বিশ্বের গণতন্ত্রিক দেশগুলোর কাছে নিরপেক্ষ সরকারের যৌক্তিকতা তুলে ধরছে বিএনপি। দলটি মনে করে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিগত দুটি নির্বাচন কেমন হয়েছে তা বিদেশিদের কাছে স্পষ্ট। এ কারণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন হওয়া জরুরি। দলের শীর্ষ নেতাদের দাবি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন জনগণের দাবি। তাই জনগণের দাবি বাস্তবায়নে তারা আন্দোলন করে যাবেন এবং নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করতে সরকারকে বাধ্য করবেন।
গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরের কাছে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে দুটি নির্বাচন হয়েছিল তা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। তেমন সংসদ নির্বাচন আদায়ে তারা আন্দোলন করছেন। দেশের জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের দাবির সঙ্গে একমত। বিএনপির নেতারা মনে করেন, পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এটা দেশে-বিদেশে প্রমাণিত। রাজনৈতিক এহেন পরিস্থিতিতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেছিল।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চাপে বিএনপি সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারায়। ফলে দেশে-বিদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রশংসিত হয়।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো যেনতেন একটা নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইবে। নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া আওয়ামী লীগ বিদেশিদের কীভাবে বোঝাবে, সেটা তাদের বিষয়। তবে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন হলে কী হয়, সেই অভিজ্ঞতা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন কেমন হয় সে-সম্পর্কেও তাদের ধারণা আছে। তবে আমরা মনে করি, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো আমাদের দেশের জনগণ কী চায়, সে-সম্পর্কে অবহিত আছে। তারা বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাছে নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে চায়। আমরা তাদের অবহিত করি। আমরা মনে করি, দেশের জনগণের বাইরে বিশ্বের গণতান্ত্রিক সরকারগুলো যাবে না।’
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কী করবে তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করছি। সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ২৭ দফা দাবি জাতির সামনে তুলে ধরেছি। এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। এসব কর্মসূচিতে দলের নেতা-কর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষও অংশগ্রহণ করছে। সরকারবিরোধী অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আমাদের সঙ্গে রয়েছে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাছেও আমরা দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরছি। আশা করছি, তারা দেশের জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে।’
বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধান জনগণের জন্য এবং তা পরিবর্তনযোগ্য। আর এ কারণে বিগত দিনগুলোতে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে কী হয়েছে তা বিদেশিরা জানে। সর্বশেষ জাপানি রাষ্ট্রদূত ওই নির্বাচন নিয়ে এক অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন। আমরিকার বাইডেন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের দেশে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে যে সম্মেলন করেছে, সেখানে আওয়ামী লীগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এভাবে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো সর্বশেষ নির্বাচন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান মানুষের জন্য। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ যে ২৭ দফা ঘোষণা করেছি, সেখানে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বলা হয়েছে। এখন আমরা অপেক্ষায় আছি এবং দেখছি সরকার কী করে। সরকার উদ্যোগ না নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করতে বাধ্য করব।’
