ঘুম হরণের শীত শহরে

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:৪৫ এএম

রাজধানীর পান্থকুঞ্জের পাশের ফুটপাতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে ৮-১০টি পরিবার। এদের বেশিরভাগই পাশের ময়লার ডাম্পিং স্টেশনে কাজ করে। কেউ কেউ শ্রমিক বা রিকশাচালক। ফুটপাতেই তাদের সংসার। গ্রীষ্ম, বর্ষা বা শীতে রান্না-খাওয়া-ঘুম সবই তাদের হয় ফুটপাতে। বছরের অন্যান্য সময়টা কোনোভাবে কাটলেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বর্ষায়। তবে শীতের ভোগান্তি ছাড়িয়ে যায় সবকিছুকে। কনকনে শীতে এক দিকে যেমন অসহনীয় কষ্ট করতে হয় সেখানকার বড়দের তেমনি অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুরা। 

ওই ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধরেই সংসার পেতেছেন শ্রমিক জয়নাল মিয়া। এখন তিনি অসুস্থ। স্ত্রী নুরুননাহারের আয়ে ৩ বছরের সন্তান নিয়ে কোনোমতে দিন কেটে যায় তাদের। পরিবারের কারোরই নেই শীত নিবারণের ভালো কাপড়। শীত তীব্র হলে ঘুম আসে না জয়নাল মিয়ার। সারা রাত আগুন জ্বালিয়ে রাখেন ঝুপড়ির পাশে, ছোট্ট সন্তানটিকে ঢেকে রাখেন পলিথিনে। জয়নালের প্রতিবেশী ফুলশুনি বেগম পাশেই একটি মাটির হাঁড়িতে কাঠ পুড়িয়ে উত্তাপ নিচ্ছিলেন। তারও ভাষ্য, কনকনে শীতে সামান্য চটের বিছানায় ঘুম আসে না। দুদিন আগে একটা পাতলা কম্বল দিয়ে গেছে কেউ, কিন্তু তাতে শীত মানে না।  একই অবস্থা রাজধানীর পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজের নিচে থাকা রফিকুলের। তারও শীত নিবারণের ভরসা ময়লা-আবর্জনায় জ্বালানো আগুন। শীতের তীব্রতায় তারও ঘুম হয় না। 

জয়নাল, ফুলশুনি বা রফিকুলের মতো রাজধানীর লক্ষাধিক ভাসমান মানুষ এই শীতে পড়েছেন চরম বিপাকে। ঢাকার বাইরে বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষেরও একই দশা। শীতের এই তীব্রতায় তারা আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্টসহ ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রবীণ ও শিশুরা। পূর্ণ বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন শীতজনিত নানা রোগে। তবে সব পাশ কাটিয়েই কাজে নামতে হচ্ছে তাদের। রাজধানীর ইস্কাটনে রিকশাচালক নূরুল ইসলাম বলেন, দিনে যা রিকশা চালাই রাতে মোটেও পারি না। ঠা-ার রোগ আছে। কিন্তু কিছু তো করার নেই। বউ-বাচ্চাদের তো না খেয়ে রাখতে পারব না।

দুদিন আগে থেকে হঠাৎ করে নেমে আসা শীতে ঘন কুয়াশার কারণে ভরদুপুরেও মিলছে না রোদের দেখা। থার্মোমিটারের পারদ ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে দেশের আট জেলায়। বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার কারণ হচ্ছে কুয়াশা। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শীতের অনুভূতি হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

গতকাল আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে বৃহস্পতিবার মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকবে। গতকাল বৃহস্পতিবার যশোরে দেশের সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। রাজধানীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সারা দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ থেকে ১৬ ডিগ্রির মধ্যেই ছিল।

জানুয়ারি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি মাসে ২-৩টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে একটি মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।

