বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ। শতভাগ মানুষ বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায়। বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আমাদের সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনার ফসল বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এখন আমাদের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা প্রায় ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টা। তবে বিদ্যুৎ বিতরণে এখনো কমবেশি সমস্যা থাকায় কোনো কোনো স্থানে এখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। আজ থেকে ৫৩ বছর আগে একাত্তরের মার্চে বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ঠিক কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৪৭৫ মেগাওয়াট। ১৯৭২ সালে দেশে স্থাপিত বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫০০ মেগাওয়াট। তবে এই ক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎও উৎপাদন করা যেত না। এই সামান্য পরিমাণ বিদ্যুৎ নিয়েই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করেন। আর আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এসে এখন উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে সংযোগ চাহিদার বিপরীতে এই সক্ষমতা দ্বিগুণ। বাংলাদেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ১২৭ বছর আগে ব্রিটিশশাসিত পূর্ববঙ্গে গাজীপুর জেলার ভাওয়াল পরগনার রাজা প্রথম বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু করেন। এরপর ১৯০১ সালে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহর বাসভবনে একটি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি হলেও এ খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। স্বাধীনতার আগে থেকেই বিদ্যুৎ খাত ছিল সরকারনির্ভর। এই খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ ছিল না। এ কারণে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ছিল অত্যন্ত ঢিমেতালে। আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা এ খাতে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এ খাতে কমবেশি বিনিয়োগ শুরু হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সময়সাপেক্ষ। ফলে রাতারাতি এ খাতে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এ সময় বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি মালিকানায় বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আইপিপি অর্থাৎ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। বেসরকারি খাত থেকেই ১২৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি করা হয়। বিদ্যুৎ খাতে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনা। এরপর ক্রমেই উৎপাদন বাড়তে থাকে। বর্তমানে বেসকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৯০; উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৩৬৪ মেগাওয়াট। আর সরকারি খাতে কেন্দ্রের সংখ্যা ৫৪; উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৫৪৪ মেগাওয়াট। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। ২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। প্রকৃত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল যদিও ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট (৬ জানুয়ারি, ২০০৯)। এর পরই বিদ্যুৎ খাতে এক প্রকার বিপ্লব সূচিত হয় এ সরকারের আমলেই। স্বাধীনতার পর গত ৩৮ বছরে বিদ্যুৎ খাতে যা হয়েছে; গত সাড়ে ১২ বছরে বিদ্যুৎ খাতে তার চেয়ে অনেক গুণ উন্নতি হয়েছে। গত সাড়ে ১২ বছরে এ খাতে যুগান্তকারী উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা এখনো চলমান।
২০০৯ সালের শুরুতে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল মাত্র ২৭টি। বর্তমানে ১৪৫টি। ১২ বছরে বেড়েছে ১১৮টি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট। বেড়েছে ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সঞ্চালন লাইন ছিল ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার; বর্তমানে ১২ হাজার ৮৯২ কিলোমিটার। বেড়েছে ৪ হাজার ৮৯২ কিলোমিটার। গ্রিড উপকেন্দ্র ছিল ১৫ হাজার ৮৭০টি। বর্তমানে ৪৯ হাজার ৪০০টি। বেড়েছে ৩৩ হাজার ৫৩০টি। বিতরণ লাইন ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে ৬ লাখ ৩ হাজার কিলোমিটার। বেড়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার কিলোমিটার। বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিল ১ কোটি ৮ লাখ। বর্তমানে ৩ কোটি ৯৬ লাখ। বেড়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ। সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বর্তমানে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে ভিশন-২০৩০ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ মুখ্য জ্বালানির উৎস তৈরি করতে হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৫০ শতাংশ জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হবে, যার ২৫ শতাংশ হবে কয়লা, ২০ শতাংশ হবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বাকি ৫ শতাংশ হাইড্রো ও নবায়নযোগ্য শক্তি। বর্তমানে অর্থাৎ ২০২১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ৫২ শতাংশ, ফার্নেস অয়েল ২৭ শতাংশ, ডিজেল ৬ শতাংশ, কয়লা ৮ শতাংশ, জল ১ দশমিক ১ শতাংশ, গ্রিড সোলার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, বিদ্যুৎ আমদানি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ভিশন ২০৩০-এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও এসডিজির দিকে লক্ষ্য রেখে সরকার মাস্টারপ্ল্যানে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে টেকসই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এখন বহুমুখী জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এখন গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা, ফার্নেস অয়েল, পারমাণবিক শক্তি, ডিজেল, পানি, সৌরশক্তি, বায়ু ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির কথা বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এ জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সোলার বা সৌর, বায়ু, পানির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে যাওয়ার বিকল্প নেই। প্রত্যাশা রাখছি সরকার বিদ্যুতের অব্যাহত চাহিদা পূরণে ভবিষ্যতে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ
ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম
