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। তবে তার ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুর সবুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এই সরকারের সময়ে তা তুলে ধরার কাজে সম্পৃক্ত থেকেছেন। প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকায় তার বিভাগে উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেশ সক্রিয় থেকেছেন। আইন সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু। কিন্তু দলের পক্ষে আইনি কার্যক্রম নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রিয়াজুল কবির কাওছার সর্বত্র সরব ছিলেন। এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো নেতাদেরও পদোন্নতি দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে এমন আলোচনা আছে আওয়ামী লীগে। কেন্দ্রীয় পদে থাকা যেসব নেতা সক্রিয় থেকেছেন, তাদের পদোন্নতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পাদকীয় পদে দায়িত্ব পালন করা একাধিক নেতার ওপর ভীষণ খুশি দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। তাদের এবার পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ অনুযায়ী দলকে যারা সার্ভিস দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সেসব নেতাকে পুরস্কৃত করবেন। দলকে যারা সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের ব্যাপারেও নিশ্চয়ই ভাববেন তিনি।’
২০ সদস্যের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যদের মধ্যে মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফরউল্যাহ, ফারুক খান, ড. আবদুর রাজ্জাক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান বাদে অন্যদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে দেখা যায়নি গত তিন বছর। দলীয় সূত্র জানায়, সভাপতিমন্ডলীর বেশ কয়েকজন সদস্যকে এবার উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সভাপতিমন্ডলীর শূন্য পদ পূরণ করা হবে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা দক্ষ নেতাদের দিয়ে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান কমিটির কমপক্ষে দুই ডজন নেতার বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পদ পেয়ে ভাগ্য বদলেছেন, বলয় তৈরি করেছেন ও দলের চেয়ে ব্যক্তির রজনীতি শক্তিশালী করেছেন এবং সুযোগ পেয়েও যারা নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন, এবারের বাদের তালিকায় থাকছেন তারা। যারা কাজ করেছেন, দক্ষতা দেখিয়েছেন, তারা টিকে যাবেন। কেউ পাবেন পদোন্নতি।
সূত্রগুলো জানায়, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ২১তম জাতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়া নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আবারও ফিরতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালে দায়িত্ব পালনে বেশ দক্ষতার পরিচয় রেখেছিলেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে সারা দেশে নেতাকর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নির্বাচনের আগে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বলেই তার ফেরার কথা বলছেন অনেকেই।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতার পদে থেকে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানো নিষ্ক্রিয়রা সম্মেলনের তারিখ ঠিক হওয়ার পর পদ ধরে রাখতে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন। দলীয় কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকছেন। নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে থাকা অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এখন কর্মীদের সময় দিচ্ছেন। পদে টিকে থাকতে তদবিরে ছোটাছুটি করছেন এদিক-ওদিক।
জানা গেছে, ৫০-৬০ বছর বয়সের মধ্যে দক্ষ-যোগ্য পরীক্ষিত নেতা বেছে নেবেন দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা। কারণ বর্তমান বিশে^র রাজনীতি তারুণ্যনির্ভর হয়ে গেছে। তাই তরুণ নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ পরিচালিত করার চিন্তা রয়েছে শেখ হাসিনার। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচিতি-সম্পর্ক থাকা কর্মীদের পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ, আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ-সম্পর্ক ও পরিচিতি থাকা নেতাদের কমিটিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে তার ঘনিষ্ঠ মহলে তার এমন আগ্রহের কথা জানান। নির্বাচন ও আন্দোলন মোকাবিলায় ব্যক্তিগত যোগাযোগ-সম্পর্ক-পরিচিতি থাকা নেতারা দলের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারবেন মনে করেন তিনি। সে হিসেবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ুয়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের এবার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, বাহাদুর বেপারী, মাহমুদ হাসান রিপন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুজ্জামান শিখর, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ নাসির, প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমান্ত তালুকদার, সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ সাকিব বাদশা, নুরুল আলম পাঠান মিলন, দপ্তর সম্পাদক কাজী নাছিম আল মোমিন রূপক।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব সময় নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হয়। যাতে নবীনের উদ্যম আর প্রবীণের অভিজ্ঞতার সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে পারে আওয়ামী লীগ।’ তিনি বলেন, প্রতিটি সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি নারীদের ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এবারও সেটা হবে।
এবারের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের সংখ্যা বাড়ছে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। গত সম্মেলনে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ১৯ নারী ছিলেন। এর মধ্যে সভাপতিম-লীর সদস্য সাজেদা চৌধুরী ও সাহারা খাতুন মারা গেছেন। সম্প্রতি শূন্য থাকা একটি পদে সিমিন হোসেন রিমিকে নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পর্যায়ে এখন ১৮ জন নারী আছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী থাকার কথা বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আগামী সম্মেলনে আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নতুন যাদের নিয়ে দলে আলোচনায় আছে তারা হলেন জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে সৈয়দ জাকিয়া নূর লিপি, তারানা হালিম, যুব মহিলা লীগের বিদায়ী সভাপতি নাজমা আক্তার ও বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল।