এদিকে পৌষের শেষে এসে শীতে কাঁপছে সারা দেশ। উত্তর-দক্ষিণ সব জনপদে বইছে শীতের কনকনে বাতাস। সঙ্গে রয়েছে ঘন কুয়াশাও। তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ঘন কুয়াশার কারণে জেলার অধিকাংশ সড়কে যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। কুয়াশায় ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল। ফলে দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রীরা।

এছাড়া প্রচণ্ড শীতে বেশি কষ্ট পাচ্ছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। শীতে হাসপাতালগুলোতে ঠা-াজনিত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজও।

কনকনে ঠা-ায় কাহিল কুড়িগ্রামের মানুষ : আবারও পৌষের কনকনে ঠা-া ও হিমেল হাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছে উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রামের মানুষ। সূর্যের দেখা না মেলায় কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে প্রকৃতি। রাত যতই গভীর হয়, বাড়তে থাকতে কুয়াশা ও ঠা-ার মাত্রা। এদিকে কনকনে ঠা-ায় জেলায় বেড়েছে শীতজনিত রোগ। জেলার হাসপাতালগুলোর শিশু ও জেনারেল ওয়ার্ডে দ্বিগুণেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।

পঞ্চগড়ে আবারও মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু : শীতের জেলা পঞ্চগড়ে শীতার্তদের দুর্ভোগ কমছেই না। মাঝখানে দুদিন বিরতি দিয়ে আজ আবারও মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। উত্তরের কনকনে শীতল বাতাসে কাহিল হয়ে পড়ছে এই এলাকার মানুষজন। আগের দুদিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও প্রায় দুপুর পর্যন্ত সূর্য মেঘে ঢাকা ছিল। কুয়াশা না থাকলেও মেঘাচ্ছন্ন আকাশে উত্তরের কনকনে শীতল বাতাস কাঁপিয়েছে পঞ্চগড়ের মানুষকে। দুপুরের পর থেকে রোদের দেখা মিললেও কনকনে শীতল বাতাসের কারণে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও বাড়ছে না।

মাগুরায় বিপাকে নিম্ন আয়ের মানুষ : মাগুরায় পৌষের শেষ সময়ে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের সঙ্গে বইছে হিমেল হাওয়া। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা না মিললেও অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য কর্মব্যস্ত মানুষ বেরিয়ে পড়ছে। তীব্র কুয়াশার কারণে সড়কে সকাল ১০টা পর্যন্ত হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে মহাসড়কগুলোতে এ যানবাহন চলাচল করছে। পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে নসিমন, পিকআপ ভ্যানসহ সবজি-বোঝাই যানগুলো।

শীতে কাবু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও : ঘনকুয়াশার সঙ্গে শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কাবু হয়ে পড়েছে পটুয়াখালীর দুমকিসহ দক্ষিণের মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সূর্যালোকের দেখা মিললেও তাপের উষ্ণতা কম থাকায় প্রচ- শীত অনুভূত হয়েছে। কুয়াশার কারণে সড়ক ও নৌপথে যানবাহন চলাচল বিঘিœত হচ্ছে। রাত ৮টার পর থেকে ভোর ৭টা পর্যন্ত বগা ফেরি পারাপার বন্ধ রাখতে হয়েছে।

শীতের তীব্রতায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ : ফেনীতে গত কয়েকদিন ধরে বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ফলে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। ঘন কুয়াশার মধ্যে কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়ে ঠা-া, কাশি ও জ্বরসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া কর্মজীবী মানুষগুলো। শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ দিনে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৭ বেডের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছে দুই শতাধিক শিশু। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা এসব শিশুর অধিকাংশই নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া আক্রান্ত।

শীতবস্ত্র বিতরণ করলেন রাসিক মেয়র লিটন : রাজশাহীতে শীতবস্ত্র নিয়ে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। গতকাল দুপুরে পৃথক দুটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেন রাসিক মেয়র।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক এবং পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ফেনী, পটুয়াখালী ও মাগুরা প্রতিনিধি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত