প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ, অগ্রগতি ৮০ শতাংশের ওপরে। কিন্তু প্রকল্পের শেষপর্যায়ে এসে নতুন করে ৭৫ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মেয়াদও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণসহ আরও কয়েকটি খাত যোগ করে চিলাহাটি-ভারত সীমান্তের রেল সংযোগ প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
২০১৮ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটির প্রথম প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির সভায়, প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, অনুমোদিত প্রথম সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী এ প্রকল্পের নতুন প্যাকেজ ডব্লিউ-২ হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় একটি আইল্যান্ড প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্ম শেড, একটি ফুটওভার ব্রিজ, চারটি রেইজড প্ল্যাটফর্মসহ দুটি ওয়াশফিট লাইন, রানিং কর্মচারীদের জন্য ফাংশনাল ভবন, সীমান্তে গেট ও চেকপোস্ট নির্মাণ, চিলাহাটি স্টেশন ভবন ও ওয়াশফিটের আলোকায়ন এবং চিলাহাটি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন উন্নয়নকাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহিম গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখানে ভারতের যে ট্রেনগুলো রিসিভ করব সেগুলোর ক্যাপাসিটি বেশি। ভারত থেকে স্বাভাবিকভাবে ৪২টি ওয়াগন আসে। এখন এখানে ৫০টি ওয়াগন রিসিভ করা হবে। এ ৫০টি ওয়াগন রিসিভ করার জন্য লুপ লাইনের দৈর্ঘ্য বেশি লাগবে। সে জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘শুধু জমি অধিগ্রহণই নয়, আরও কিছু সুবিধাদি বাড়ানোর দরকার। নতুন বিল্ডিং, নতুন প্ল্যাটফর্মসহ সবকিছু মিলিয়ে বড় ধরনের কম্পোনেন্ট যোগ হয়েছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূলত প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।’
৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের চিলাহাটি থেকে ভারতের হলদিবাড়ী পর্যন্ত ৬ দশমিক ৭২৪ কিলোমিটার এ রেললাইন স্থাপনের কাজ করছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রেলপথ স্থাপন শেষ হলে প্রথম ধাপে চলাচল করবে পণ্যবাহী রেল। দ্বিতীয় ধাপে যাত্রীবাহী ট্রেন। যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) ও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত হয়ে কলকাতা শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করবে বলে রেলওয়ের সূত্রে জানা গেছে।
স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান যে, প্রথম সংশোষিত ডিপিপিতে প্রকল্পের নির্মাণকাজ দুটি প্যাকেজের আওতায় হচ্ছে। প্রকল্পের প্যাকেজ ডব্লিউডি-১-এর আওতায় ইতিমধ্যে অনেক কাজ শেষ হয়েছে। তবে ১ হাজার ৪০০ বর্গমিটার চিলাহাটি স্টেশন ভবন নির্মাণ, একটি বিদ্যমান প্ল্যাটফর্ম প্রশস্তকরণ ও উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বেশ কয়েকটি কাজ চলমান রয়েছে। তবে আরডিপিপি মোতাবেক ২ দশমকি ৮৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ বিলম্বিত হওয়ায় একটি অতিরিক্ত লুপ লাইন ও চারটি লুপ লাইনের সিএসএল বাড়ানোর কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্যাকেজ ডব্লিউডি-১ বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশ।
প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহিম সভায় উল্লেখ করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ট্র্যাক নির্মাণ, ব্রিজ, সিগন্যালিং, বৈদ্যুতিক কাজ বিল্ডিং ও অন্যান্য খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করলেও এডিপিতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা যায়নি। ফলে কাজের যথাযথ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, ইতিমধ্যে নতুন প্যাকেজ ডব্লিউডি-২-এর দরপত্র আহ্বান ও উন্মুক্তকরণ করা হয়েছে এবং এটি প্রক্রিয়াধীন। সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের প্যাকেজ ডব্লিউডি-২-এর বাস্তবায়ন মেয়াদ এক বছর। তিনি জানান, এখনো ২ দশমিক ৮৬ একর জমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হয়নি এবং ডব্লিউডি-২-এর ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি বিধায় প্রকল্পটির সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) বলেন, ইতিমধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রকল্পের জন্য ৪৫ কোটি টাকার উপযোজন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। সভায় পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিকে উপযোজন প্রস্তাবটি দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ রেলপথটি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৫ সালের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ইন্টার গভর্নমেন্টাল রেলওয়ে মিটিংয়ে চিলাহাটি ও হলদিবাড়ীর মধ্যে রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এবং চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প’ হাতে নেয় সরকার, যা ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২১-এর জানুয়ারি মেয়াদে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল চিলহাটি ও চিলহাটি বর্ডারের মধ্যে ৬ দশমিক ৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ মেইন লাইন ও ৪ কিলোমিটার ব্রডগেজ লুপলাইন নির্মাণ করা। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের মোংলা পোর্ট হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সহজ হবে।
