২০১০ যুব বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার সহঅধিনায়ক ৯ বছর পর প্রোটিয়া টেস্ট দলে ডাক পাওয়ার খুব কাছে ছিলেন। কিন্তু বেছে নেন কাউন্টি ক্রিকেট। এরপর মায়ের দেশ নেদারল্যান্ডসের জার্সি গায়ে এগিয়ে চলেছেন কলিন অকারম্যান। এবার সিলেট স্ট্রাইকার্সে প্রথম বিপিএলের আমেজ গায়ে মাখছেন। দেশ রূপান্তরের শিহাব উদ্দিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানালেন নিজের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন দিক
এই প্রথম আপনি উপমহাদেশে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছেন। প্রথম হিসেবে কেমন উপভোগ করছেন?
অকারম্যান : অবশ্যই ভালো। দল হিসেবে যদি বলি প্রথম ৬ ম্যাচ দারুণ কাটানো। একটি জয়ী দলের অংশ হওয়াটা সত্যিই আত্মবিশ্বাস ও ভালোলাগা বাড়িয়ে দেয়। কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহজ হয়। আর ম্যাচের হিসাবে আমি হয়তো খুব বেশি সুযোগ পাইনি এখানকার উইকেটকে বুঝতে। পাশাপাশি এখানে নেট অনুশীলনও খুব বেশি সময় ধরে করা যায় না। তবু এর মধ্যেও নিজেকে প্রস্তুত রাখছি যেন পরের ম্যাচে সুযোগ পেলে তৈরি হয়ে মাঠে নামতে পারি।
টি-টোয়েন্টিতে আপনার পুরো ক্যারিয়ারটাই তো ইংল্যান্ডে। টি-২০ ব্লাস্ট বা ভাইটালিটি ব্লাস্ট টুর্নামেন্ট খেলেছেন। ওই আসরগুলোর সঙ্গে বিপিএলের পার্থক্য কেমন দেখছেন?
অকারম্যান : অনেক পার্থক্য। সেখানে ভালো উইকেটে খেলতে পারি আমরা। যেমন আমাদের লেস্টারের মাঠ গ্রেস রোডের কথা যদি ধরি সেখানে প্রতি ম্যাচে স্কোর হয় ১৭০-১৮০। কিন্তু এখানে প্রতি ম্যাচে স্কোর ১৪০-১৪৫, তো এমন উইকেটে ব্যাটারদের মানিয়ে খেলতে হয়। সময় নিতে হয় কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচিত হতে। এছাড়া ইংল্যান্ড এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টির সেরা দল। ওদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মানটাও তাই একটু ভালো বলতেই হবে। তবে এখানে আমি বেশ ভালো দলের সঙ্গে আছি। মাশরাফী-মুশফিকের মতো অভিজ্ঞ দুজনকে নিয়ে আমাদের দলটাও বেশ ভালো করছে।
বিপিএলে আপনার দুটি ইনিংস ভুলে যাওয়ার মতো। আসলে কী হয়েছিল? আপনি কি কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি?
অকারম্যান : তেমনটা না। প্রথম ম্যাচে বলটা এক্সট্রা বাউন্স হয়েছিল। আমার গ্লাভসে লেগে কিপারের কাছে চলে যায়। এক্সট্রা বাউন্স হলে বিশ্বের যে কোনো ব্যাটারের জন্যই খেলতে সমস্যা হয়। আর ওই ম্যাচটা ছিল মিরপুরে। আমি শুনেছি মিরপুরের উইকেটের ব্যাপারে। তোমরাও জানো সেটা যে এখানে আগে থেকে চিন্তা করে কিছুই করা যায় না। তবে হ্যাঁ, দ্বিতীয় ম্যাচে রানআউট নিয়ে আমি নিশ্চয়ই হতাশ। আমার ক্যারিয়ারে এমন শিশুসুলভ ভুল আমি কখনই করিনি। ক্রিকেটে অনেক সময় বোকার কা- ঘটে, আমি সেদিন ওই কাজ করেছি। দুর্ভাগ্য আমার।
আপনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যদি তাকাই ক্যারিয়ার বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায়। ঠিক কোন চ্যালেঞ্জের কথা ভেবে আপনি কাউন্টি ক্রিকেটে নাম লেখালেন?
