দেশে প্রথমবারের মতো মরণোত্তর অঙ্গ প্রতিস্থাপন

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ০৩:০৯ এএম

দেশে প্রথমবারের মতো ‘ব্রেন ডেথ’ রোগীর অঙ্গদানের মাধ্যমে সফল ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট (অঙ্গ প্রতিস্থাপন) করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। এতে এক রোগীর অঙ্গদানের মাধ্যমে দুজন কিডনি বিকল রোগী এবং দুজন অন্ধ ব্যক্তির কর্নিয়া প্রতিস্থাপন সফলভাবে করা হয়েছে। অঙ্গদাতা ২০ বছরের সারা ইসলাম ও তার পরিবারের সম্মতিতে গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোররাত সোয়া ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর তিনটি হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিডনি ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিএসএমএমইউয়ের শহীদ ডা. মিলটন হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদের সার্বিক নির্দেশনায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন, ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে অ্যানেস্থেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া এবং ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রথম সফল ক্যাডাভেরিক বা ব্রেন ডেথ রোগীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

এতে জানানো হয়, সারা ইসলামের মূল অপারেশন শুরু হয় রাত সাড়ে ১০টায়। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য পাঁচজন কিডনি বিকল রোগী প্রস্তুত রাখা হয়। এর মধ্যে ক্রস ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে দুজনের সঙ্গে সারা ইসলামের সবকিছু ম্যাচ করে। দুটি কিডনির মধ্যে বাম কিডনি ৩৪ বছর বয়সী শামীমা আক্তারের দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি অপারেশন থিয়েটারে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে ডান কিডনিটি মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগী হাসিনার দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে সময় লাগে ছয় ঘণ্টা। এ ছাড়া কিডনি দুটি প্রতিস্থাপনের পর দুটি কর্নিয়া সংরক্ষিত করা হয়। দুটি কর্নিয়ার একটি বিএসএমএমইউতে অন্যটি সন্ধানী আই হাসপাতালে প্রতিস্থাপন করা হয়। সুজন মিয়া (৩০) ও ফেরদৌসী আক্তার (৫৬) নামে দুজন দুটি কর্নিয়া পেয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ব্রেন ডেথ হলো যাদের আইসিইউতে মস্তিষ্ক অচল হয়ে যায় এবং যাদের বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই তারা ক্যাডাভেরিক। যদি তারা ক্যানসার, হেপাটাইটিস, এইচআইভিসহ অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত না হয় তারা ক্যাডাভেরিক হিসেবে অঙ্গদান করতে পারবেন।

কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘দেশে কিডনিদাতা পাওয়া যায় না। আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী ডায়ালাইসিস নেন। ৫০ জনের বেশি রোগী সিরিয়ালে আছে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য। কিন্তু আমরা কিডনি ম্যাচ করতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় তাদের মধ্যে সঠিক কাউন্সেলিং করা গেলে আমরা প্রতি বছর কমপক্ষে তিন হাজারের বেশি ভালো কিডনি পেতে পারি। আমাদের কাউন্সেলিং জরুরি। সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিডনি ও কর্নিয়া দানকারী সারা ইসলামের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার চিকিৎসার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ডা. কামরুল হুদা। এ সময় রোগ নির্ণয় ও পরবর্তী সময়ে অঙ্গদানের মহৎ উদ্যোগে সারার মা, স্কুলশিক্ষিকা শবনম সুলতানাকে উদ্বুদ্ধ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউর সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুজ্জামান সজীব, যিনি ক্যাডাভেরিক সেলের সদস্য। পরে ডা. সজীব ট্রান্সপ্ল্যান্ট মেডিকেল টিমকে অবহিত করেন এবং পুরো প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিএসএমএমইউয়ের তথ্যমতে, শবনম সুলতানা এবং শহীদুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ সন্তান সারা ইসলাম। অঙ্গদাতা সারার মাত্র ১০ মাস বয়সে দুরারোগ্য টিউবেরাস স্কে¬রোসিস রোগে আক্রান্ত হন। এ রোগ নিয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে লড়াই করেছেন তিনি। এ সময় সারা ইসলাম অগ্রণী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট আল্ট্রারনেটিভে (ইউডা) ফাইন আর্টসে ভর্তি হন। ফাইন আর্টসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন সারা।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সারা ইসলাম টিউমারসহ নানা জটিল রোগ নিয়ে কয়েক মাস আগে হাসপাতালে ভর্তি হলে একটি অপারেশন করা হয়। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর তার অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকলে এবং তিনি ব্রেন ডেথের দিকে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে তার মাকে কাউন্সেলিং করা হয় চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে। অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করছেন আইসিইউতে থাকা ২০ বছর বয়সী মৃতপ্রায় কন্যার মা স্কুলশিক্ষিকা শবনম সুলতানা।

সারা ইসলামের মা শবনম সুলতানা বলেন, ‘সারা মৃত্যুর আগে তার দেহের সবকিছুই দান করে দিতে বলেছেন গবেষণার জন্য। ফলে বিষয়টি অনেকটা সহজ হয়। এরপর মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার দেহ থেকে কিডনি ও কর্নিয়া নেওয়া হয়। সারার মা হিসেবে যে পরিচিতি পেয়েছি তাতে আমি ধন্য।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জাতীয় ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও প্রতীক্ষার পর অবশেষে প্রথমবারের মতো ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হলো বাংলাদেশে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের তালিকায় আরেকটি মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রথম অঙ্গদাতা হিসেবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইতিহাস সৃষ্টি করল ২০ বছর বয়সী সারা ইসলাম। দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এর নাম ।’ তিনি বলেন, ‘সারা ইসলামের নামে একটি স্মৃতিফলক, ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেল, একটি অ্যাওয়াডসহ পরিবারের সব সদস্যকে বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রস্তাব করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯৯ সালে মানবদেহে অঙ্গপ্রতিস্থাপন সংক্রান্ত আইন পাস করা হয়। সেই আইনের আলোকে উপাচার্য হিসেবে আমি পদাধিকার বলে জাতীয় ক্যাডাভেরিক কমিটির সভাপতি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেন ডেথ কমিটি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেলের সহযোগিতায় ক্যাডাভেরিক রোগীর দেহ থেকে অঙ্গদানের প্রক্রিয়া সফল করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আজ আমরা সফল হয়েছি। বাংলাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছি।’

এদিকে গতকাল সকাল ৮টায় বিএসএমএমইউয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রয়াত সারা ইসলামের প্রথম জানাজা হয়। জানাজায় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন। পরে আজিমপুরের তাকওয়া জামে মসজিদে জানাজা শেষে বাদ জোহর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত