গাজীপুরে টাকার জন্য পুলিশের নির্যাতনে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ এনে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে ভোগড়া এলাকায় শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ বক্সে হামলা এবং পুলিশের চারটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দুই ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।
মারা যাওয়া ব্যবসায়ীর নাম রবিউল ইসলাম (৪৫)। তিনি গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া বাইপাস পেয়ারাবাগান এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ছিলেন সুতা ব্যবসায়ী। তার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জের শাহজাদপুর গ্রামে। বাবার নাম আব্দুল বাকী। রবিউলের ইসরাত (১০) ও নুসরাত (৫) নামে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। এই ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) বাসন থানার দুই এএসআইকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে
স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, মোবাইল ফোনে বিটকয়েন দিয়ে জুয়া খেলার অভিযোগে গত শনিবার রাতে চারজনকে আটক করে বাসন থানা পুলিশ। পরদিন তিনজনকে ছেড়ে দিলেও ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামকে থানায় আটকে রাখা হয়। পরে গত মঙ্গলবার রাতে বাসন থানার একদল পুলিশ সদস্য ওই ব্যবসায়ীর বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে আসেন। পরে রাতে তারা জানতে পারেন রবিউল মারা গেছেন।
সকালে এ ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে বিক্ষিপ্ত এলাকাবাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রথমে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা পুলিশের চারটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া বাইপাস মোড়ে পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরে আরও পুলিশ সদস্য সেখানে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দেয় এবং সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেণে আনে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে ওই দুই মহাসড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেটে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ব্যবসায়ীর মৃত্যুর এ ঘটনায় দুই এএসআইকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি জিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. দেলোয়ার হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- জিএমপির উপকমিশনার (ক্রাইম) আবু তোরাব মো. শামছুর রহমান ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. খায়রুল ইসলাম। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. দেলোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, রবিউল ইসলামসহ চারজনকে আটক করেন বাসন থানার এএসআই মাহবুব। এ সময় তার সঙ্গে একই থানার এএসআই নূরুল ইসলামও ছিলেন। পরদিন আটক তিনজনকে টাকার বিনিমেয়ে ছেড়ে দিলেও ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামকে থানায় আটকে রাখা হয়।
প্রতিবেশী শাকিল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার রাত ১টার দিকে রবিউল ইসলামকে পুলিশ আটক করলেও নানা অজুহাতে তাকে থানায় আটক করে রাখে। একপর্যায়ে রবিউলের পরিবারের কাছে এএসআই মাহবুব ১ লাখ টাকা দাবি করেন। তারা থানায় গিয়ে এএসআই মাহবুবকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে আসেন। তার পরও রবিউলকে না ছেড়ে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। চার দিন ধরে রবিউলকে থানায় আটকে রেখে টাকার জন্য পুলিশ নানা দেনদরবার করতে থাকে। কিন্তু রবিউলের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা পুলিশকে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারেনি।’
শাকিল আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে রবিউলের স্ত্রী নূপুর আক্তারকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রাস্তার মধ্যে গাড়িতে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাকে বাসায় চলে যেতে বলেন এএসআই মাহবুব। দুই ঘণ্টা পর তার স্বামী বাসায় চলে যাবে বলে তাকে জানানো হয়। রবিউলের স্ত্রী তার স্বামীকে একনজর দেখার জন্য বারবার আকুতি জানালে ওই এএসআই সেই সুযোগ দেননি।’
মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে থানা থেকে মোবাইল ফোনে কল করে রবিউল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন বলে তার স্ত্রীকে জানানো হয় উল্লেখ করে শাকিল বলেন, ‘পুলিশ বলে তাকে (রবিউল) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে নূপুর ও রবিউলের ছোট ভাই মহিদুল ইসলাম এবং বাড়িওয়ালা এমারত হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ওই হাসপাতালে গিয়ে রবিউলকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, রবিউল ইসলামকে মঙ্গলবার রাত ২টা ৫০ মিনিটে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রবিউলকে টাকার জন্য নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাসন থানার ওসি আব্দুল মালেক খসরু খান বলেন, ‘অনলাইনে জুয়া খেলার অভিযোগে রবিউল ইসলামকে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাসা থেকে আটক করা হয়। তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। থানা থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি বাসায় ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।’
আর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ) আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুর রহমান বলেন, ‘এ ঘটনায় যারা অপরাধী, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