অকারম্যান : ইংল্যান্ডে আমি নিজেকে ভালো ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি। শুধু ছোট ফরম্যাটে না, বড় ফরম্যাটেও, তিন ফরম্যাটেই। ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলা কঠিন না। সেখানে সব ধরনের কন্ডিশনে খেলার সুযোগ হয়। বিভিন্ন কন্ডিশনে তোমাকে অনেক ক্রিকেট খেলতে হবে। এপ্রিলে মেঘলা আবহাওয়ায় বল সিম করবে, ওই সময় রান করা শিখতে হয়। জুলাইতে আবার ফ্লাট উইকেটে রান করা সহজ হয়। ইংল্যান্ডে তাই তুমি কেমন ক্রিকেটার সেই পরীক্ষাটা দেওয়া যায়। আমি বিশ্বাস করি ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর আমি নিজের খেলা ও নিজেকে ক্রিকেটার হিসেবে আরও ভালো বুঝতে পেরেছি।
নিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা এমন টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটাররা কেন কাউন্টিকে বেছে নেয়। দেশের হয়ে খেললে তো বড় পর্যায়ে তারা আরও খেলার সুযোগ পায়?
আকারম্যান : এখানে অনেক বিষয় থাকে। এর মধ্যে একটা কাউন্টি অনেক বড় প্লাটফর্ম। সেখানে খেলার সুযোগটা বেশি পাওয়া যায়। দেখছেন অনেক বয়স্ক ক্রিকেটারও সেখানে খেলে। কাউন্টির ঐতিহ্যে এবং খেলার পরিমাণের দিকে তাকালে অবশ্যই যে কেউ সেখানে খেলতে চাইবে। কিন্তু একটা দেশে মানে নিউজিল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকায় আপনি নির্দিষ্ট কিছু ক্লাবে নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টেই খেলতে পারবেন। সেখানে প্রতিযোগিতা বেশি থাকে জাতীয় দলের জন্য। অবশ্যই যে কোনো ক্রিকেটার প্রতিযোগিতায় নামতে চাইবে, কিন্তু এটা একটা দিক এবং আপনি ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার দীর্ঘ করবেন সেটা একটা দিক। ২০১৭ সালের দিকে আমি লেস্টারশায়ারের প্রস্তাব পেয়ে ইংল্যান্ডে যাই। ওই সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু সেখানে আমি আমার পরিবারকে (সহধর্মিণী) পাই। সেখানে নিজের ক্যারিয়ারকে অন্যভাবে আবিষ্কার করেছি। এখন বলব ওই সিদ্ধান্তটা আমার জন্য সঠিক ছিল।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আপনার ৪১ রানে আপনার জন্মস্থান দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। এই অনভূতিটা কেমন ছিল আপনার জন্য?
অকারম্যান : আমি মিথ্যা বলব না, সত্যিই অদ্ভুত লাগছিল (হাসি)। এটা ক্রিকেট, মানে যেখানে ভিন্ন দুটো আন্তর্জাতিক দল মাঠে মুখোমুখি হয়। কিন্তু আমার জন্য ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেল। মানে এই যে রাবাদা, এনগিডি বা নরকিয়া ওদের তো আমি চিনি। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বা ২০১৮-১৯ এর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে ওদের বিপক্ষে বা পক্ষে অনেক খেলেছি। আমি সত্যি আনন্দিত যে নিজের দলকে জেতাতে পেরেছি। তবে এক কথায় যদি বলি ওদের বিপক্ষে আবার খেলে সুযোগটা সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পেরেছি।
একজন ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারকে কোথায় দেখতে চান?
অকারম্যান: অবশ্যই আমি যতদিন সম্ভব কাউন্টি খেলে যেতে চাই। আমার দল লেস্টারের হয়ে আরও শিরোপা জিততে চাই। আর আন্তর্জাতিকে নেদারল্যান্ডসের হয়ে বড় টুর্নামেন্টে বড় দলের বিপক্ষে ভালো করা আমরা লক্ষ্য। বড় দলের সঙ্গে ভালো করলে আমি নিজেকে অনেক ভালো অবস্থানে নিতে পারব। যেমন এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আমার জীবনের সেরা টুর্নামেন্ট। আমরা গ্রুপে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের সঙ্গে জিতে সেরা চার দলের মধ্যে ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি ২০২৪-এ উইন্ডিজেও আমরা এর ধারাবহিকতা রাখব। এছাড়া বেশি বেশি টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলাও আমার লক্ষ্য। এতে আমি নিজেকে আরও ভালো ভাবে বুঝতে পারব, ভালো ক্রিকেটার হিসেবে পরিণত করতে পারব।
