দেশের সর্বশেষ কৃষিশুমারি হয়েছে ২০১৯ সালে, যার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২৭ ডিসেম্বর। এই শুমারি থেকে জানা যায়, দেশের কৃষি পরিবারের পরিচালনাধীন মোট জমির পরিমাণ ২ কোটি ২৯ লাখ ৪৫ হাজার একর, যা এর আগে ২০০৮ সালের শুমারিতে ছিল ২ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার একর। অর্থাৎ গত ১১ বছরে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার একর। বাংলাদেশে জনসংখ্যার অনুপাতে কৃষিজমির পরিমাণ খুবই সীমিত। তারপর এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা, বস্ত্র-বাসস্থান, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রে কৃষির অবদান অপরিসীম। কৃষি ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথ ভাবা যায় না। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামাল জোগানেও কৃষির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যেহেতু মাটিকে কেন্দ্র করেই কৃষি, তাই কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে কৃষিজমি সুরক্ষা এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদনের জন্য আবাদি জমি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘দেশ ইতিমধ্যে অপকিল্পিত শিল্পায়নের জন্য প্রচুর ভালো মানের ও উর্বর জমি হারিয়েছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং আবাসনের কারণে হারিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ উর্বর জমি। কারণ, পূর্ববর্তী সরকারগুলো এতে মনোযোগ দেয়নি। আমরা এ ধরনের জমি হারাতে চাই না।’ গত ১৯ ডিসেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুরের ২৫তম বিশ^বিদ্যালয় দিবস এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার ভার্চুয়াল ভাষণে গণভবন থেকে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো আবাদি জমি, যা সারা বছর তিন ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়, শিল্পায়নের জন্য তা ব্যবহার করা যাবে না। কেউ যদি এ ধরনের জমিতে শিল্প স্থাপন করে, তবে তারা সরকার থেকে কোনো সুবিধা পাবে না এবং এই লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ খুবই ছোট একটি দেশ কিন্তু মানুষের সংখ্যা বিপুল। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য উৎপাদন নিরাপদ করতে বিদ্যমান আবাদি জমি রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণালব্ধ মেধাস্বত্ব যাতে সঠিক উপায়ে সংরক্ষিত হয়, তা নিশ্চিত করা এবং বর্তমান সরকারের প্রতিষ্ঠিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ কৃষি উৎপাদন কর্মীও তৈরি করতে হবে।
কৃষিজমি সুরক্ষায় ২০০৯ সালে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’-এর খসড়া প্রণয়ন শেষে মতামতের জন্য ২০১৬ সালে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ভূমি মন্ত্রণালয়। অতীব দুঃখের বিষয় যে, সেই খসড়া এখনো আলোর মুখ দেখেনি। একই লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বেসরকারি বিল আনা হলেও তা সংসদীয় কমিটিতে পড়ে আছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে দেশের মোট জমির ৬৫ শতাংশের বেশি ছিল কৃষিজমি। চার দশকের ব্যবধানে ২০১৯ সালে তা নেমে ৫৯ শতাংশে এসেছে। বর্তমানে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি একর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে বলে একাধিক বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে। বছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন ৫৫০ একরের বেশি কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এতে বছরে ৮২ হাজার হেক্টর জমি কমছে, যা মোট জমির এক শতাংশ। এ ছাড়া বছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি। নির্মাণকাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি। গত ৩৮ বছরে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে।
এ অবস্থায় কৃষিজমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত চাওয়া হয়। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রওশন আরা মান্নানের সংসদে উত্থাপিত ‘কৃষিজমি (যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ) বিল-২০২২’ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনাকালে ওই খসড়া আইনের বিষয়টি উঠে আসে। এ সময় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সর্বশেষ গত নভেম্বরে খসড়াটি যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হলেও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, কারখানার বর্জ্য ও বিষাক্ত পানিতে নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের অন্তত ১০টি মৌজার ১ হাজার বিঘার বেশি জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। ওই এলাকার কৃষকরা গত ৫ বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। জমিগুলোর আশপাশে ৮ থেকে ১০টি কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে পাকিজা গ্রুপের কারখানা সবচেয়ে বড়। এসব কারখানায় সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পোশাক ও সুতায় মাড় দেওয়ার কাজ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ফসলি জমিতে বিষাক্ত রঙের পানি ও অ্যাসিড থাকায় কোনো আবাদ করা যাচ্ছে না। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জেই শুধু নয়, ময়মনসিংহের ভালুকা, শ্রীপুর, গাজীপুরেও ঘটছে একই ধরনের ঘটনা। ত্রিশাল ও ভালুকা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা ক্ষীরু নদীতে এক সময় সারা বছর পানি থাকত। মালবোঝাই পাল তোলা নৌকা চলত। মাঝির মুখে শোনা যেত সুমধুর ভাটিয়ালি গান। সুস্বাদু মাছ থাকত, মিল কারখানার তরল বর্জ্য ফেলার কারণে সেই খরস্রোতা ক্ষীরু নদীর অপমৃত্যু ঘটেছে। মাছ তো দূরের কথা, নদীতে ডুব দেওয়ার মতো পানি নেই। যেটুকু আছে, তা তরল বর্জ্য মিশ্রিত ব্যবহার অনুপযোগী রঙিন পানি। বর্ষাকালে এ নদীর তরল বর্জ্য মিশ্রিত পানি আশপাশের কৃষিজমিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে উর্বরতা। মারা যাচ্ছে মাটিতে বসবাসকারী- প্রকৃতির লাঙল; কেঁচোসহ উপকারী ক্ষুদ্র জীবাণু।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক ছাড়া দেশের যেখানে সেখানে কোনো শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যাবে না এবং প্রতিটি শিল্প কারখানায় সার্বক্ষণিক ইটিপি ব্যবহার করতে হবে বাধ্যতামূলক, যাতে কারখানার তরল বর্জ্যে প্রাকৃতিক জলাশয় ও কৃষিজমি বিনষ্ট না হয়। প্রয়োজনে সরকারিভাবে স্থাপিত কেন্দ্রীয় পরিশোধন কারাখানার মাধ্যমে প্রতিটি শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষিজমি নষ্ট করে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করা যাবে না। এসব কাজে অনুর্বর উঁচু জমি ব্যবহার করা যেতে পারে। কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির মতো ক্ষতিকর কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ইটের পরিবর্তে সিমেন্টের ব্লক ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষিজমির মাটি কেটে কোনো রাস্তাঘাটও বানানো ঠিক হবে না। রাস্তাঘাটের মাটির জন্য নদী খনন করে সেই মাটি ব্যবহার করতে হবে। এতে একদিকে নদীর নাব্য বাড়বে, অন্যদিকে রক্ষা পাবে মূল্যবান কৃষিজমি। সেই সঙ্গে নদীভাঙন রোধে গ্রহণ করতে হবে সময় মতো সর্বাধুনিক টেকসই প্রযুক্তি। অন্যথায় দেশের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
